ভারতে লকডাউনেও থামছে না সংক্রমণ-মৃত্যু

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২১, ০৩:৫৩ এএম

দৈনিক সংক্রমণের টানা রেকর্ডের পর এবার মৃত্যুতে আগের সব রেকর্ড ভাঙতে শুরু করেছে ভারতে। ‘করোনা সুনামিতে’ বিপর্যস্ত ভারতে গত মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এক হাজার ৭৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে। মহামারী শুরুর পর  থেকে দেশটিতে আর কখনোই একদিনে এতজনের মৃত্যু হয়নি। ওই সময়ে নতুন শনাক্ত হয়েছে ২ লাখ ৫৯ হাজার ১৭০ জন। এর আগের দিন পৌনে তিন লাখে  পৌঁছেছিল শনাক্ত। এদিকে সংক্রমণে লাগাম টানতে সারা দেশে না হলেও বড় অংশজুড়ে লকডাউন দেওয়া  হয়েছে। রাজধানী দিল্লিতে চলছে রাত্রিকালীন কারফিউ। অবশ্য কুম্ভমেলা এবং চার রাজ্যের ভোট পরিস্থিতিকে আরও ভয়ংকর করবে বলে শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। টানা ছয়দিন দুই লাখের বেশি রোগী দেখা দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটির লাখ লাখ মানুষকে এখন হাসপাতালের শয্যা, অক্সিজেন ও ওষুধ জোগাড়ে লড়তে হচ্ছে। হাসপাতাল গেটে অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যেই মারা যাচ্ছে অনেক রোগী।

ভারতীয় কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফেব্রুয়ারিতে সংক্রমণের হার কয়েক মাসের মধ্যে কম দেখে সতর্কতায় ঢিলেঢালা ভাব চলে আসায় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনবহুল দেশটিকে এখন খেসারত দিতে হচ্ছে।

মঙ্গলবার দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে মঙ্গলবারের রেকর্ড মৃত্যু নিয়ে দেশটিতে মোট এক লাখ ৮০ হাজার ৫৩০ জন মারা গেল করোনায়। আর নতুন আড়াই লাখের বেশি রোগী নিয়ে শনাক্তের সংখ্যা ছাড়াল এক কোটি ৫৩ লাখ।

করোনার এই বাড়বাড়ন্তে দেশজুড়ে হাসপাতালে কোনো বেড পাওয়া যাচ্ছে না। পাওয়া যাচ্ছে না জীবনদায়ী ওষুধ। সব হাসপাতালের আইসিইউ ভর্তি। এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার হাসপাতালগুলো সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হবে। হয় সেগুলোকে পুরোপুরি করোনার চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হবে। তাতে অসুবিধা থাকলে একটা বড় অংশে করোনা রোগীদের চিকিৎসা হবে।

সব চেয়ে বড় কথা, প্রতিটি রাজ্যেই অক্সিজেনের অভাব দেখা দিয়েছে। মহারাষ্ট্র বারবার কেন্দ্রের কাছ থেকে অক্সিজেন চাইছে। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালও জানিয়েছেন, অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিটি রাজ্য থেকে একই রিপোর্ট আসছে। তারপর কেন্দ্রীয় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ২২ এপ্রিল থেকে শিল্পক্ষেত্রে অক্সিজেন ব্যবহার করা যাবে না। সেই অক্সিজেন হাসপাতালে সরবরাহ করা হবে।

এবার কেন্দ্রীয় সরকার লকডাউন বা কোনো কড়াকড়ির কথা ঘোষণা করছে না। তারা রাজ্যগুলোকে বলছে, কড়া ব্যবস্থা নিতে। প্রায় প্রতিটি রাজ্যই এখন রাতে কারফিউ জারি করছে। বিহার, রাজস্থান, তামিলনাড়ু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সব স্কুল, সিনেমা হল, ধর্মস্থান, শপিং মল বন্ধ থাকবে। রাজস্থানও ৩ মে পর্যন্ত লকডাউনের ঘোষণা করেছে। এছাড়া মহারাষ্ট্র সরকার জানিয়েছে, দিল্লি, কেরালা, তামিলনাড়ু, গোয়ার মতো রাজ্য থেকে নেগেটিভ সার্টিফিকেট ছাড়া কাউকে রাজ্যে ঢুকতে দেওয়া হবে না।

রাজধানী দিল্লিতে সোমবার থেকে ৬ দিনের লকডাউন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উত্তর প্রদেশের লখনউ, প্রয়াগরাজ, নয়ডা, গাজিয়াবাদ, কানপুর, মিরাট, গোরক্ষপুর, বারানসিতে রাত ৮টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি হয়েছে। মধ্যপ্রদেশের ভোপাল, উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনসহ অনেক শহরেই রাতের কারফিউ বহাল আছে।

কঠোর এ বিধিনিষেধ সংক্রমণের গতি শ্লথ করবে এবং স্বাস্থ্য কাঠামোর ওপর চাপ কমাবে বলে প্রত্যাশা বিশেষজ্ঞদের। অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গৌতম আই মেননের মতে, ভারতে হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার ওপর এখন যে ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তার ফলে হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিতে পারলে হয়তো বেঁচে যেতেন এমন অনেকে হাসপাতালেই পৌঁছাতে পারছেন না।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়েস্ট্যাটিস্টিকস ও এপিডেমিওলজির অধ্যাপক ভ্রমর মুখোপাধ্যায় জানান, ভারতের অনেক অংশে এখনো ‘তথ্য অস্বীকারের’ চর্চা আছে। তার মতে, সবকিছু এতটাই ঘোলাটে যে মনে হচ্ছে কেউই আসলে পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে না। এটাই সবচেয়ে অদ্ভুত।

মহামারী মোকাবিলায় সরকার ব্যর্থ- এমন সমালোচনার মুখে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সোমবার এক ঘোষণায় ১ মে থেকে প্রাপ্তবয়স্ক সবাইকে টিকা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন। এখন পর্যন্ত দেশটির ১০ কোটি ৮৫ লাখ মানুষকে কভিড-১৯ টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকারি একটি পোর্টাল। টিকাগ্রহীতার এই সংখ্যা ভারতের মোট জনসংখ্যার তুলনায় খুবই নগণ্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত