প্রকৃতিতে যখন বসন্ত, চারদিকে রঙিন ফুলের ছড়াছড়ি, ঠিক তখন নির্মল সৌন্দর্যের বদলে জীবনের সব হতাশা একত্র করে কবি টিএস এলিয়ট লিখেছিলেন, এপ্রিল বড় নির্মম মাস। অন্য মাসের বদলে কেন এপ্রিল নিয়েই এলিয়টের এমন হতাশা তার পেছনের ঘটনা লিখেছেন জুবায়ের আহাম্মেদ
কবি টিএস এলিয়ট
ইংরেজি কবিতার জগতে টমাস স্টেয়ার্ন্স এলিয়টকে প্রবাদ-পুরুষ বলা হয়। বিংশ শতকে এলিয়ট রচিত ‘দ্য লাভ সং অব জে আলফ্রেড প্রুফর্ক’-কে আধুনিক কবিতার গোড়াপত্তন বলে মেনে নেন অনেক সাহিত্যবোদ্ধা। ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’, ‘দ্য হলো ম্যান’, কিংবা ‘ফোর কোয়ারট্রেট’-এর মতো সব কবিতার জন্য এলিয়টের নাম এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। কবিতার বাইরে নাটক রচনায়ও অসামান্য দক্ষতা ছিল এলিয়টের। তার ‘মার্ডার ইন দ্য ক্যাথেড্রাল’ ও ‘দ্য ককটেইল পার্টি’ ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিল দর্শকের কাছে। ১৯৪৮ সালে আধুনিক কবিতার জগতে অসামান্য পুরস্কারের স্বরূপ নোবেল সাহিত্য পুরস্কারও জিতেছিলেন মার্কিন এই কবি। এলিয়টের জন্ম ১৮৮৮ সালে আমেরিকায়। ১৯২৭ পর্যন্ত ছিলেন সেখানেই। কিন্তু বাবা-মায়ের ইচ্ছায় হার্ভার্ডে পড়াশোনা করতে এসে থেকে যান ইংল্যান্ডে। ১৯২৭ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত জীবনের বর্ণিল সময় কাটিয়েছেন ইংল্যান্ডের মাটিতে। খুঁজে পেয়েছেন জীবনের প্রথম ভালোবাসা। কিন্তু জন্মভূমি আমেরিকাও একবার টেনে ধরেছিল তাকে। সাড়া না দিলেও সেই ডাক তাকে সাহিত্যিক হিসেবে পোক্ত করেছিল আরও কয়েক গুণ।
অনন্য এই সাহিত্য জীবনের বাইরেও এলিয়ট ছিলেন প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরপুর একজন পুরুষ। নিজের কবিতা আর লেখা দিয়ে জয় করেছেন অনেকের মন। তার জন্য কেউ পাগল হয়েছেন, কেউ ভুগেছেন আজীবন বিষণ্ণতায়।
এলিয়ট ও ভিভিয়েন
এলিয়টের জীবনে অনেক নারীর গল্প আছে। তবে তাদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছিলেন স্ত্রী ভিভিয়েন। এলিয়ট ও ভিভিয়েনের জন্ম একই সালে। সে হিসেবে দুজনেই সমবয়সী, ভিভিয়েন বরং কয়েক মাসের বড়। ১৯১৪ সালের এক গ্রীষ্মে ম্যাসাচুসেটস থেকে হামবুর্গ হয়ে তরুণ এলিয়েট পৌঁছেছিলেন ইংল্যান্ডে। পরের বছর মার্চে মার্কিন বন্ধু স্কোফল্ড থেয়ারের সঙ্গে গেলেন এক নৌবিহারে। সঙ্গে স্কোফল্ডের বোন লুসি ও প্রাণোচ্ছল ইংরেজ তরুণী ভিভিয়েন হে-উড। এলিয়টের ভেতর কবিসত্তা তো মুগ্ধ করার মতো ছিলই, ভিভিয়নও ছিলেন নানা গুণের অধিকারী। বাবার মতো আঁকিয়ে ছিলেন, ব্যালে জানতেন, শিল্প-সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন, খবরও রাখতেন, পরে নিজেও গল্প-কবিতা লিখেছেন। যে নারী লিখতে ভালোবাসেন তার চিঠি লেখার প্রতি আগ্রহ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। হয়েছিলও তাই। কবির কাছে তার লেখা অসংখ্য চিঠি ছিল। দুজনের মিল হওয়ায় বিয়ে করতেও বেশি সময় নেননি তারা। দেখা হওয়ার পর মাত্র তিন মাসের মাথায় ২৬ জুন তাদের বিয়ে হয়। তত দিনে শিকাগো থেকে প্রকাশিত ‘দ্য লাভ সং অব জে আলফ্রেড প্রুফর্ক’-এর কল্যাণে কবি হিসেবে বেশ সফল হয়ে উঠেছেন এলিয়ট। তবে রেজিস্ট্রি অফিসে করা তাদের বিয়েতে নিজের পেশায় এলিয়ট লিখেছিলেন তিনি একজন বেকার যুবক। দর্শন ও কাব্যের বিমূর্ত ভুবনে অসহায় ডুবন্ত এলিয়ট ভেবেছিলেন এই নারীই তাকে প্রাণে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। কিন্তু বাস্তব যে কত কঠিন, কতটা রূঢ় তা বুঝতে সময় লাগেনি তার। বাবা-মায়ের অনুমোদনহীন বিয়ে, আর্থিক সংকট, সর্বোপরি যৌথ জীবনের ব্যর্থতা। সব মিলিয়ে তিক্ততায় জর্জরিত হয়ে গিয়েছিলেন এলিয়ট। তত দিনে কেটে গেছে জীবনের সতেরোটি বছর। এলিয়টের কবি জীবনের সবচেয়ে সৃজনশীল সময়টায় ভিভিয়েনই ছিলেন একমাত্র সঙ্গী ও সখী।
দুজনের দাম্পত্য জীবন কেমন ছিল সেটি সরাসরি হয়তো বিচার করা যেত না। কিন্তু এলিয়টের জীবনে ভিভিয়েনের প্রভাব নিয়ে কিছু কথা শোনা যায়। সে কথাগুলো অবশ্য তেমন ভালো লাগার নয়। বান্ধবীদের কাছে মনের কথা প্রকাশ করার জন্য চিঠি লিখতেন ভিভিয়েন। এমনই এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, এলিয়ট সত্যিকার অর্থে তাকে ভালোবাসতেন না। যার কারণে ১৯৩৩ সালে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়। আর এর কারণে তীব্র মানসিক যন্ত্রণা পোহাতে হয়েছে ভিভিয়ানকে। একপর্যায়ে তিনি মানসিক রোগী হয়ে পড়েন। তাদের দুজনের সর্বশেষ দেখা হয় ১৯৩৫ সালে। সে সময় ভিভিয়েন যখন এলিয়টের জন্য লন্ডনের পথে অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন, তখন এলিয়ট নিজের প্রতিভাকে মেলে ধরেছেন অনেক বড় পরিসরে। ভিভিয়েন ১৯৪৭ সালে ৫৮ বছর বয়সে মারা যান। দুজনের মধ্যে বিচ্ছেদ হলেও কাগজে-কলমে ডিভোর্স হয়নি।
কথায় বলে, ইতিহাস কখনো বিখ্যাত মানুষদের পিছু ছাড়ে না। এলিয়টের জীবনের নতুন-পুরনো বাঁক নিয়েও অনেক কথা উঠে আসে সামনে। যে ভিভিয়ানের সঙ্গে ভালোবেসে সংসার গড়েছিলেন, সেই নারীর শেষ জীবনের মানসিক অসুস্থতা ও তার প্রতি এলিয়টের প্রেমের অবসানের জন্য দায়ী করা হয় অন্য একজন নারীকে। ইংল্যান্ড থেকে অনেক দূরে আটলান্টিকের ওপারে বোস্টনে থাকা সেই নারীর নাম এমিলি হেইল। যাকে নিয়ে জল অনেক দূর গড়িয়েছিল। পরে নিজের লাগাম টেনে ধরলেও, এলিয়ট অনেক বেশি দেরি করে ফেলেছিলেন।
এমিলি হেইল
ইতিহাস বলে, ভিভিয়ানের সঙ্গে পরিচয়ের দুই বছর আগেই ১৯১২ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এমিলি হেইলের সঙ্গে পরিচয় হয় এলিয়টের। এ হিসেবে তাদের দুজনের প্রেমের ব্যাপ্তি ৩০ বছরেরও বেশি। এতটা সময় কালজয়ী কবি টি এস এলিয়টের সব সৃষ্টির উৎস, অপার্থিব আনন্দের আধার হয়ে ছিলেন এমিলি হেইল। দুজন দুজনকে ভালোবেসেছেন, বিনিময় করেছেন প্রেমাতুর চিঠি। অনেকগুলো চিঠিতে এলিয়ট এমিলিকে ‘প্রিয়তম নারী’ বা ‘আমার প্রিয়তম নারী’ হিসেবে সম্বোধন করেছেন। এপ্রিলের ১ তারিখে লেখা চিঠিতে এলিয়ট তার আবেগ দেখিয়েছেন এভাবে ‘বিশ্বাস করো, যদিও আমার জীবন তীব্রবেগে ছুটে চলেছে, তবু আমি মানসিকভাবে তোমার কাছ থেকে আলাদা নই।’ ১২ এপ্রিলের চিঠির ভাষ্য অনুযায়ী, ‘বসন্তের শুরু এবং শরতের শেষ এই দুই ঋতু আমার (এলিয়ট) স্থিতিশীল অবস্থার জন্য যন্ত্রণাদায়ক। এই মাস সেসব স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, যা দমিয়ে রাখা দরকার।’ চিঠির এই ভাষাকে এলিয়ট নিজের কবিতায় পর্যন্ত ফুটিয়ে তুলেছিলেন বিভিন্ন সময়। ‘বড় নিষ্ঠুরতম মাস এপ্রিল; জন্ম দেয়, লাইলাক মৃত ভূমিতে, মিশিয়ে নেয় স্মৃতি আর কামনায়।’
বলে রাখা ভালো, নিজের দাম্পত্য জীবনে ভিভিয়েনের সঙ্গে অসুখী সময়ের মধ্যেই নিজের অমর সৃষ্টি ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ লিখেছিলেন এলিয়ট। কবিতায় যে স্মৃতি ভোলার কথা তিনি বলেছেন, সেই একই স্মৃতি কি এমিলির কাছেও বিসর্জন দিতে চেয়েছিলেন? সে প্রশ্নের জবাব কেউ জানে না। তবে হ্যাঁ, এপ্রিলের প্রতি তার বিদ্বেষ ছিল। সেই কথা ফুটে উঠেছে অন্য এক আরেক চিঠিতে।
কতটা কাতর ছিলেন প্রেমিকার জন্য তার আখ্যান এই চিঠিগুলো। কিন্তু হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা, আকুলতা, আর সীমাহীন এই অনুরাগ শেষ পর্যন্ত পরিণতিতে পৌঁছায়নি। পৌঁছায় মনভাঙা এক উপসংহারে।
এমিলি হেইলকে নিয়ে জানাশোনার সময় খুব বেশি নয়। ১৯৬৯ সালে মৃত্যুবরণ করা এই নারী সবার সামনে এসেছেন মৃত্যুর ৫০ বছর পর। যদিও এই লম্বা ব্যবধানের কারণ ছিল তার নিজের করা উইল। মৃত্যুর আগে প্রিন্সটন ফায়ারস্টোন লাইব্রেরিকে কবি এলিয়টের লেখা ১ হাজার ১৩১টি চিঠি জমা দেওয়ার সময় প্রতিজ্ঞা করিয়েছিলেন, তার কিংবা এলিয়ট যার মৃত্যু পরে হবে সে হিসেবে ৫০ বছর পর যেন চিঠি উন্মুক্ত করা হয়। এমিলি হেইলের এই অদ্ভুত উইলের কথা এলিয়টের কানেও গিয়েছিল। তিনিও বেশ ফলাও করে হার্ভার্ডে একটি স্মারক দিয়ে যান প্রতিবাদস্বরূপ। তত দিনে এলিয়ট বেশ নামকরা একজন কবি। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ভিভিয়েন বেঁচে থাকা অবস্থায় তাদের মধ্যে প্রেম চললেও, ১৯৪৭ সালেই ভিভিয়েনের মৃত্যুর পরপরই তাদের সম্পর্কটাও ভেস্তে যায়। পেছনে পড়ে থাকে বেশ কিছু চিঠি। এত দিনের প্রেমের পরিণয় এমন অবস্থায় পৌঁছেছিল যে এলিয়ট এমিলি হেইলকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ‘অনুভূতিহীন’, ‘বিকৃত রুচি’র মতো উপমাও ব্যবহার করেছিলেন। তার ধারণা ছিল, এমিলি ব্যক্তি এলিয়টের চেয়ে কবি এলিয়টের খ্যাতিকেই বেশি ভালোবাসতেন। এমিলিকে বিয়ে করতেন কি না এই প্রশ্নের জবাবে ওই স্মারকলিপিতে এলিয়ট লিখেছিলেন, ‘সে (এমিলি) হয়তো আমার ভেতরের কবিকেই মেরে ফেলত।’
যদিও এর বিপরীতে এমিলি হেইল অনেক বেশিই আবেগী ছিলেন। জানা যায়, এলিয়টের দ্বিতীয় বিয়ের খবর পেয়ে এমিলি হেইল মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং একপর্যায়ে চিকিৎসার দ্বারস্থ হন। যদিও তাকে ভিভিয়েনের মতো ভাগ্য বরণ করতে হয়নি। তবে সুস্থ অবস্থায় থেকেও এমিলি বাকি জীবন পার করেছেন এলিয়টের অপেক্ষায়। আর তাই হয়তো একসময় ক্লান্ত হয়ে এমিলি শেষ সময়ে চিঠিগুলো তুলে দিয়েছিলেন প্রিন্সটন লাইব্রেরির কাছে। উদ্দেশ্য ছিল, কোনো এক দিন যদি পুরো পৃথিবী তাদের কথা জানতে পারে, যেন কোনোভাবেই বিস্মিত না হয়।
এপ্রিল কেন নির্মম
১৯৩২ সালের এপ্রিল জুড়ে লেখা চিঠিতে এলিয়টের বিষণœতা খুব ভালোভাবেই ফুটে উঠেছিল। চিঠিগুলোর ভাষায় এক অদ্ভুত মোহ ছিল। আর সবটাই যে এমিলির প্রতি ভালোবাসা থেকে তা একেবারেই স্পষ্ট। স্ত্রী ভিভিয়েন সে সময় তার কাছে নিছক একটি বোঝা। একসময়ে যার প্রেমে বুঁদ ছিলেন, সেই ভিভিয়েনকেই এমিলির কাছে তিনি উপস্থাপন করেছিলেন নারকীয় যন্ত্রণা হিসেবে। বিধ্বস্ত এলিয়ট চাননি এমিলি এ সময় তাকে অন্তত ফিরিয়ে দিক। তাই হয়তো আর্জি করেছিলেন, ‘আমি আশা করি তুমি আমার কথাগুলোকে কোনো নীতিকথার মতো খাটো করে বা উপদেশ হিসেবে দেখবে না।’ কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, ইংল্যান্ডে যখন বসন্তের শুরু, তখন এলিয়ট কেন এপ্রিল মাসকেই তার জীবনের নির্মম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন? দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ডে (পোড়ো জমি) তিনি লিখেছেন, ‘শীতার্ত দিনই আমাদের উষ্ণ রেখেছিল, ঢেকে দিয়ে; পৃথিবীকে বিস্তৃতির তুষারে, পুষ্ট করে দিয়ে, ক্ষীণপ্রাণে খর্ব শিকড়ে।’
এপ্রিলকে কেন নির্মম মাস বলা হয়েছে সে নিয়ে বিতর্ক অনেক দূরে গিয়েছে সমালোচকদের মধ্যে। তবে বেশির ভাগের মতে, এপ্রিল মাসে দিকে দিকে ফুটে ওঠা প্রকৃতির সজীবতা, দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত মানুষকে আচমকা তাদের হতাশার মধ্যে রেখে দেয়। শীতের তীব্র তুষারের মতো দুঃখবোধে ঢেকে থাকা একেকজন জীবন্মৃত মানুষ যেন এপ্রিল মাসের আলোয় বড় অসহায়। শীতের রুক্ষতাই যেন তাদের ক্ষীণপ্রাণে জীবনের সব সংজ্ঞা হাজির করেছে। প্রতীকী এই কবিতায় এলিয়ট নিজের জীবনের অনেক সুখস্মৃতিই স্মরণ করেছেন, যা হয়তো এপ্রিলের সজীব প্রকৃতির ছোঁয়া না পেলে কখনোই উঠে আসত না তার কলমে। নাকি সবকিছু ছাপিয়ে এপ্রিলের এই সজীবতা তিনি খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন এমিলি হেইল বা ভিভিয়েনের কাছে? যা আসেনি বলে নিছক অভিমানের বশেই এপ্রিল হয়ে গিয়েছে এক নির্মম মাস।
এমিলি ও এলিয়টের বিচ্ছেদ
‘১৯৪৭-এর শীতে ভিভিয়েনের মৃত্যুর পর আমি আচমকা উপলব্ধি করি, আমি আসলে এমিলি হেইলকে ভালোবাসতাম না। আমি বুঝতে পারি এমিলির প্রতি আমার ভালোবাসা যেন অনেকটা এক প্রেতাত্মার প্রতি আরেক প্রেতাত্মার ভালোবাসা। আর তাকে দেওয়া আমার চিঠিগুলো যেন একজন মোহগ্রস্ত মানুষের লেখা।’ এমিলি হেইলের সঙ্গে বিচ্ছেদকে এভাবেই বর্ণনা করেছিলেন কবি টমাস এলিয়ট। তবে তিনি সত্যিকার অর্থেই মোহগ্রস্ত ছিলেন কি না, তা প্রকাশিত চিঠি থেকে কোনোভাবেই বোঝা যায় না। অন্তত চিঠির ভাষা এই কথা প্রকাশ করে, এমিলির প্রতি এলিয়ট বেশ দুর্বল ছিলেন। এমিলিকে পাঠানো দ্বিতীয় চিঠিতেই মার্কিন এই কবি লিখেছিলেন, ‘তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা আমার জীবনের সবচেয়ে সেরা প্রাপ্তি।’
এলিয়টের মতো এমিলি হেইলও নিজের মতামত দিয়েছেন এলিয়টকে নিয়ে, যা ‘টি এস এলিয়ট ও আমার বছরব্যাপী চলা বন্ধুত্বের একটি ছোট পর্যালোচনা’ শিরোনামে এখনো প্রিন্সটনের ফায়ারস্টোন লাইব্রেরিতে রয়ে গিয়েছে। হার্ভার্ডে রেখে যাওয়া এলিয়টের বক্তব্যের তুলনায় এমিলির লেখা অনেক বেশি গোছানো এবং ভদ্রস্থ বলা চলে। তিনি বেশ নিপুণভাবে এলিয়টকে ব্যাখ্যা করেছেন একজন প্রতিভাবান, আবেগী ও অনুভূতিসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে। ভিভিয়েনের মৃত্যুর পর তাদের বিচ্ছেদকে বর্ণনা করেছেন একান্ত ব্যক্তিগত হিসেবে।
এমিলি-পরবর্তী জীবন
এলিয়টের কবি জীবনে সফলতা এমিলির সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ধরা দেয়। ১৯৪৭ সালে দুজনের বিচ্ছেদের পর ১৯৪৮ সালে নোবেল পুরস্কার পান টিএস এলিয়ট। তার চারটি বিখ্যাত কবিতার সমন্বয়ে গড়া ‘ফোর কোয়াট্রেট’-এর কল্যাণে সাহিত্য জগতের সবচেয়ে বড় এই সম্মাননা পান তিনি। এ ছাড়া একের পর এক অসাধারণ নাটকও লিখতে থাকেন তিনি। ১৯৫৭ সালের ১০ জানুয়ারি আবারও বিয়ে করেন এলিয়ট। ব্যক্তিজীবনে নিঃসন্তান এলিয়ট এরপরের জীবনে নতুন কবিদের জন্য কাজ করতে থাকেন। ওয়েলশিয়ান ইউনিভার্সিটি প্রেসে সম্পাদক হিসেবে কাজ করার সময় অনেক নবীন কবিকে সুযোগ দিতে থাকেন। ১৯৬৫ সালে ৭৬ বছর বয়সে পৃথিবীকে বিদায় জানান এই কিংবদন্তি। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি পুরো জীবন ব্যয় করেছেন সাহিত্যের গণ্ডিতে।
লন্ডনে এখনো এপ্রিল মাস আসে। এ মাস এলে জার্মানিতে এলিয়টের উপভোগ করা সকালগুলো এখনো হাসে নিজের মতো করে। প্রতি বছরই এপ্রিলের লেগে থাকা বসন্ত কাউকে আহ্বান জানায় নতুনের দিকে। আবার কাউকে হয়তো এলিয়টের মতোই গ্রাস করে বিষণœতায়। কবি এলিয়ট পৃথিবী ছেড়েছেন অনেক আগেই। তবু থেমে নেই তাকে নিয়ে চলমান বিতর্ক। একজন ভিভিয়েন বা এমিলি হেইল দিয়ে তাকে কখনোই মূল্যায়ন করা যায় না, যেমন মূল্যায়ন করা যায়নি কাদম্বরী দেবীর রবীন্দ্রনাথকেও। সব ছাপিয়ে এলিয়ট হয়তো আরও অনেক দিন বাঁচবেন তার অমর সব সাহিত্যগুণের জন্য। তবে কখনো খুব গোপনে প্রকৃতি দেখে বিষণ্ণ হলে তাই আক্ষেপ করার কিছু নেই। হয়তো আপনার পাশে অন্যলোক থেকে তখন টমাস স্টেয়ার্ন্স এলিয়টও ঘোষণা করছেন ‘এপ্রিল বড় নিষ্ঠুরতম মাস!’।
