‘লকডাউনে’ সুফল মিলছে

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২১, ০২:৪৪ এএম

করোনা নিয়ন্ত্রণে দেশে গত ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে গতকাল বুধবার শেষ হওয়া দুই দফার বিধিনিষেধের সুফল কিছুটা হলেও মিলতে শুরু করেছে। এই বিধিনিষেধের ১৭ দিনে সংক্রমণ কমেছে ৩৫ শতাংশ। পরীক্ষা অনুপাতে রোগী শনাক্ত হার ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ১৫ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। দৈনিক রোগী শনাক্তের সংখ্যাও কমে ৭ হাজার থেকে ৪ হাজারে পৌঁছেছে। কমতে শুরু করেছে মৃত্যুর সংখ্যাও। গত ১৬-১৯ এপ্রিল পর্যন্ত টানা চার দিন দৈনিক শতাধিক মানুষ মারা যায়। এর মধ্যে ১৯ এপ্রিল সর্বোচ্চ ১১২ জনের মৃত্যুর রেকর্ড হয়। কিন্তু গত মঙ্গল ও বুধবার মৃত্যু কিছুটা কমতে শুরু করে। এ সময় মারা যান যথাক্রমে ৯১ ও ৯৫ জন।

সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় সংক্রমিতদের শনাক্তের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর এ সময়ে ৪ হাজার ২৮০ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এ নিয়ে দেশে মারা গেলেন ১০ হাজার ৬৮৩ জন।

এমন পরিস্থিতিতে দেশে শেষ হওয়া দুই দফার বিধিনিষেধের সুফল মিলতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এখনো সংক্রমণ কমেছে বলা যাবে না, তবে সংক্রমণ পরিস্থিতি একটা স্থিতিশীল জায়গায় এসেছে। সংক্রমণ প্রবণতা কমের দিকে। পরপর দুই সপ্তাহ যদি সংক্রমণ কম থাকে, তবেই সংক্রমণ কমেছে বলা যাবে।

এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখনো শনাক্তের হার ২০ শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু উঠছে না। সবচেয়ে বেশি ছিল ২৩ শতাংশ। ওইখানে যাচ্ছে না। তার মানে সংক্রমণ স্থিতিশীল হয়ে আছে। মৃত্যুও কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। তারপরও ১০০-এর মতো মৃত্যু হচ্ছে। এটাও উচ্চ হার। শনাক্ত ২০ শতাংশ, এটাও অনেক উচ্চ হার। এটাকে নামিয়ে আনতে হবে।’

এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আশা করছি ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া যে সার্বিক নিয়ন্ত্রণ, সেটার ফলাফল ২৮ এপ্রিল নাগাদ দেখতে পাব। তখন সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা নিম্নগামী হতে পারে। তবে সংক্রমণের চেয়ে মৃত্যু নিম্নগামী হতে কিছুটা সময় লাগবে, আরও ধীরে হবে। অর্থাৎ দুই সপ্তাহ পরে সংক্রমণের প্রভাবটা বোঝা যাবে। আর মৃত্যুর সংখ্যাটা বোঝা যাবে তিন সপ্তাহ পর, মে মাসের প্রথম দিকে।’

তবে চলমান বিধিনিষেধ ঠিকমতো মানা না হলে এবং বিধিনিষেধ ধীরে ধীরে না তুলে একসঙ্গে হঠাৎ করে সবকিছু খুলে দিলে করোনা তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কাও করছেন বিশেষজ্ঞরা। তৃতীয় ঢেউ সামলাতে এবং করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আগামী দুই ঈদকে ঠিকমতো সামলানোর ওপরও জোর দিয়েছেন তারা। তাদের মতে, এসব মানা গেলে কোরবানি ঈদের পর শনাক্ত হার ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসতে পারে। সে পর্যন্ত সবাইকে কষ্ট করে স্বাস্থ্যবিধি ও সরকারের বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে।

১৭ দিনের বিধিনিষেধে সংক্রমণ কমেছে ৩৫ শতাংশ : করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় দেশে সীমিত আকারে গত ৫ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের বিধিনিষেধ শুরু হয়। পরে সেটি ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। পরদিন ১৪ এপ্রিল থেকে আট দিনের কঠোর বিধিনিষেধ শুরু হয় ও গতকাল শেষ হয়। আজ থেকে শুরু হচ্ছে আরও সাত দিনের কঠোর বিধিনিষেধ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিধিনিষেধের ১৭ দিনে সংক্রমণ ৩৫ শতাংশ কমেছে। ৪ এপ্রিল এক দিনে প্রথমবার ৭ হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়। সেদিন রোগী শনাক্তের হার ছিল ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে ৫ এপ্রিল থেকে ৯ দিনের টানা বিধিনিষেধের শেষ দিনে অর্থাৎ গত ১৩ এপ্রিল সংক্রমণ হার কমে আসে। ওইদিন ২৪ ঘণ্টায় ১৮ দশমিক ২৯ শতাংশ হারে ৬ হাজার ২৮ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়। শনাক্তের এ হার লকডাউন শুরুর আগের দিনের চেয়ে প্রায় ৫ শতাংশ কম।

তারপর গত ১৪ এপ্রিল থেকে আট দিনের কঠোর বিধিনিষেধ শুরু হয়, যা গতকাল শেষ হয়েছে। এই আট দিনে করোনার সংক্রমণ আরও কমে দাঁড়ায় ১৫ শতাংশে এবং রোগী শনাক্তও কমে চার হাজারে চলে আসে। গতকাল ১৫ দশমিক ০৭ শতাংশ হারে ৪ হাজার ২৮০ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে।

সংক্রমণ ও মৃত্যু নিম্নগামী : ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘৫ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত চলা ৯ দিনের সীমিত আকারের বিধিনিষেধ অনেক কার্যকরী হয়েছে। মূল কাজ হয়েছে ৫ এপ্রিল থেকে। সমস্ত কমিউনিটি সেন্টার, রাজনৈতিক কার্যকলাপ ও ওয়াজ মাহফিল বন্ধ। বিরোধী দলও রাজনৈতিক কর্মকা- বন্ধ করেছে। মসজিদে সীমিত আকারে মুসল্লিরা যাচ্ছে, যদিও সব জায়গায় এটা মানছে না। গণপরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে। বিপণিবিতান বন্ধ ছিল। মাঝখানে কিছুদিন চলেছে। তবে ১৪ এপ্রিল থেকে আবার বন্ধ হয়ে গেছে। ২৯ মার্চ থেকেই পর্যটন কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়েছে। অর্থাৎ জানুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত যেসব জায়গা থেকে সংক্রমণ বেশি ছড়িয়েছে, সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে এবং সেটার প্রভাব আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি। আর ১৪ এপ্রিল থেকে বাকিটুকুও বন্ধ করা হয়েছে। অবশ্যেই এটার একটা ইতিবাচক ফলাফল দেখা যাবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আট সদস্যের জনস্বাস্থ্যবিদ সমন্বয়ে গঠিত করোনাভাইরাস ব্যবস্থাপনা কোর কমিটির সদস্য ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যে সাত দিনের বিধিনিষেধ শেষ হলো এবং আরও সাত দিনের শুরু হচ্ছে, সেটার প্রভাব পাব আরও অন্তত ১০-১৫ দিন পরে। আমাদের যে ক্ষতি আগে হয়েছে, সেটার প্রভাব এখনো চলছে। এখনো শনাক্ত হার ১৫-২০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। কারণ যে সংক্রমণ ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে, সেটার রোগী ও মৃত্যু আমরা এখন দেখছি।’

এই জনস্বাস্থ্যবিদ বলেন, ‘বিধিনিষেধ কিছুটা হলেও মানছে মানুষ শতভাগ না হলেও বিধিনিষেধ অনেকটাই মানা হচ্ছে। সামাজিক সংমিশ্রণ ও ট্যুরিজম বন্ধ হয়েছে, গণপরিবহন বন্ধ হয়েছে। আমরা আশা করব মে মাসের মধ্যে সংক্রমণ কমে আসবে। এখন যে বিধিনিষেধ চলছে এটার প্রভাব আমরা পাব ১৪-১৫ মের দিকে। অর্থাৎ ১০ মের পর থেকে সংক্রমণ কমতে শুরু করবে।’

চলমান বিধিনিষেধ শেষে সংক্রমণ আরও কমবে : ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘৫ এপ্রিলের বিধিনিষেধের কার্যকারিতা এখন দেখছি। ১৯ এপ্রিল সেটার দুই সপ্তাহ হয়ে গেছে। সেটার প্রভাব দেখছি সংক্রমণ স্থিতিশীল, মৃত্যুর সংখ্যাও ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হচ্ছে। ৫ এপ্রিলের বিধিনিষেধ ছিল সীমিত আকারে। আর ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া বিধিনিষেধ, সেটা তো আরও বেশি কার্যকরী হওয়ার কথা। আমরা ২৮ এপ্রিলের দিকে সেটা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারব।’

আজ বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া আরও এক সপ্তাহের বিধিনিষেধ মানার ব্যাপারে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আমরা যত বেশি সমাবেশ, বিপণিবিতান ও গণপরিবহনের ভিড় পরিহার করতে পারব, ততই আমরা নিরাপদ পরিস্থিতির দিকে যাব।’

শিথিল করতে হবে ধীরে ধীরে : অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন বলেন, ‘আমরা আগেই দুই সপ্তাহের লকডাউনের সুপারিশ করেছিলাম। লকডাউনের উদ্দেশ্য হলো মানুষ যাতে মানুষের সঙ্গে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করে চলে। আমরা যদি বাসায় থাকি নিশ্চয়ই আমাদের সামাজিক দূরত্ব রক্ষা হবে। বাইরের মানুষের সঙ্গে মিশব না। যারা ভাইরাসের বাহক, তারা যদি ঘোরাঘুরি করে, তাদের থেকে সংক্রমণ অন্যদের মধ্যে ছড়াবে। আর যদি বাসায় থাকে সেটা কমিউনিটিতে ছড়াবে না।’

তিনি বলেন, ‘সংক্রমণ চক্রকে বাধা দিতে হলে কমপক্ষে ১৪ দিন লাগবে। আরও যে সাত দিনের লকডাউন শুরু হলো (আজ থেকে), সেটা কষ্ট করে হলেও মানতে হবে। কষ্ট করে আরেকটা সপ্তাহ চললে তারপরের সপ্তাহ থেকে ধীরে ধীরে লকডাউন শিথিল করা হবে। সংক্রমণ ও মৃত্যু কমতে শুরু করবে।’

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘সবকিছু অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে রাখা যাবে না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে, দোকান মালিক সমিতি, স্বাস্থ্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নিয়ে ধীরে ধীরে খুলে দিতে হবে। আরও কিছুদিন পর বিপণিবিতান খোলা যেতে পারে, যাতে ভিড় কম হয়। দরকার হলে মার্কেট ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকুক। যারা সচেতন, সংক্রমণ চায় না, তারা রাতে যাবে। ঈদের মার্কেট সারারাতই চলে। গণপরিবহনের সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে। বিআরটিসি সব বাস নামাতে হবে। বেসরকারি সংস্থাকেও আহ্বান জানাতে হবে গণপরিবহনে অবদান রাখার জন্য। রিকশা-ভ্যান চলতে দেওয়া যেতে পারে। কারণ খোলা আকাশের নিচে চলাচল করা এসব রিকশা ও ভ্যান অনেক নিরাপদ। এখানে সব একই পরিবারের লোকজন উঠে। এটাও সংক্রমণ পরিহার করার একটা উপায়। একটা বাসে গাদাগাদি করে না উঠে এসব অযান্ত্রিক যানবাহন অনেক বেশি নিরাপদ। তাদের চলার জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। এভাবে যদি আমরা চেতনা জাগিয়ে তুলতে পারি, তাহলে সবাই স্বাস্থ্যবিধি মানতে পারব।’

তিনি বলেন, ‘চলমান বিধিনিষেধ শিথিল করতে হবে ধীরে ধীরে। হঠাৎ করে সবকিছু একসঙ্গে খুলে দিলে এ বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চের মতো তৃতীয় ধাক্কা বিরাট হতে পারে। শিথিলতা বজায় রাখতে হবে সংক্রমণ শনাক্ত হার ৫ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত। যদি আমরা রোজা ও কোরবানির দুই ঈদের ধাক্কাটা সামলাতে পারি, তাহলে আশা করা যায় কোরবানির ঈদের পর শনাক্ত হার ৫ শতাংশের নিচে নামবে। এর মধ্যে কিছু সংক্রমণ বাড়বে। তবে সেটা আবার নেমে যাবে কোরবানি ঈদের পরে। সে পর্যন্ত কষ্ট করে বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে।’

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘সীমাবদ্ধ আকারে বিধিনিষেধ রাখা উচিত। আমরা প্রথমদিকে দেখেছি তরুণরা আক্রান্ত হলেও হাসপাতালে যেতে হয়নি। এখন শনাক্ত সংখ্যা বাড়ার কারণে তরুণ ও শিশুরাও আক্রান্ত দেখা যাচ্ছে। যদি আমরা তৃতীয় ঢেউয়ের মধ্যে পড়ি, সংক্রমণের মাত্রা আরও বাড়ে, ভাইরাসটা আরও ঘনীভূত হয়, সে ঘনীভূত ভাইরাসের সংক্রমণ ও মেরে ফেলার ক্ষমতা আরও বাড়বে। তাহলে আজ আমরা যারা তৃপ্তির মধ্যে আছি, দেখা যাবে তাদেরও আইসিইউতে যেতে হচ্ছে। সেটা আমাদের জন্য খুবই বেদনাদায়ক হবে।’

মাস্ক পরা ‘মাস্ট’ : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাস্ক পরতেই হবে। মাস্ক ছাড়া কেউ বাইরে যাবেন না। এর জন্য ওয়ার্ড কাউন্সিলার, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ সবাইকে এলাকাভিত্তিক ক্যাম্পেইন করতে হবে। প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মাস্ক পরা কার্যকর করতে হবে, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ও দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। এজন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও এলাকাভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত