রাজধানীর উত্তরার নিজ ফ্ল্যাট থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক শিক্ষক ও কলামনিস্ট অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল শনিবার দুপুর ১২টার দিকে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রজেক্টের ৪ নম্বর সড়কের ১২/এ দোলনচাঁপা
ভবনের একটি ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে তার মরদেহ উদ্ধার করে তুরাগ থানার পুলিশ। পুলিশের ধারণা, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে। লাশ উদ্ধারের পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইমসিন টিম, গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগ ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, বাসার বাথরুমের দরজার সামনে বমির ওপর পড়েছিল শামসুর রেহমানের মরদেহ। এ সময় তার পা ছিল বাথরুমের ভেতর। বাকি শরীর ছিল দরজার সামনে। তার শরীরে ছিল সাদা রঙের স্যান্ডো গেঞ্জি ও কালো রঙের প্যান্ট। আর তার ডান পায়ে ছিল মোজা। এ ছাড়া মরদেহের আশপাশে অনেক রক্তও ছিল। ওই ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন তিনি। স্ত্রী ও মেয়ে থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) শচীন মৌলিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে বাথরুমের সামনে তারেক শামসুর রেহমানের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি স্ট্রোক করেছিলেন। তার আশপাশে বমির সঙ্গে রক্তও দেখা গেছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।’
তুরাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আলী আজম দেশ রূপান্তরকে জানান, বেলা ১১টার দিকে সংবাদ পেয়ে ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে যাই। তার ঘরের দরজা ভেতর থেকে লাগানো ছিল। অনেক ডাকাডাকির পরও দরজা না খোলায় স্থানীয়দের উপস্থিতিতে দরজার লক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করা হয়।
রাজউকের উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রজেক্টের প্রকল্প পরিচালক মো. মোজাফফর আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, শনিবার সকালে তারেক শামসুর রহমানের বাসায় যান তার বাসার গৃহকর্মী। তখন তিনি দরজার বাইরে থেকে কলবেল বাজাতে থাকলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই এবং কেউ দরজা খুলছিল না। পরে গৃহকর্মী নিচে গিয়ে বাড়ির নিরাপত্তারক্ষীকে বিষয়টি জানান। এরপর ওই ভবনের লোকজন ও আশপাশের সবাই ওই বাসার দরজায় গিয়ে তারেক শামসুর রেহমানকে ডাকাডাকি করলেও তার কোনো সাড়াশব্দ পায়নি। পরে বেলা ১১টার দিকে ফোন করে বিষয়টি তুরাগ থানা পুলিশকে জানানো হয়। পরে পুলিশ ওই বাসার দরজা ভেঙে তার মরদেহ উদ্ধার করে। পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে নিয়ে গেছে।
রাসেল নামে এক প্রতিবেশী বলেন, সকালে স্যারের সাড়া না পেয়ে বুয়া আমাদের খবর দেন। আমরা এসে দরজায় অনেক ধাক্কাধাক্কি করেও স্যারের সাড়া পাইনি।
স্বজনরা জানান, ড. তারেক শামসুর রেহমান উত্তরার ওই ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন। তার স্ত্রী ও মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি একাই আছেন। দুই বছর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা থেকে অবসর নেন তিনি। বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিয়মিত কলাম লিখতেন তিনি।
মৃত্যুর খবর শুনে ছুটে আসেন ড. তারেক শামসুর রেহমানের ভাগ্নে তারিখ হাসান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফুপা বেশ কিছুদিন ধরে শারীরিক বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছিলেন। হার্টে ব্লক ছিল। এ ছাড়া আলসারের সমস্যাও ছিল। এ অবস্থায় প্রায় ২৫ বছর ধরে বাংলাদেশে একা থাকতেন। মাঝেমধ্যে আমেরিকায় মেয়ে ও স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। সম্প্রতি যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু লকডাউনের জন্য যাওয়া সম্ভব হয়নি। তার স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। তাদের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী করণীয় ঠিক করব।’
উত্তরা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. শহীদুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, তারেক শামসুর রেহমানের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে আমরা বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখছি। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
ড. তারেক শামসুর রেহমান জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ে সরকার ও রাজনীতি বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশ বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক সদস্য তারেক শামসুর রেহমান। বাংলাদেশ, দক্ষিণ এশিয়া ও বৈশি^ক রাজনীতি নিয়ে তার অনেক গ্রন্থ রয়েছে। বই লেখার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে কলাম লিখতেন। বছর দুই আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় থেকে অবসরে যান এই শিক্ষক। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রির অধিকারী ড. রেহমান ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। তুলনামূলক রাজনীতি তার আরেকটি গবেষণার বিষয়।
তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ইরাক যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক রাজনীতি, গণতন্ত্রের শত্রু-মিত্র, নয়া বিশ^ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বিশ^ রাজনীতির চালচিত্র, উপ-আঞ্চলিক জোট, ট্রানজিট ইস্যু ও গ্যাস রপ্তানি প্রসঙ্গ, বাংলাদেশ : রাষ্ট্র ও রাজনীতি, বাংলাদেশ : রাজনীতির ২৫ বছর, বাংলাদেশ : রাজনীতির চার দশক, গঙ্গার পানি চুক্তি : প্রেক্ষিত ও সম্ভাবনা, সোভিয়েত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, বিশ^ রাজনীতির ১০০ বছর ইত্যাদি।
শোক : অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন ইউজিসির চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. কাজী শহীদুল্লাহ। এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমান একজন খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ছিলেন। তিনি তার গবেষণা ও লেখনীর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, পররাষ্ট্রনীতি, কূটনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। ইউজিসির চেয়ারম্যান তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
ড. তারেক শামসুর রেহমানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, ‘ড. তারেক শামসুর রেহমানের মৃত্যুতে জাতি শিক্ষাবিদ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে একজন শিক্ষককে হারাল। শিক্ষা, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে তার জ্ঞানচর্চা সবার কাছে প্রসিদ্ধ ছিল। তিনি কর্মগুণে অমর হয়ে থাকবেন।’
