নিম্নমানের গম ক্রয় নয়

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২১, ১২:৪৪ এএম

মানুষের জীবনের মতো অর্থনীতিতেও আঘাত হেনে চলেছে করোনাভাইরাস মহামারী। এর আবশ্যিক প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারের পণ্য কেনাবেচায়। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য সরবরাহকারীরা মহামারীর সুযোগে নানা অনৈতিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে এ সময়। বুধবারেরদেশ রূপান্তরে প্রকাশিত একটি খবর এমন ঘটনারই পূর্বাভাস জানাচ্ছে।

প্রতিটি খাবারে একটি মান প্রোটিনের উপস্থিতি থাকে। এর কম প্রোটিন থাকলে খাদ্যপণ্যটিকে নিম্নমানের বলে চিহ্নিত করা হয়। মানুষের খাবারের খাদ্যমান ও পশুর খাবারের খাদ্যমান সহজাতভাবেই এক নয়। যে গমে সাড়ে ১২ শতাংশ প্রোটিন থাকে সেই গমই বাংলাদেশে আমদানি করা হয়। এর কম প্রোটিনের উপস্থিতি থাকলে তা উন্নত দেশে পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অথচ প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেল, সম্প্রতি দেশে সাড়ে ১০ শতাংশ প্রোটিনের উপস্থিতি সমৃদ্ধ গম আমদানির সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে করে দেশে মানুষের খাবারের অনুপযোগী গম আমদানীর পথ তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। এর আগেও ২০১৫ সালে ব্রাজিল থেকে নিম্নমানের গম আমদানি করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। সেই ঘটনা তখন বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। পরে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে নতুন উচ্চমানের গম আমদানীর নীতিমালা করা হয়। 

দেশে খাদ্য মজুদ কমে গেলে সরকার বিভিন্ন সময়ে বিদেশ থেকে খাবার আমদানি করে। এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয় প্রথমে দেশে টেন্ডার দেওয়ার মাধ্যমে। কেউ কাক্সিক্ষত মূল্যে পণ্য দিতে পারলে, সরকার তার কাছ থেকেই ক্রয় করে। তা পাওয়া না গেলে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের সহায়তা চাওয়া হয়। এই সরবরাহকারীরা নিজেদের মজুদকৃত পণ্য সরকারের কাছে বিক্রি করে। বিকল্প না থাকলে সরকার সেই পণ্য কিনতে বাধ্য হয়।

সম্প্রতি, সরকারি খাদ্য ভা-ারে মজুদ কমে গেছে। গত বছর এই সময় যেখানে ২ লাখ ৮০ হাজার টন গম ছিল, এ বছর সেখানে আছে মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার টন। চালের মজুদ পরিস্থিতিও সন্তোষজনক নয়। চালের বর্তমান মজুদ ৩ লাখ ৭১ হাজার টন, যা গত বছর এই সময় ছিল ১২ লাখ টন। সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়ে হাত বাড়ায় বিশ^বাজারে। খাদ্য সংকটের খবরে দাম বেড়ে যায় আন্তর্জাতিক বাজারেও। গম না পাওয়ার এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা গমের প্রোটিনের মাত্রা কমানোর পরামর্শ দেয় সরকারের নীতিনির্ধারকদের। কম মাত্রার প্রোটিনের গম সরবরাহে সমস্যা নেই বলে তারা জানায়। তাদের প্ররোচনায় সরকারের একটি অংশ বিনির্দেশ পরিবর্তনের কথা বলে। গত মাসে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির এক বৈঠকে বিনির্দেশ পরিবর্তনের জন্য বলা হলে অর্থমন্ত্রীসহ বৈঠকে অংশ  নেওয়া কয়েকজন মন্ত্রী এর বিরোধিতা করেন। পরিবর্তনের পক্ষের মন্ত্রীরা এরপরও চাপাচাপি করলে তা খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভায় উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। সেখানেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে কম প্রোটিনের গম আমদানি করা হবে কি না। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিট রয়েছে। তাদের কাজ হচ্ছে খাদ্যশস্যের চাহিদা, জোগান, সহজলভ্যতা, বাজার পরিস্থিতি এসব বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া। এই ইউনিটের আওতায় খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটি গঠন করা হয়। দেশে খাদ্য নীতিনির্ধারণী বিষয়ে এটা হচ্ছে সর্বোচ্চ ফোরাম। খাদ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এ কমিটিতে অর্থ, কৃষি, স্থানীয় সরকার, বাণিজ্যসহ আট মন্ত্রী রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে কমিটিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যাতে দেশের মানুষ পুষ্টিমান সমৃদ্ধ গম পায় তা নিশ্চিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

সাড়ে ১২ প্রোটিনের গম উৎপাদিত হয় কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে। ওইসব দেশ  থেকে গম আনতে গেলে লাভের পরিমাণ কম হয়। আর সাড়ে ১০ থেকে ১১ প্রোটিনের গম সহজেই ভারত থেকে আনা যায়। মূলত সরবরাহকারীদের সুবিধার জন্য গমের বিনির্দেশ বদলের চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশের জনসাধারণের বৃহত্তর স্বার্থে সরবরাহকারীদের অতিরিক্ত মুনাফলোভী চিন্তা এড়িয়ে প্রোটিন সমৃদ্ধ সাড়ে ১২ মাত্রার গম আমদানিতেই জোর দিতে হবে।  এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের দোদুল্যমানতা কাম্য নয়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে গম নিয়ে কোনো ধরনের কারসাজি যাতে না হয় সেদিকে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে। মনে রাখতে হবে জনস্বার্থই অগ্রাধিকার। আমদানিকারকদের মুনাফা বাড়াতে গিয়ে জনস্বার্থের ক্ষতি করা যাবে না। জনসাধারণ যাতে ভালোমানের গম পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত