হাজার কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২১, ০২:৪৭ এএম

রাজধানীর পল্টনে গাজি ভবনের মেসার্স ফারুক এন্টারপ্রাইজ গত রমজানে বিক্রির জন্য প্রায় ১০ কোটি টাকার বস্ত্র আমদানি করে। করোনা সংক্রমণের প্রথম ঢেউয়ে রমজানজুড়ে বন্ধ ছিল শপিং মল ও বিপণিবিতান। এতে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৮ কোটি টাকার পণ্য অবিক্রীত রয়ে যায়। অথচ মূলধনের বড় অংশই ব্যাংক ঋণ। বর্তমানে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সংক্রমণ ঠেকাতে সারা দেশে বন্ধ রয়েছে শপিং মল ও বিপণিবিতান। এ অবস্থা চলতে থাকলে এবারের রমজানেও এসব পণ্য অবিক্রীত থেকে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মাহবুবুল আলম খান দিলীপ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রমজানই আমাদের বিক্রির প্রধান মৌসুম, যা শবেবরাতের পর শুরু হয়। খুচরা বিক্রেতারা ক্রয়াদেশ দিতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ সব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চোখে সর্ষে ফুল দেখছি। এবারও গুদামের মালামাল বিক্রি করতে না পারলে সব নষ্ট হয়ে যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার মতোই অবস্থা অন্য ব্যবসায়ীদের। সবারই কম-বেশি ব্যাংক ঋণ রয়েছে। ফলে আমরা সরকারি স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকান খোলা রাখতে চাই। তাতে হয়তো লোকসানের ভার কিছুটা হলেও কমবে। নয়তো সবাইকে পথে বসতে হবে।’ রাজধানীর নিউমার্কেটের রোজ ফ্যাশনের বিক্রয়কর্মী মোহাম্মদ সোহেল বলেন, ‘গত রমজান উপলক্ষে পণ্য ওঠানো হলেও বেশির ভাগ অবিক্রীত থেকে যায়। গত মার্চ থেকে কিছু কিছু বিক্রি শুরু হয়। কিন্তু নতুন বিধিনিষেধের কারণে সব বন্ধ। এবারের রমজানে পণ্যগুলো বিক্রি করতে না পারলে নষ্ট হয়ে যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কোনো মাল টানা দুই বছর গুদামে থাকলে দাগ পড়ে, ফাঙ্গাস ধরে গন্ধ হয়ে যায়। এগুলো বিনা পয়সায় দিলেও কেউ নিতে চাইবে না। মহাজনের এতে কয়েক কোটি টাকা লোকসান হবে।’

রাজধানীর খিলখেতের একটি রেস্তোরাঁর মালিক মহিউদ্দীন মহারাজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১২ কর্মচারীসহ রেস্তোরাঁ পরিচালনায় আমার মাসে আড়াই লাখ টাকা খরচ। ঈদে বেড়ে সাড়ে ৩ লাখে পৌঁছে। পুরো বছর লোকসান দিয়েছি। ভাবছিলাম রমজানে হয়তো কিছু বেচাবিক্রি হবে। কিন্তু লকডাউনে সব বন্ধ হয়ে গেছে। ইফতারি বিক্রি করতে পারলেও ক্রেতা নেই। ফলে কর্মচারীদের বেতন নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছি। সরকার সুযোগ দিলে আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে সক্ষমতার অর্ধেক ক্রেতা নিয়ে রেস্টুরেন্ট চালাতে চাই। এতে কিছুটা হলেও খরচ উঠবে। সবই তো চলছে, তাহলে আমরা চালালে দোষ কী?’

করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশে। ইতিমধ্যে আক্রান্ত ও মৃত্যুতে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ৫ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহ এবং পরে ১৪ এপ্রিল থেকে কঠোর বিধিনিষেধ জারি করে সরকার। প্রথম বিধিনিষেধ আরোপের পর প্রতিবাদে সারা দেশে কয়েক দিন বিক্ষোভ করেন ব্যবসায়ীরা। পরে সরকারের কঠোর অবস্থানে সে আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা এখন দোকানপাট খোলার জন্য বিভিন্ন মহলে দৌড়ঝাঁপ করছেন। গত রবিবার সংবাদ সম্মেলন করে দোকানপাট খুলে দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানায় বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। ওই দিনই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘জীবন-জীবিকার তাগিদে সরকার ঈদের আগে লকডাউন শিথিলের চিন্তাভাবনা করছে।’ তার এ বক্তব্যের পর মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, আগামী সোমবারের মধ্যে সরকার এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত দিতে পারে।

দেশের শপিং মল ও এ খাতসংশ্লিষ্ট লোকবলের কোনো তথ্য সরকার কিংবা সংগঠনের কাছে নেই। তবে দোকান মালিক সমিতির দাবি, সব মিলে সারা দেশে প্রায় ৫০ লাখ দোকান রয়েছে। এসব দোকানে কর্মসংস্থান হয় প্রায় ২ কোটি মানুষের। সমিতির এ সংখ্যার মধ্যে চা-মুদিসহ সব ধরনের দোকান রয়েছে। এসব দোকানে বছরে সোয়া লাখ কোটি টাকার বেশি টার্নওভার হয়। এর মধ্যে শুধু রমজানেই ৫০ হাজার কোটি টাকার টার্নওভার হয় বলে ব্যবসায়ীরা বলছেন। অর্থাৎ বছরের মোট বিক্রির অর্ধেকই হয় রমজানে।

গত রমজানে কেবল মুদিদোকানেই বিক্রি চলেছে। বাকি সব বন্ধ ছিল; বিশেষ করে শপিং মল বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীদের ১৫-২০ হাজার কোটি টাকার কাপড়, শাড়ি, জুতা, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্য মজুদ রয়ে যায়। প্রসাধনী পণ্যের বড় অংশের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে কিংবা শেষ হওয়ার পথে। মজুদের কারণে এক বছরে অনেক পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার পথে। এসব পণ্য এ রমজানেই বিক্রি করতে হবে। না হলে আর কখনো বিক্রি করা যাবে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সহসভাপতি মাসুদ কাদের মনা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত রমজানে আমরা বিক্রি করতে পারিনি। এবারও না পারলে নিঃস্ব হয়ে যাব। সবকিছু ব্যাংকে বন্ধক রেখে ব্যবসা করি। পণ্য বিক্রি করতে না পারলে ব্যাংক ঋণ দিতে পারব না। ব্যাংক তো আমাদের মাফ করবে না। সরকারের প্রণোদনার টাকাও আমরা পাচ্ছি না। শ্রমিকের বেতন দেব কীভাবে?’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ, যেভাবে শিল্প-কারখানা ও গণপরিবহন চলছে, আমাদেরও দোকান পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হোক। আমাদের কেউ স্বাস্থ্যবিধি না মানলে তাকে শাস্তি দেওয়া হোক, আমরাও সহায়তা করব।’

এদিকে দোকান-রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন এ খাতের কর্মচারীরা। ঈদ বোনাস তো পরের বিষয়, নিয়মিত বেতন পাবেন কি না, তা নিয়েই সন্দিহান। নতুন বিধিনিষেধ কত দিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে অন্ধকারে মালিক-কর্মচারী সবাই। এ জন্য অনেকে যেমন গ্রামে চলে গেছেন, একাংশ ঢাকায় রয়ে গেছেন। তারা বলছেন, দোকানপাট খোলা না থাকলে মালিক বেতন দেবেন না। টাকা ছাড়া রাজধানীতে অবস্থান নিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন তারা।

রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কের একটি ঘড়ির দোকানের কর্মচারী সোহেল রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বছর তিন মাস বেতন পাইনি। এবারও দোকান চালু করতে না পারলে বউ-বাচ্চা নিয়ে ঢাকায় থাকব কীভাবে? দূরপাল্লার পরিবহন বন্ধ। তাদের গ্রামেও পাঠাতে পারছি না। রমজান মাস, কীভাবে সংসার চালাব বুঝতেছি না।’

বর্তমান পরিস্থিতিতে দোকান ও রেস্তোরাঁ খোলার যৌক্তিকতা বিষয়ে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ সংক্রমণের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে আছে। সবকিছু বন্ধ করা ঝুঁকি হ্রাসের একটি পন্থা। কিন্তু এরপরও সর্বোচ্চভাবে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সম্ভব হচ্ছে না। সরকার কিছু ক্ষেত্রে কঠোর, কিছু বিষয়ে ছাড় দিচ্ছে। বিষয়টা যদি এমন হয়, অন্যান্য ক্ষেত্রে যে ঝুঁকি আছে, তাদের (দোকান ও রেস্তোরাঁ) ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি হবে না। তাহলে মালিক সমিতির দাবি বিবেচনা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকার, আইইডিসিআর, দোকান মালিক সমিতি সবাই বসে ঝুঁকি নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমরা বাঁচার জন্যই কিন্তু সবকিছু করছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত