চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণাধীন পাওয়ার প্ল্যান্টে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের ঘটনায় বাঁশখালী থানায় দুটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় শ্রমিক ও গ্রামবাসীসহ অন্তত ৩ হাজার ৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে পাওয়ার প্ল্যান্টের মামলায় ২২ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ১ হাজার ৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশের মামলায় আসামি অন্তত আড়াই হাজার। এদিকে নিহতদের মরদেহ গতকাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের পক্ষথেকে কোনো মামলা হয়নি।
বাঁশখালী থানার ওসি মোহাম্মদ সফিউল কবীর জানান, পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রকল্পের চিফ কো-অর্ডিনেটর ফারুক আহমদ বাদী হয়ে বাঁশখালী থানায় করা মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে ১০ কোটি টাকার মালামাল লুট এবং ১৫ কোটি টাকার মালামাল পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। ওই মামলায় গন্ডামারা গ্রামের পশ্চিম বড়ঘোনা এলাকার আবদুর রশিদকে এক নম্বর আসামি করা হয়েছে।
অন্যদিকে গন্ডা মারা পাওয়ার প্ল্যান্ট ফাঁড়ির দায়িত্বরত কর্মকর্তা এসআই রাশেদুজ্জামান বেগ বাদী হয়ে রাষ্ট্রীয় কর্তব্য পালনে বাধাদান ও পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে আরেকটি মামলা হয়েছে।
এদিকে গতকাল রবিবার ঘটনাস্থল গন্ডামারা এলাকা ঘুরে দেখা সর্বত্র থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। পাওয়ার প্ল্যান্টে এদিন কোনো কাজ হয়নি। শনিবারের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর দূরদূরান্তের শ্রমিকদের বেশিরভাগই এলাকা থেকে নিজ নিজ বাড়িতে চলে গেছেন। এদিকে প্রকল্পের শ্রমিক ও স্থানীয় লোকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের খবরে শ্রমিক ও এলাকাবাসীর মধ্যে আতংক বিরাজ করছে।
এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শনিবার থেকেই সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ। জেলা পুলিশ সুপার এস এম রশিদ উদ্দিন, আনোয়ারা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবিরসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা গতকাল সারা দিন বাঁশখালী অবস্থান করেন।
আনোয়ারা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, এলাকার পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত রয়েছে। তবে শ্রমিকরা না থাকায় পাওয়ার প্ল্যান্টে কোনো কাজ হয়নি। তিনি জানান, শনিবারের ঘটনায় দায়ের করা মামলা দুটি বিশেষ গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
পুলিশের তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত ডিআইজি (ক্রাইম) জাকির হোসেন গতকাল তদন্ত টিমের সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শ্রমিক ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেছেন। সে সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রকল্পে সংঘটিত ঘটনার ব্যাপারে কর্মরত শ্রমিক ও লোকজনের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য অবহিত হওয়ার চেষ্টা করছি।’
এদিকে শনিবারের ঘটনায় পুলিশের গুলিতে মারা যাওয়া শ্রমিকদের মরদেহ গতকাল পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের মধ্যে মাদ্রাসাছাত্র মাহমুদ রেজা মীন খানকে রবিবার পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। তখন মীনের ভাই আহমদ রেজা বলেন, আমরা তিন ভাই তিন বোনের মধ্যে মীন খান ছিল সবার ছোট। সে দাখিল পরীক্ষার্থী ছিল। মাদ্রাসা বন্ধ ও আর্থিক দৈন্যের কারণে মাসিক ১৬ হাজার টাকা বেতনে পাওয়ার প্ল্যান্টে শ্রমিক হিসেবে যোগদান করে। আমার নিরপরাধ ভাইকে যারা হত্যা করেছে তাদের বিচার চাই।’
শনিবার পাওয়ার প্ল্যান্টে বিভিন্ন দাবি নিয়ে বিক্ষোভরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে ৫ শ্রমিক নিহত এবং পুলিশসহ প্রায় অর্ধশত আহত হন। নিহত পাঁচজনের মধ্যে একজনের বাড়ি বাঁশখালী, বাকি চারজনের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়। আহতরা চমেক হাসপাতালসহ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ঘটনা তদন্তে পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উভয় কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
এর আগে ২০১৬ সালে প্রকল্পটির জায়গা অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে স্থানীয় লোকজনের আন্দোলন চলাকালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে চারজন মারা যান।
নিহতদের পরিবারকে ৩ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে আইনি নোটিস
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায় শ্রমিক ও পুলিশের সংঘর্ষে গুলিতে নিহত পাঁচজনের প্রত্যেকের পরিবারকে ৩ কোটি ও আহতদের পরিবারকে ২ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে আইনি নোটিস পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে গুলিতে শ্রমিক নিহতের ঘটনায় কারা দায়ী তা নিরূপণ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। গতকাল রবিবার মানবাধিকার ও আইনি সহায়তা সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পক্ষে এ নোটিস পাঠানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের দুই সচিব, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক সচিব, শিল্প সচিব, বাণিজ্য সচিব, শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ ১৬ জনের উদ্দেশে নোটিসটি পাঠান আসকের আইনজীবী সৈয়দা নাসরিন। সংস্থাটির আরেক আইনজীবী মো. শাহীনুজ্জামান শাহীন নোটিস পাঠানোর তথ্যটি দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেন।
নোটিসে ওই ঘটনায় নিহত এবং আহত শ্রমিকদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। নোটিস পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা ও ক্ষতিপূরণ দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না গ্রহণ করলে এর প্রতিকার চেয়ে উচ্চ আদালতে আবেদন করা হবে।
গত শনিবার বাঁশখালীতে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকায় বেতনভাতা নিয়ে অসন্তোষের জেরে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে পাঁচ শ্রমিক নিহত হন।
