‘সখী’ চললেন ওপারে, তাকে ফেরানো গেল না

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২১, ০৩:০৯ এএম

তার করোনা আক্রান্ত হওয়ার খবর প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই ভক্তদের মাঝে ছিল উদ্বেগ। ৫ এপ্রিল করোনা রিপোর্ট পজিটিভ আসে তার। এরপর থেকে দ্রুতই অবনতি হতে থাকে তার স্বাস্থ্যের। বৃহস্পতিবার বিকেলে লাইফ সাপোর্ট নেওয়া হয় কিংবদন্তি অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরীকে।

ভক্তরা আশায় বুক বেঁধে ছিলেন, অন্তত এ যাত্রায় তাদের প্রিয় কবরী ফিরে আসবেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন হাজারো পোস্ট ভাসছিল দু’দিন ধরে। কিন্তু ‘মিষ্টি মেয়ে’ খ্যাত কবরী আর ফিরলেন না। ভক্তদের কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন ১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত রোমান্টিক চলচ্চিত্র ‘সুজন সখী’র নায়িকা ‘সখী’।

সিনেমায় নায়ক-নায়িকারা তো জীবনকেই ফুটিয়ে তোলেন। জীবনের নানা দিক তুলে ধরতে ধরতেই তারা হয়ে যান ভক্তদের পরিবারেরই অংশ। কবরী তো তেমনই একজন। যাকে ছাড়া বাংলা সিনেমার ইতিহাস কোনো ভাবেই লেখা সম্ভব নয়।

কবরীর এই চলে যাওয়ায় শুধু বিনোদন জগৎ নয়, শোকে কাতর পুরো জাতি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও যা ফোটে উঠছে। অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি মানুষের হৃদয়ে ছিলেন কতখানি, তারই যেন বহিঃপ্রকাশ ঘটছে নেট দুনিয়া। 

অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী তার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘কবরী আপা নেই.....!!!! আমাদের স্বপ্নের নায়িকা… কোন অনুষ্ঠানে প্রথম দেখা হয়েছিল মনে নেই। শেষ যে বার দেখা হয়েছিল তার সাথে, আবদার করেছিলাম, একটা ছবি তোলার। খুব স্পষ্ট মনে আছে, বলেছিলেন, ‘চঞ্চল, আমি তোমার ‘মনপুরা’র ভক্ত’’। ভালো থাকবেন কবরী আপা। কয়েক দিন ধরেই আপনার সাথে তোলা ছবি গুলো খুঁজছিলাম… এখন পেলাম…। যখন আপনি অনেক দুরে।’

সংগীত শিল্পী বেলাল খান লিখেছেন, ‘আমাদের কৈশোর কালের নায়িকা ছিলেন কবরী। মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। কী মিষ্টি হাসি তার! শেষ বয়সে এসে রাজনীতিতেও নাম লেখালেন। এমপি হলেন। করোনা আক্রান্ত হয়ে গত কয়েকদিন ধরেই আইসিইউতে মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটরে ছিলেন তিনি। আজ চলে গেলেন চিরতরে।’ 

শুক্রবার রাত ১২টা ২০মিনিটে রাজধানীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন কবরী।

গত ৫ এপ্রিল করোনাভাইরাস রিপোর্ট ‘পজিটিভ’ আসার পরপরই রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল কবরীকে। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে ৮ এপ্রিল শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়।

বৃহস্পতিবার বিকেলে লাইফ সাপোর্ট নেওয়া হয় সাবেক সংসদ সদস্য, চিত্রনায়িকা ও নির্মাতা সারাহ বেগম কবরীকে। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।

কববীর এই চলে যাওয়া নিয়ে সাহিত্যিক ও সাংবাদিক মোস্তফা মামুন তার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছে, ‘সখী’ চললেন ওপারে। তাকে ফেরানো গেল না।’ 

তার আগের স্ট্যাটাসটি ছিল এমন, ‘সুজন-সখী ফারুক আর কবরী দুই দেশের দুই হাসপাতালে জীবন বাঁচাতে লড়ছেন। পর্দায় তাদের মিল ছিল খান আতা-আমজাদ হোসেনদের বানানো। পরে রাজনীতিতে নেমে একদল থেকে এমপি হয়ে দুজন মিললেন আবার। আসল কারিগরও যে শেষবেলায় তাদের এভাবে মিলিয়ে দেবেন কে জানত! জীবনে আমাদের আফুরান আনন্দ দিয়েছেন। সেই দায় থেকে প্রার্থনা করি শেষ মুহূর্তে হয়ে যাক আরেকটা সিনেমা। ফিরে আসুন সব তুচ্ছ করে। অবশ্য জানি এবং মানি জীবন-মরণের স্ক্রিপ্ট খান আতারা লিখেন না।’ 

উল্লেখ্য, চিত্র নায়ক ফারুক সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ‘সুজন সখী’ চলচিত্রে যিনি কবরীর বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন। পরে এই জুটি উপহার দেয় আরো দর্শক নন্দিত ছবি।

ক্রীড়া সাংবাদিক মহিউদ্দিন পলাশ তার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘সুজনের সখী চলে গেলেন। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই মিষ্টি চেহারাটি। সুতরাং, রংবাজ, সাত ভাই চম্পা, অরুন বরুন কিরন মালা, ময়নামতি, নীল আকাশের নিচে, যে আগুনে পুড়ি, ক খ গ ঘ ঙ, বিনিময়, কাঁচ কাটা হীরা, সারেং বউ, বধু বিদায়, অবাক পৃথিবী, মধুমতি, ছোট মা, দিন যায় কথা থাকে, বিনিময়, মধুমতি, আগুন্তক, তিতাস একটি নদীর নাম, ঈমান, আরাধনা, দেবদাস, সুজন সখীসহ এ রকম আরো অনেক ছবির নাম। যেখানে তার অভিনয় মনে দাগ কেটে গেছে অগুনিত মানুষের। বাংলা চলচিত্রকে নিয়ে গেছেন অনেক উচ্চতায়। মনে হচ্ছে খুবই কাছের আপনজনকে হারিয়েছি। ওপারে ভালো থাকবেন প্রিয় অভিনেত্রী কবরী।’ 

ফেইসবুকে সেলিম নজরুল হক লিখেছেন, ‘অফুরন্ত অবিনাশী স্মৃতি রেখে - চিরবিদায় কবরীর।’ 

কবরী ১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব-কৈশোর কেটেছে চট্টগ্রামে।

১৯৬৩ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে নৃত্যশিল্পী হিসেবে মঞ্চে আবির্ভাব কবরীর। পরের বছরই সুভাষ দত্তের পরিচালনায় ‘সুতরাং’ সিনেমায় নায়িকা হিসেবে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে সিনেমায় শুরু তার ক্যারিয়ার।

এরপর ‘হীরামন’, ‘ময়নামতি’, ‘চোরাবালি’, ‘পারুলের সংসার’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘ঢেউয়ের পর ঢেউ, ‘পরিচয়’, ‘দেবদাস’, ‘অধিকার’, ‘বেঈমান’, ‘অবাক পৃথিবী, ‘সোনালী আকাশ’, ‘দীপ নেভে নাই’, ‘বিনিময়’, ‘আগন্তুক’, ‘সারেং বউ’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ এর ম‌তো দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন কবরী।

২০০৬ সালে তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘আয়না’ মুক্তি পায়। মৃত্যুর আগে ‘এই তুমি সেই তুমি’ না‌মে দ্বিতীয় চল‌চ্চিত্র নির্মাণ করছিলেন। অভিনয় ও নির্মাণের পাশাপাশি লেখালেখিতেও যুক্ত ছিলেন। ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে তার লেখা আত্মজীবনী ‘স্মৃতিটুকু থাক’।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় গিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন কবরী। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত