বক্স অফিস জাদুকর ওয়াসিমের বিদায়

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২১, ১২:২৭ এএম

ঢালিউডের ইতিহাসে ওয়াসিম এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের নাম। ফোক ফ্যান্টাসি ও পোশাকি ছবিতে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাকে বলা হয় ‘ঢালিউডের বক্স অফিস জাদুকর’। সুঠাম দেহের সুদর্শন এই অভিনেতার বিদায়ে চলচ্চিত্র অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শেষ বিদায়ে তাকে স্মরণ করেছেন তার দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা। কথা বলেছেন আল মাসিদ

তার কোনো ফ্লপ ছবি ছিল না

সোহেল রানা

চলচ্চিত্র জগতে ‘তুই’ বলে ডাকার আর কেউ রইল না। ওয়াসিমও আমাকে ছেড়ে চলে গেল। ও আমার সিনেমার বন্ধু নয়। আমরা একসঙ্গে আনন্দ মোহন কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। পরে সিনেমায় কাজ করেছি। তাই দুজন দুজনকে তুই বলে ডাকতাম। আমি তো তাকে খুব একটা ওয়াসিম বলে ডাকিনি। নায়ক হওয়ার আগে ওর নাম ছিল মেজবাহ। কলকাতায় প্রসেনজিৎকে ২০-২৫ বছর হবে মুস্বা ডাকে কিন্তু আমি ওয়াসিমকে আদর করে বুম্বা ডাকি ৪৫ বছর ধরে। আমার ব্যস্ততার কারণে বলি আর স্বভাব দোষে বলি, খুব একটা বন্ধু নেই। মানুষ আমাকে রাগী, মুডি কত কী ভাবে। কিন্তু ওয়াসিমের সেই দোষ ছিল না। আমাকে সে মাঝে মাঝে প্রেমের বিষয়ে টিপস দিত। বলত, এটা কর, ওটা কর। তাহলে প্রেম হবে। আমি বলতাম, তুই আমাকে প্রেমের টিপস দিস? নিজেই তো জীবনে একটা প্রেম করতে পারলি না! ও এমন মানুষ ছিল, যার সঙ্গে কোনো দিন ছবি করেনি, তার সঙ্গেও সুসম্পর্ক ছিল। সিনেমা জগতে তার ভাই, বোন, চাচা, খালা, মামার অভাব ছিল না। কিন্তু শেষ জীবনে সেই মানুষটির খোঁজ কজন রেখেছে। যেসব পরিচালক-প্রযোজক তার ওপর ভর করে আজকে অনেক বড় নাম, তারাও কি খোঁজ নিয়েছে? ওর মতো সিনেমাপাগল আর সহজ-সরল লোক আমি দুটো দেখিনি। নয়তো কেউ জ্যান্ত অজগরের সঙ্গে লড়াইয়ের অভিনয় করতে পারে? অজগরটি তাকে পেঁচিয়ে এমনভাবে চাপ দিয়েছিল যে তার হাড্ডি শুধু ভাঙতে বাকি ছিল। অনেক দিন বেচারা স্বাভাবিকভাকে হাঁটতে-চলতে পারত না। অথচ তার এই ডেডিকেশনের কোনো মূল্য সে পায়নি। আমি সোহেল রানা বলছি, বাংলাদেশে সে-ই একমাত্র হিরো যার কোনো ফ্লপ ছবি ছিল না। হি ওয়াজ এ গ্রেট হিরো, রিয়েল স্টার, সুপারস্টার।

কিডনির অসুখকে খুব ভয় পেতেন

সুজাতা আজিম

ওয়াসিম আমার বেশ পরেই এসেছেন চলচ্চিত্রে। আজিম সাহেবের স্ত্রী হিসেবে অনেকের মতো তিনিও আমাকে ভাবি বলেই ডাকতেন। সিনেমায় আমার জুনিয়র ছিলেন বলেই একসঙ্গে খুব একটা ছবি করিনি। আর নায়ক-নায়িকা হিসেবে আমার প্রোডাকশনেরই একটি ছবিতে কাজ করেছি। ছবিটির নাম ‘জীবন মরণ’। তখন দেখতাম, তিনি খুব হাসি-খুশি থাকতেন। তার সামনে কেউ মুখ গোমড়া করে থাকতে পারত না। জোকস বলে, হাসি-ঠাট্টা করে মন ভালো করে দিতেন। ফোক ফ্যান্টাসি ছবিতে তো তিনি অনবদ্য। বডি বিল্ডার ছিলেন। সুদর্শন পুরুষ বলতে যা বোঝায়। দারুণ ফাইট করতেন, ঘোড়া চালনায় পারদর্শী ছিলেন। সর্বশেষ এফডিসিতে ডাবিং করতে গিয়ে দেখা কয়েক বছর আগে। তখন তার স্ত্রী মারা গেছেন কিডনির অসুখে। তার স্ত্রীর বড় বোন বিখ্যাত অভিনেত্রী রোজি আফসারীও কিন্তু কিডনির অসুখে মারা যান। তাই সেদিন বলছিলেন, ‘ভাবি, কিডনির অসুখকে খুব ভয় পাই।’ কিন্তু নিয়তি তাকে সেই কিডনির অসুখের কাছেই পরাজয় বরণ করিয়ে পৃথিবী থেকে নিয়ে গেল। আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন।

তার যথার্থ মূল্যায়ন হয়নি

রোজিনা

আর কাঁদতে পারছি না। প্রতিদিন কোনো না কোনো কাছের মানুষের বিদায়ের খবর শুনতে শুনতে কান ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। অনেক নায়কের সঙ্গেই কাজ করেছি। কিন্তু ওয়াসিম ভাই ছিলেন সত্যিই জেন্টলম্যান। খুবই সহজ সরল মানুষ। কাজ শেষে ঘরে ফিরতেন। কোনো দিন মদ্যপান করেননি। হিরোইনদের অসম্ভব সম্মান করতেন। তার কোনো শত্রু ছিল না। সবার সঙ্গেই দারুণ সম্পর্ক ছিল। একের পর এক হিট ছবি উপহার দিয়েছেন। অনেক কাজ করেছি তার সঙ্গে। তার চলে যাওয়ায় সেই স্মৃতিগুলো মনে পড়ছে। তিনি মি. ইস্ট পাকিস্তানের খেতাব জয় করেছিলেন বডি বিল্ডিংয়ে। আজকে যারা ইন্ডিয়ান হিরো সালমান খান বা অন্যদের বডি নিয়ে এত উৎসাহী তারা ওয়াসিমের ফিগার দেখেছে? যেমন ফিগার, তেমনি গায়ের রং, লম্বা-চওড়া, আর মেধাবী অভিনয়। কিন্তু সেগুলো কোনোদিন আলোচনাতেই আসল না। যারা নিজেদের সিনেমাবোদ্ধা মনে করে, তারা ওয়াসিম ভাইকে পোশাকি ছবির থাপ্পা লাগিয়ে দিল। এই দুঃখবোধ তার আজীবন ছিল।

আপনার শূন্যস্থান পূর্ণ হওয়ার নয়

অঞ্জনা

একের পর এক গুণী মানুষের মৃত্যু। এটা মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। আরেকটি নক্ষত্রের পতন। আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি শক্তিমান চিত্রনায়ক ওয়াসিম ভাই আজ আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন। কী বলব, আসলেই বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি। কিছুই বলার নেই। আমার সঙ্গে অসংখ্য সুপার বাম্পারহিট চলচ্চিত্রের নায়ক হিসেবে তিনি অভিনয় করেছেন। এখন নূরী, প্রেমের সমাধি, ঈমানদার, দিদার, ডাকু ও দরবেশ, জুলুমের বদলা, সংঘাত, যাদুপুরী, নান্টু ঘটক, হীরামন, আলাদিন আলিবাবা সিন্দাবাদ, রাজ মুকুট, রাখে আল্লাহ মারে কে, খঞ্জর, নাগমাতা এই ১৫টি ছবির কথা মনে পড়ছে। কত মজার স্মৃতি। ওয়াসিম ভাই বেঁচে থাকবেন তার অমর কাজের মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রের স্বপ্নিল আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে। আপনার শূন্যস্থান কখনো পূর্ণ হওয়ার নয়। পরপারে ভালো থাকবেন এই প্রার্থনাই করি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত