আপাত খটখটে লেখা লিখি বলেই বোধহয় একধরনের হীনমন্যতা থেকে কবিদের একটু এড়িয়ে যাই। অনেক কবি বন্ধুদেরও দেখেছি মাঝেমধ্যে দেখা হলেই এমন ভাব করেন যে, তুমি আবার এখানে কেন বাপু! এসব বোঝার কম্ম তোমার নয়।
ঘটনাচক্রে একবার শঙ্খ ঘোষের বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। গুজরাত গণহত্যা নিয়ে ডকুমেন্টারি করার পরেও দু-একবার খোঁজ করেছিলেন। আমার এক বন্ধু ছিল শঙ্খ ঘোষের খুবই ঘনিষ্ঠ। তো সে কিছুতেই ছাড়বে না। আমাকে নিয়ে শঙ্ঘ ঘোষের বাড়ি যাবেই। শঙ্খদা আমার সঙ্গে আলাপ করবেন।
শঙ্খদা কখনো এসব অধ্যায় জানতেন না। আমার মতো তুচ্ছ লোককে নিয়ে অত ভাবার সময় কোথায় ওঁর। দু-তিন বছর পরে আর একটা ডকুমেন্টারি ফিল্ম করার পরে আবার বন্ধুর ডাক। তোকে যেতে হবেই। শঙ্খ ঘোষ আমাকে হুকুম করেছেন, তোকে পাকড়াও করে নিয়ে যেতে। এবার একটু নিমরাজি হলাম। আমার স্ত্রী শঙ্খ ঘোষের একনিষ্ঠ পাঠক। সেও বলতে লাগল এটা কিন্তু খুব অন্যায়। অত বড় মানুষটা বলছেন, আর তুমি যাবে না! শুনেই আমি কেটে পড়লাম। পরের অন্তত একমাস বন্ধুর ধারেকাছে গেলাম না। যদি যেতে হয় উল্টোডাঙ্গার ঈশ্বর চন্দ্র নিবাস শঙ্খদার আবাসনে।
গেলাম এক রবিবারের সকালে। তিন তলার ফ্ল্যাটের দরজা খুললেন স্বয়ং কবি। ছোট্ট ফ্ল্যাট। সহজ যাপনের চিহ্ন ছড়িয়ে ছিটিয়ে সর্বত্রই।
শঙ্খ ঘোষ মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় কর্তার মেজাজে সবাইকে আপ্যায়ন করতে লাগলেন। হাতে হাতে ঘুরছে প্লেট। তাতে কাজু, চিপস ও নামকরা দোকানের মিষ্টি।
ঘর ভর্তি বই আর বই। জানতাম না, রবিবার শঙ্খ ঘোষের বাসায় প্রবল আড্ডা হয়। নামি-অনামি কত কত লোক। চেনামুখ বলতে শঙ্খ দার জামাই আমার বন্ধু সোমেশ্বর ভৌমিক, কবি সব্যসাচী দেব, কবি অনুরাধা মহাপাত্র, জয়দেব বসু আর সম্ভবত সমাজকর্মী ইমানুল হক। আর অজ¯্র অচেনা সব মুখ। তরুণদের সংখ্যাই বেশি।
শঙ্খ ঘোষকে দেখছি। আস্তে কথা বলছেন। কিন্তু বড় সহজ। কোথাও কোনো দম্ভ নেই। ভীষণ আন্তরিকও। মনে মনে ভাবছি, এই মানুষটাকে এরকম করা ঠিক হয়নি। ডাকলেন তবু এলাম না, এটা ঠিক করিনি।
শঙ্খ ঘোষ জিজ্ঞেস করলেন, দূরে থাকা হয় বুঝি! বললাম, না কাছেই। ঢিল ছোড়া দূরত্ব আপনার আর আমার ফ্ল্যাট। এরপরে অবধারিত সেই প্রশ্ন যা আশঙ্কা করছিলাম। একইভাবে ভাববাচ্যে শঙ্খদা জানতে চাইলেন, তাহলে এতদিন আসা হয়নি কেন!
কী আর বলি! দুম করে বলে ফেললাম, ভয়ে আসিনি এতদিন। ঈষৎ চাপা দুষ্টু হেসে কৌতূহলী শঙ্খদা সোজাসুজি আমার দিকে তাকালেন। কীসের, কাকে ভয়! আমি না বলে পারলাম না যে, আপনাকে। আপনি শঙ্খ ঘোষ। যখন তখন রসকষহীন আমার মতো একজন অকবি আপনার কাছে আসতে পারে! ভয় লাগবে না!
সেদিন শঙ্খদা সবাইকে নিয়ে আমার মণিপুরের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি ছবিটা ধৈর্য ধরে দেখলেন। অন্ধকার ঘর। ছবি শেষ হতেই অদ্ভুত এক নৈঃশব্দ্য। নীরবতা যেন জন্ম দিয়েছে নতুন এক ভাষার। এক মিনিট দু মিনিট তিন মিনিট...শঙ্খ ঘোষের গমগমে গলা প্রায় বাণীর মতো ভেসে এলো জানালা খুলে দাও। অন্ধকার দূর হোক। আলো আসুক।
সেই মুহূর্তে শঙ্খ ঘোষের প্রশ্রয়ের হাসি আজ ওর চলে যাওয়ার পরে খুব মনে পড়ছে।
আলো জ্বলতেই শঙ্খ দার চোখ চিকচিক করছে। আনন্দে অথবা বিষাদে। তার কিছুদিন পরেই শঙ্খদা লিখলেন মণিপুরের মা।
শঙ্খদার সঙ্গে আমার অন্য আর একটা সম্পর্ক ছিল। তিনি তা জানতেন না। জানার কথাও নয়। পরে বলতেই সেই চাপা প্রশ্রয়ের হাসি। আমি তখন বেশ ছোট। কেন কীভাবে যেন যতীন ঘোষ বলে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। বুড়ো মানুষ। আমরা জ্যাঠতুতো খুড়তুতো ভাই বোনেরা দাদু দাদু করতাম। তিনি এলে সঙ্গে লজেন্স নিয়ে আসতেন বলে আমরা খুব ভালোবাসতাম ওকে। তিনি বরিশাল সেবা সমিতি বলে কী একটা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেও অবশ্য পরে বাবার কাছ থেকে জেনেছিলাম। পরে সেই দাদুকে দেখলেই আমরা লুকিয়ে পড়তাম। তিনি এসেই ছ’পুরুষের নাম মুখস্থ জানতে চাইতেন। আরও কত প্রশ্ন। গাভা কেন বিখ্যাত! দস্তিদার উপাধি পেলে কী করে ইত্যাদি হাজার প্রশ্ন। সঠিক উত্তর দিতে না পারলেই রেগে যেতেন। শঙ্খ ঘোষ খুব হাসতেন ওনার কাকা ওই আমাদের যতীন দাদুর কীর্তিকলাপ শুনে। শঙ্খ ঘোষ ছিলেন আদতে বরিশালের বানারীপাড়ার লোক। জন্মেছিলেন অবশ্য চাঁদপুরে। ১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। বাবা ছিলেন মনীন্দ্র ও মা অমলা ঘোষ। বাবার চাকরির সূত্রে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন পাবনায়। ম্যাট্রিক পাস করেছিলেন স্থানীয় চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ থেকে। পরে ১৯৫১ সালে গ্র্যাজুয়েট হন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে। ১৯৫৪ সালে এমএ করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
জীবনানন্দ দাশ পরবর্তী বাংলা কবিদের মধ্যে শঙ্খ ঘোষ নিঃসন্দেহে অন্যতম শ্রেষ্ঠ। পঞ্চাশের অন্যান্য বিশিষ্ট সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, বিনয় মজুমদার ও অলোক রঞ্জন দাশগুপ্ত আগেই চলে গেছেন। এখন চলে গেলেন শঙ্খ ঘোষ। কিছুদিন আগে প্রয়াত হয়েছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। কলকাতা যেন ক্রমেই নিঃস্ব হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ পরবর্তী সময়ে আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন শঙ্খদা। সত্তরের অগ্নিগর্ভ সময়ে চেনা অচেনা মানুষজনের মৃত্যু হলে আমরা একের পর এক কবিতা পড়েছি শঙ্খ ঘোষ আর বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের। যাদবপুরে শঙ্খদার অন্যতম প্রিয় ছাত্র তিমির সিংহ শহীদ হওয়ার পরে শঙ্খ ঘোষের আকুতি ভোলার নয়। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘ছেলে গেছে বনে’ আর শঙ্খ ঘোষের ‘বাবরের প্রার্থনা’ দিনে রাতে আমাদের সাহসী করে তুলেছিল। শঙ্খ ঘোষের কবিতা ,তার পুরস্কার নিয়ে বিস্তারিত লেখার লোকের অভাব নেই। আমি আফসোস করব রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা করে রাস্তায় নামার এক আদ্যন্ত কবি ও বুদ্ধিজীবী এই কঠিন সময়ে চলে গেলেন বলে। এই সেদিনও এনআরসি নিয়ে নাগরিক উচ্ছেদের প্রতিবাদে শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন মাটি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরে হাতেগোনা দু-একজনকে বাদ দিয়ে মিছিলে হাঁটতে অন্তত ইদানীং খুব কম কবিকেই দেখেছি। অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে সতত সোচ্চার ছিলেন শঙ্খ দা।
আমি কবি নই বলে হীনমন্যতায় ভুগতাম জেনে শঙ্খদা বলেছিলেন, কে বলে তুমি কবি নও! জলে চাঁদের ছায়া পড়লে যদি তোমার মন উথাল-পাতাল করে তখনই জানবে তোমার মধ্যেও আছে এক ঘুমিয়ে থাকা কবি।
শঙ্খ ঘোষের বাসায় একদিন যেতে চাইনি। আর আজ সেখানে খুব ভিড়। শঙ্খদা চুপচাপ শুয়ে আছেন। খুব ইচ্ছে করছে একবার ছুটে গিয়ে ওর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে।
লেখক : ভারতের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা