করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণগ্রহীতাদের কিস্তি পরিশোধে জুন পর্যন্ত ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে এ খাতের ঋণগ্রহীতারা চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত যে কিস্তি দেওয়ার কথা ছিল তা না দিলেও কোনো গ্রাহক খেলাপি হবে না।
গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ থেকে এই ছাড় দিয়ে একটি সার্কুলার জারি করা হয়।
সার্কুলারে বলা হয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণ বা লিজ বা অগ্রিমের বিপরীতে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রদেয় কিস্তি চলতি বছরের ৩০ জুনের মধ্যে পরিশোধ করা হলে ঋণটি খেলাপি হবে না।
এছাড়া ঋণ বা লিজ বা অগ্রিমের ওপর সুদ বা মুনাফা হিসাবায়নের ক্ষেত্রে এ সংক্রান্ত বিদ্যমান নীতিমালা বলবৎ থাকবে। অর্থাৎ দেরিতে কিস্তি পরিশোধ করলে এর জন্য প্রচলিত নিয়মে সুদ দিতে হবে। তবে দেরিতে ঋণ পরিশোধের জন্য কোনো দণ্ড সুদ বা অতিরিক্ত ফি আরোপ করতে পারবে না আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন ১৯৯৩ এর ১৮(ছ) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ নির্দেশনা জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যা সার্কুলার প্রকাশের পর থেকে অনতিবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক।
করোনা মহামারীর প্রকোপ শুরুর পরপরই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধে ছাড় চার দফা সময় বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বছরের মার্চে দেশে করোনা শনাক্তের পরপরই প্রথম দফায় জুন পর্যন্ত ঋণ পরিশোধে ছাড় দেওয়া হয়। এরপর তা বাড়িয়ে সেপ্টেম্বর করা হয়। এভাবে সময় বাড়িয়ে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ঋণ পরিশোধে সময় দেওয়া হয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণগ্রহীতাদের।
কেবল আর্থিক প্রতিষ্ঠানই নয়, গত মার্চে ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধেও ছাড় দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ঋণ পরিশোধে ছাড় পায় ব্যাংকের ঋণগ্রহীতারা। তবে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ দেখা দেওয়ার পরপরই ব্যাংকের মেয়াদি ও চলতি ঋণ পরিশোধে ছাড়ের সময় আরও বাড়ানো হয়।
ফলে ব্যাংকের ঋণগ্রহীতারা মেয়াদি ঋণের বিদ্যমান সময়ের সঙ্গে আরও ৫০ শতাংশ সময় বাড়িয়ে নিতে পারছেন। এছাড়া যেসব গ্রাহক গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলতি ঋণের সুদ পরিশোধ করতে পারেননি, তারা চলতি বছরের মার্চ থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত ৬টি সমান ত্রৈমাসিক কিস্তিতে এই সুদ পরিশোধ করতে পারবে। এই সময়ে মূল ঋণ পরিশোধ না করে কেবল সুদ পরিশোধ করলে ঋণটি মেয়াদোত্তীর্ণ বা খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হবে না।
চলতি বছরের মার্চ থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তলবি প্রকৃতির ঋণ ৮টি সমান কিস্তিতে পরিশোধ করার সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ঋণ পরিশোধে এই ছাড় দেওয়া হয়েছে। ঋণগ্রহীতারা যাতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে সেই লক্ষ্য নিয়ে এই ছাড়ের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) চেয়ারম্যান ও আইপিডিসি ফ্যাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ না এলে আমরা হয়তো ঋণ পরিশোধের ছাড় দেওয়ায় রাজি থাকতাম না। এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে এই ছাড় দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। আমরা এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনিও বলেছেন, ব্যাংকের গ্রাহকরা যেহেতু ঋণ পরিশোধে ছাড় পাচ্ছে, সেহেতু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদেরও ছাড় পাওয়ার দরকার রয়েছে।’
এদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তারল্য সহায়তার জন্য গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ৭ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল দাবির বিষয়ে মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আইনজীবীর মতামত নিয়ে আমাদের জানাবে বলেছে। তবে আইনজীবীরা সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংককে তহবিল দেওয়ার বিষয়ে নেতিবাচক মতামত দেওয়ায় তহবিল পাওয়ার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত রয়েছে। তবে বর্তমান করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এলে আমরা আবার এই তহবিলের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রস্তাব জানাব।’
