করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সারা দেশের মতো খুলনায়ও সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। আক্রান্তের পাশাপাশি বাড়ছে মুমূর্ষু রোগীর সংখ্যাও। যাদের চিকিৎসার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ। কিন্তু এ সময়ে খুলনায় করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের চরম ঘাটতি দেখা দিয়েছে। রোগীর চাহিদার বিপরীতে অক্সিজেন সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের জন্য। অন্যদিকে এক বছর আগে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে তরল (লিকুইড) অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আটকে আছে ফাইল চালাচালির মধ্যেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অনুমোদন না পাওয়ায় এ দীর্ঘ সময়েও অক্সিজেন প্ল্যান্ট নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। এতে মুমূর্ষু করোনা রোগীদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
খুমেক হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্যমতে, খুলনায় গত ১ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৫৯৮ জন। এ সময়ে মধ্যে মৃত্যু হয়েছে সাত রোগীর। কিন্তু খুলনায় এখনো স্থাপন হয়নি করোনা চিকিৎসার প্রয়োজনীয় উপাদান লিকুইড অক্সিজেনের ট্যাংক ও প্ল্যান্টের কক্ষ। প্রায় ৯৭ লাখ টাকা ব্যয়ে লিকুইড অক্সিজেন ট্যাংক ও প্ল্যান্টের কক্ষ নির্মাণের জন্য ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে চিঠি দেয় হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। সেখানে যাচাই-বাছাই শেষে গত ৪ মার্চ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অনুমোদন চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ওই চিঠি এখনো মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি। খুমেক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভেন্টিলেটরের সংখ্যা ১০টি হলেও সচল রয়েছে মাত্র চারটি। সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন না থাকায় বাকি ছয়টি ভেন্টিলেটর ও ১৪টি হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা মেশিন অচল রয়েছে। এগুলো কবে নাগাদ সচল হতে পারে তা জানা নেই কারও। অপর্যাপ্ত এ ভেন্টিলেটর ব্যবস্থা নিয়ে রোগীর স্বজন ও চিকিৎসকদের মধ্যে প্রায়ই সংঘাতের ঘটনাও ঘটছে।
খুমেক হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক জানান, হাসপাতালে ভর্তি করোনা রোগীদের অধিকাংশেরই অক্সিজেন প্রয়োজন হচ্ছে। কিন্তু এত রোগীকে একসঙ্গে সিলিন্ডারে অক্সিজেন দেওয়া সম্ভব হয় না। লিকুইড অক্সিজেন প্ল্যান্ট না থাকায় নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এতে ঝুঁকিতে পড়ছেন করোনায় আক্রান্ত রোগীরা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) খুলনা জেলা সভাপতি ডা. শেখ বাহারুল আলম বলেন, ‘প্রয়োজনীয় সেবা না পেলে সেবাপ্রার্থীরা ক্ষুব্ধ হন। সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নানা সীমাবদ্ধতায় কাজ করতে হয়। কিন্তু সেবাদাতা হিসেবে তাকেই দায় নিতে হয়। এজন্য তারা হামলা-লাঞ্ছনার শিকার হন, নিরাপত্তাহীন বোধ করেন। করোনা পরিস্থিতিতে দ্রুত অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপন জরুরি। আমলাতন্ত্রে আটকে যাওয়া দুঃখজনক।’
খুমেক হাসপাতালের পরিচালক এটিএম মঞ্জুর মোর্শেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য আমরা বারবার তাগাদা দিচ্ছি। তাছাড়া করোনা পরিস্থিতিতে প্রস্তাবিত লিকুইড অক্সিজেন প্ল্যান্টের সক্ষমতা দ্বিগুণ করতে আট মাস আগে প্রস্তাব দিয়েছি। কিন্তু কোনোকিছুর প্রতিকার পাচ্ছি না। আমরা রোগীদের সর্বাত্মক সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। এ অবস্থায় অক্সিজেনের ভিআই ট্যাংক স্থাপন জরুরি।’
অন্যদিকে খুলনার করোনা প্রতিরোধ ও চিকিৎসা কমিটির সমন্বয়কারী খুলনা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ ডা. মেহেদী নেওয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার প্রথম ঢেউয়ের সময় মুমূর্ষু রোগীর ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় সিলিন্ডার থেকে পাইপের মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়েছিল। চাহিদা অনুযায়ী ওই সময় অনেককে প্রয়োজনের তুলনায় কম অক্সিজেন দিতে হয়েছে। এ কারণে খুমেক হাসপাতালে লিকুইড অক্সিজেন প্ল্যান্ট চালুর নির্দেশনা দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতায় ওই নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয়নি।’
এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন বলেন, ‘১৫ দিনের মধ্যে লিকুইড অক্সিজেন প্ল্যান্ট চালু করতে বলা হয়েছে। প্ল্যান্ট স্থাপনে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অনুমোদনের পর দ্রুত বাস্তবায়ন কাজ শুরু হবে।’
