প্রথম দিনেই প্রবাসীদের কর্মস্থলে ফেরানোর উদ্যোগ হোঁচট খেয়েছে। ১২টি এয়ারলাইনসের ১৪ বিশেষ ফ্লাইটের সাতটিই বাতিল করা হয়েছে। এয়ারলাইনসগুলোর দাবি, সৌদি আরবের অনুমতি না দেওয়া এবং কাক্সিক্ষত যাত্রী না আসায় এসব ফ্লাইট বাতিল করা হয়।
ফ্লাইট বাতিলের খবরে রাজধানীর কারওয়ানবাজার ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুক্রবার রাত থেকে গতকাল শনিবার বিক্ষোভ করেন প্রবাসী শ্রমিকরা। সাউদিয়া এয়ারলাইনসের টিকিটের দাবিতে তারা কারওয়ানবাজারে সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় ভিসার মেয়াদ শেষের দিকে থাকা শ্রমিকরা বেকার হওয়ার ভয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
বিমানের রিয়াদ, দাম্মাম, দুবাই ও সিঙ্গাপুর ফ্লাইট বাতিল করায় শত শত যাত্রী শাহজালাল বিমানবন্দরে আটকা পড়েন। তারা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) প্রতিনিধিদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
প্রবাসী শ্রমিকদের অভিযোগ, বিমান কর্র্তৃপক্ষ সঠিক সময়ে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি নিতে না পারায় লেজেগোবরে অবস্থা হয়েছে। তবে বিমানের দাবি, ঢাকায় বসে করার কিছু নেই। চেক ইন করার সময় শেষ মুহূর্তে এসে সৌদি কর্র্তৃপক্ষ বিমানের ফ্লাইটের সøট বাতিলের তথ্য দেয়। ফলে সব প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও ফ্লাইট বাতিল করা হয়।
এ বিষয়ে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ারভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশেষ ফ্লাইটের জন্য আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। সৌদি আরবের ল্যান্ডিং অনুমতি না পাওয়ায় বাতিল করা হয়। তবে শেষ মুহূর্তে আজ (গতকাল) অনুমতি পাওয়া গেছে। আশা করছি, রবিবার থেকে নির্দিষ্ট সময়ে সব ফ্লাইট ঢাকা ছেড়ে যাবে।’
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, গতকাল বিমানের রিয়াদগামী ফ্লাইট (বিজি-৫০৩৯) সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে ছাড়ার কথা ছিল। এজন্য নির্দেশনা অনুসারে ছয় ঘণ্টা আগে কার্যত লকডাউনের মধ্যে শুক্রবার রাত ১টার মধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসেন যাত্রীরা। কিন্তু এসে ফ্লাইট বাতিলের খবর পান। এরপর বিক্ষোভ শুরু করলে রাতেই যাত্রীদের হোটেলে রাখার ব্যবস্থা করে কর্র্তৃপক্ষ।
গতকাল বিমানের পাঁচটি ফ্লাইটের চারটি বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের দাম্মাম ও রিয়াদে একটি করে এবং দুবাইয়ে দুটি। যদিও রাতের জেদ্দাগামী ফ্লাইটের শিডিউল ঠিক রয়েছে। সৌদি আরবের অনুমতির আশায় রয়েছে কর্র্তৃপক্ষ। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জেদ্দাগামী ফ্লাইটের যাত্রীদের চেকইন শেষ হয়েছে।
সৌদিগামী যেসব যাত্রী গত বুধবার থেকে ফ্লাইট মিস করেছেন, তাদের জন্য আজ রবিবার থেকে সৌদি এয়ারলাইনসের ফ্লাইট চালু হবে জানিয়েছেন সৌদি এয়ারলাইনসের প্রধান শাখার ব্যবস্থাপক জাহিদুল আমিন। তিনি বলেন, ‘১৪ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ফ্লাইটের যেসব যাত্রী যেতে পারেননি, তাদের আজ থেকে সৌদি আরবে পাঠানো হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে ১৫ এপ্রিলের টিকিট ১৯ এপ্রিল, ১৬ এপ্রিলের টিকিট ২০ এপ্রিল, ১৭ এপ্রিলের টিকিট ২১ এপ্রিল ও ১৮ এপ্রিলের টিকিট ২২ এপ্রিল দেওয়া হবে। আর ১৯ থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত সৌদিগামী ফ্লাইটের যাত্রীদের তারিখ পরে জানানো হবে।’
এদিকে গতকাল সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গিয়ে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ারভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান, বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. আবু সালেহ মোস্তফা কামাল, পররাষ্ট্র সচিব ড. মাসুদ বিন মোমেনসহ অন্যরা বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে বেবিচক চেয়ারম্যান ও পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এএইচএস তৌহিদ উল আহসান বিমানবন্দরের দোতলায় ৬ নম্বর গেটের সামনে জড়ো হওয়া যাত্রীদের কাছে গিয়ে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। তারা জানান, সৌদি আরব হঠাৎ সøট বাতিল করায় এমন অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান করা হবে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম-পিআর) তাহেরা খন্দকার জানান, রিয়াদগামী বিমানের বিশেষ ফ্লাইট দেশটিতে ল্যান্ডিং অনুমতি না পাওয়ায় বাতিল করা হয়। আর যাত্রী সংকটে দুবাইয়ের দুটি ও সৌদি আরবের দাম্মামগামী একটি ফ্লাইট বাতিল করা হয়। এসব ফ্লাইটে ২০-২২ জন করে যাত্রী ছিলেন। তবে বাতিল ফ্লাইটের যাত্রীদের টিকিট পরিবর্তন করার সুযোগ দেওয়া হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
বিমান ছাড়াও ফ্লাই দুবাইয়ের দুটি ও ইউএস বাংলার দুবাইগামী একটি ফ্লাইট বাতিল করা হয়। তবে বেহাল অবস্থার মধ্যেও গতকাল সকালে সালাম এয়ারের একটি বিশেষ ফ্লাইট ঢাকা থেকে যাত্রী নিয়ে দুবাই গেছে।
ইউএস বাংলার মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ‘সপ্তাহে ৯টি ফ্লাইট ঢাকা থেকে দুবাই, সাতটি ফ্লাইট ঢাকা থেকে মাস্কট, চারটি ফ্লাইট ঢাকা থেকে দোহা ও একটি ফ্লাইট ঢাকা থেকে সিঙ্গাপুরে পরিচালনা করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম দিনে মাত্র ২০ জন যাত্রী হওয়ায় আমাদের দুবাইগামী একটি ফ্লাইট বাতিল করতে হয়। চলমান বিধিনিষেধের কারণে অনেকে আসতে পারছেন না। এজন্য যাত্রী সংকট রয়েছে।’
গতকাল সরেজমিনে কারওয়ানবাজারের সৌদি এয়ারলাইনস ও বিমানের মতিঝিল কার্যালয়ে টিকিটের জন্য প্রবাসীদের ভিড় দেখা যায়। মতিঝিলে এক পর্যায়ে টিকিট বিক্রি সাময়িক স্থগিত রাখে বিমান।
এখানে শরীয়তপুরের নাজির মোহাম্মদ বলেন, ‘১৫ এপ্রিল বিমানে আমার ফ্লাইট ছিল, বাতিল করায় যেতে পারিনি। ফ্লাইট শুরু হবে শুনে মতিঝিলে এসে দেখছি, টিকিট বিক্রি বন্ধ। কী হবে বুঝতে পারছি না।’
গতকাল কারওয়ানবাজারে হোটেল সোনারগাঁওয়ে সাউদিয়া এয়ারের অফিসের সামনে শত শত যাত্রী বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন। দুপুর ১২টা পর্যন্ত অবরোধে আশপাশের সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সৌদি প্রবাসীদের অভিযোগ, লকডাউনের আগে ছুটিতে দেশে এসেছিলেন তারা। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ফিরতে পারছেন না। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। কর্ম হারানোর শঙ্কায় আছেন তারা।
মনির হোসেন নামে সৌদি প্রবাসী শ্রমিক বলেন, ‘আজ (গতকাল) রাতে ফ্লাইট। কিন্তু টিকিট নিশ্চিত হয়নি। বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে এসেছি। কিন্তু জানি না যেতে পারব কিনা?’
শাহজালাল বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ এইচ এম তৌহিদ উল আহসান বলেন, ‘ল্যান্ডিং পারমিশন পেতে বিলম্ব ও যাত্রী স্বল্পতায় ফ্লাইটগুলো বাতিল করা হয়েছে। আশা করছি, রবিবারের মধ্যে এ সমস্যার সমাধান হবে। ফ্লাইটও বাড়বে।’
করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ ঠেকাতে গত ১৪ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের জন্য সরকার ‘কঠোর বিধিনিষেধ’ জারি করে। এতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সব ফ্লাইট বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরে গত ১৫ এপ্রিল আন্তঃমন্ত্রলায় বৈঠকে গতকাল থেকে পরবর্তী এক সপ্তাহে সৌদি আরব, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সিঙ্গাপুরে অন্তত ১২০টি বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু প্রথম দিনেই ফ্লাইট বাতিলে লেজেগোবরে পরিস্থিতি দেখা দেয়।
