সমালোচনা, জড়তা, ব্যর্থতা। টেস্টে সব উড়িয়ে দেওয়া একটি দিন পার করল বাংলাদেশ। ৯০ ওভারে ২ উইকেটে ৩০২ রান। ১২২ টেস্টের ইতিহাসে একদিনে এত ভালো সংগ্রহ (৩ উইকেট বা এর কমে প্রথম দিন) এর আগে মাত্র দু’বার দেখাতে পেরেছিল টাইগাররা। ২০১৪তে খুলনায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৩ উইকেটে ১৯৩। একই সিরিজে চট্টগ্রাম টেস্টে ২ উইকেটে ৩০৩। পাল্লেকেলেতে বাংলাদেশের এটাই প্রথম টেস্ট। অথচ মাঠটি যেন কতদিনের চেনা। তাই তামিম ইকবাল শুরু করলেন অসাধারণ সব স্ট্রোক খেলে। রাজ্যের আক্ষেপ নিয়ে সেঞ্চুরি থেকে ১০ রান (৯০) দূরে থামেন। তামিম না পারলেও নাজমুল হোসেন শান্ত দিন শেষ করেছেন মাথা উঁচু করে। স্নায়ু অসম্ভব শান্ত রেখে তুলে নিয়েছেন ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। ২৮৮ বল খেলে ১২৬ রানে অপরাজিত থাকলেন এই তরুণ। সঙ্গে অধিনায়ক মুমিনুল হক তিন বছর পর দেশের বাইরে পাওয়া প্রথম হাফসেঞ্চুরি তুলে অপরাজিত ৬৪ রানে। টানা দুই সেঞ্চুরি জুটিতে টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে ২ উইকেটে ৩০২ রানে টেস্টের প্রথম দিন শেষ করেছে বাংলাদেশ। স্পষ্টতই ব্যর্থতার নিকট-অতীত ভুলিয়ে ম্যাচের লাগাম মুমিনুলদের হাতে।
নাজমুল হোসেন শান্তকে বলা হয় বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ তারকা। আগের টেস্টগুলোয় মাত্র একবারই সেই প্রতিফলন ছিল। তাতে যেন হচ্ছিল না। কারণ, প্রত্যাশাটা অনেক তার কাছে। উইন্ডিজ সিরিজে পুরো ব্যর্থ হওয়ায় চাপে ছিলেন। গতকালের সেঞ্চুরিতে সব চাপ-সমালোচনা উড়িয়ে দিলেন পাহাড়ঘেরা পাল্লেকেলে আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে। ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির উচ্ছ্বাস সবারই উন্মত্ত হয়। কিন্তু শান্ত ছিলেন নির্লিপ্ত। কপিবুক কভার ড্রাইভে সেঞ্চুরি তুলে সজোরে হাঁক ছাড়েননি, লাফিয়ে শূন্যে ঘুষিও মারেননি। শান্ত ছিলেন একেবারে ‘শান্ত’। হেলমেট খুললেন, হাসিমুখে ব্যাট উঁচিয়ে ধরলেন ড্রেসিংরুমের দিকে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ‘নেক্সট বিগ থিং’কে তো আর এক সেঞ্চুরিতেই উন্মত্ত হলে মানায় না! দিনশেষে শান্ত জানান, ‘আসলে স্বস্তি পেলাম। আমি গত তিন-চার মাস ধরে পরিশ্রম করছিলাম কিন্তু রান পাচ্ছিলাম না। তবে আত্মবিশ্বাস ছিল রান পাব। আজ হয়েছে, তাই খুশি। এটা স্কিলের ব্যাপার অবশ্যই কিন্তু মানসিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। সেদিক থেকে ইতিবাচক ছিলাম। আর রিলাক্সড হয়ে খেলেছি। রানের জন্য ছুটছিলাম না। সেশন বাই সেশন খেলার দিকে নজর দিয়েছি।’
শান্তিময় উল্লাসের মতো শান্তর ইনিংসও ছিল তাড়াহুড়োহীন। অপর প্রান্তে তামিম যখন বলপ্রতি রান তুলে ছুটছিলেন, শান্ত ছিলেন ধীর। ৯০ রান করেন ১৯৭ বলে। এরপর তামিমের মতো ভুল যেন না হয় তাই সাবধান হয়ে গেলেন আরও। শেষ ১০ (১২) রান নিতে খেলেন ৩৮ বল। ৯৮ রানে থাকা অবস্থায় ৩৮তম বলে চার মারেন। দিনশেষে অধিনায়ক মুমিনুলের সঙ্গে তৃতীয় উইকেটে তার জুটি ১৫০ রানের। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে যেকোনো উইকেটে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ‘শান্ত’ ইনিংসে বার কয়েক অশান্ত হয়েছিলেন বৈকি। ২৮ রানে ধনঞ্জয়া ডি সিলভার বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন। ধরতে পারেননি উইকেটকিপার। আবার ৯৮ রানে রাশ কভার ড্রাইভ খেলেন ধনঞ্জয়ার বলেই। ভাগ্যিস ব্যাটে লাগেনি। দু’বার বেঁচে যাওয়া শান্ত পুরো ইনিংসে আর ভুল করেননি। এদিকে মুমিনুলও এগিয়ে চলেছেন মসৃণ গতিতে। ১৪তম হাফসেঞ্চুরি করে ৬৪ রানের ইনিংসে এখন পর্যন্ত তার ব্যাটিং দেখে মনে হচ্ছে বিদেশের মাটিতে সেঞ্চুরির আক্ষেপ ঘোচাতে বদ্ধপরিকর বাংলাদেশ অধিনায়ক।
বাংলাদেশের দিনের শুরুটা হয়েছিল হোঁচটে। আগের দিন বাংলাদেশের পেস দুর্বলতায় আঘাত করার কথা বলেছিলেন লঙ্কান অধিনায়ক দিমুথ করুনারতেœ। তাই দলে তিন পেসার ও মাঠে সবুজ পিচ। কিন্তু মুমিনুল টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন। দ্বিতীয় ওভারেই সাইফ হাসানের বিদায়ে বাংলাদেশের হোঁচট। এখন পর্যন্ত ৩ ম্যাচের ৪ ইনিংসে ২৪ রান করেছেন ২২ বছর বয়সী এ ব্যাটসম্যান। পাকিস্তানের সঙ্গে ০ ও ১৬, জিম্বাবুয়ের সঙ্গে ৮ এবং শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ০। আম্পায়ার আউট না দিলেও রিভিউ নিয়ে উইকেট পেয়ে যায় শ্রীলঙ্কা। এরপর শুরুর কন্ডিশন, সবুজ পিচ সবকিছুকে বুড়ো আঙুল দেখান তামিম ইকবাল। ঠিক যে যে জায়গায় বল পছন্দ করেন লঙ্কান বোলাররা তামিমকে সেই সব উপহার দিচ্ছিলেন যেন। উপহার পেয়ে পছন্দের সব শট খেলে যান তামিম। কভার ড্রাইভ, স্কয়ার ড্রাইভ, অন ড্রাইভে চারের পর চার তুলছিলেন। অসাধারণ সাবলীল খেলে মাত্র ৫৩ বলে পৌঁছে যান ২৯তম হাফসেঞ্চুরিতে। ৯০ করেন ১০১ বলে। এরপর হঠাৎ কী হলো বিশ্ব ফার্নান্দোর বলে অযথাই খোঁচা মারতে গিয়ে সিøপে ধরা পড়েন। ১২০ ইনিংসের টেস্ট ক্যারিয়ারে তামিম মাত্র দ্বিতীয়বার নার্ভাস নাইনটির শিকার হলেন। ২০১৩ সালে ঢাকায় নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আউট হয়েছিলেন ৯৫ রানে। এ ছাড়া ৮০-৮৯-এর মধ্যে আউট হন পাঁচবার।
আউট হওয়ার আগে পাল্লেকেলেতে দ্বিতীয় উইকেটে সর্বোচ্চ ১৪৪ রানের জুটি গড়েন শান্তর সঙ্গে, যা ২০০৯ সালের পর বিদেশের মাটিতে দ্বিতীয় উইকেটে বাংলাদেশের প্রথম শতরানের জুটি। আগেরটি ছিল তামিম-জুনায়েদ সিদ্দিকির, উইন্ডিজের বিপক্ষে ১৪৬ রানের। দারুণ সব জুটি গড়ে তিন সেশনের তিনটিই জিতেছে বাংলাদেশ। প্রথম সেশনে ২৭ ওভারে আসে ১০৬। দ্বিতীয় সেশনে ২৬ ওভারে ৯৪ এবং শেষ সেশনে ৩৭ ওভারে আসে ১০৪।
দিনের শুরুতে যেভাবে বাংলাদেশের শুরু হয়েছিল, দিনশেষে দলীয় রান সেই তুলনায় হয়নি। তবে আক্ষেপ নেই, উইকেটে শান্ত আছেন। সেঞ্চুরি করে উদযাপন করেননি খুব একটা। হয়ত দ্বিশতকের জন্যই রেখে দিয়েছেন তা। সঙ্গে মুমিনুলের বিদেশে প্রথম সেঞ্চুরির প্রতিজ্ঞাও থাকছে।
