বঙ্কিমচন্দ্রের বারো দফা

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২১, ১০:৫৬ পিএম

‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন।’ শিরোনামে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-৯৪) একটি লেখা আছে। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ‘প্রচার’ নামের মাসিকপত্রে, মাঘ ১২৯১-এ। অর্থাৎ, ১৮৮৪-এ। বঙ্কিমচন্দ্র তখন আর নবীন লেখক নন। তার প্রথম প্রকাশিত বাংলা উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) অন্তত কুড়ি বছর আগের রচনা। সে হিসেবে, এমনকি তখনকার গড় আয়ু বিবেচনায়, বঙ্কিমচন্দ্র যথার্থই প্রবীণ। ১৮৮৪ পর্যন্ত তার গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব উপন্যাস বেরিয়ে গেছে। দুই যুগের সাহিত্যচর্চায় বঙ্কিমচন্দ্র বুঝে গেছেন, সাহিত্য করতে হলে, লিখতে হলে একজন লেখককে কী-কী বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাংলায় তখনো যেমন, এখনো তাই, কোনো কালেই লেখার অন্তর্গত বিষয়াবলি শেখার আর জানার কোনো বইপত্র প্রায় নেই, শেখার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কায়দাও নেই, যে কোনো লেখকের ক্ষেত্রে পূর্বজদের কাছ থেকে জানাশোনাই তার পথহাঁটার সহায়ক।

ওই বারোটি দফার এগারো নম্বর দফা : ‘কাহারও অনুকরণ করিও না। অনুকরণে দোষগুলি অনুকৃতি হয়, গুণগুলি হয় না। অমুক ইংরেজি বা সংস্কৃত বা বাঙ্গলা লেখক এই রূপ লিখিয়াছেন, আমিও এরূপ লিখিব, এ কথা কদাপি মনে স্থান দিও না।’

প্রথম দফাটা দিয়ে এই লেখা শুরু হতে পারত। তা হয়তো যুক্তির হতো। কিন্তু, আরও বেশ কয়েক বারের মতো, এবারও, মনোযোগসহ সবকটি দফা (হ্যাঁ, দফাই, বঙ্কিমচন্দ্র একে নিবেদন বলেছেন, কিন্তু মনে হচ্ছে এগুলো আসলে দাবি।) পড়ার পরে মনে হলো, প্রায় সব কটিই মানি আর না-মানি এখন আমাদের কালে প্রায় সবারই জানা। কিন্তু এগারো নম্বরটি এই অবাধ তথ্য প্রবাহের কালে আমাদের ঠিক খেয়াল থাকে না। তাই এটাকে এই মুহূর্তে শুরুতে রেখে ভাবা যাক, অনুকরণে তাহলে দোষকেই অনুসরণ করা হয়, গুণ নয়? একবাক্যে হয়তো তা মানা সম্ভবও নয়।

কিন্তু শুরুর দফাগুলো থেকে পড়ে এলে, বোঝা যায়, খুব হিসেব করে একটির পরে একটি বসিয়েছেন বঙ্কিমচন্দ্র। এর বেশিরভাগই আজকের তরুণ লেখকের মান্য তেমন করে না। করার প্রয়োজনও বোধ করেন না।

যেমন এক। ‘যশের জন্যে লিখিবে না। তাহা হইলে যশও হইবে না, লেখাও ভাল হইবে না, লেখা ভাল হইলে যশ আপনি আসিবে।’ এখন চারদিকে সাহিত্যযশোপ্রার্থী। সাহিত্য যে সাধনা, সে কথা এখন তোলা প্রায় বাহুল্য। কোনো সাধনার কথাই আজকাল তোলা যাচ্ছে না। শিক্ষা বা ক্রীড়া সম্পর্কেও। ধরা যাক, একশ মিটার দৌড়। ওই দৌড়বাজ দৌড়ান তো দশ সেকেন্ডেরও কম, কিন্তু তার  পেছনে বছরের পর বছরের যে অক্লান্ত শ্রম থাকে সেটি সাধনা। সেখানে সিদ্ধি সবার ঘটেও না। কিন্তু চেষ্টার তো কোনো ত্রুটি থাকা চলে না। এখন নবীন লেখক কেন, নবীন ক্রীড়াবিদ (এখানে পড়–ন, যে কোনো শিক্ষানবিশ) সবাই তো ওই সাধনার অংশটি ভুলে গেছে, মনে করেন, মাঠে নামলেই যশ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সাহিত্যাকাশে রবীন্দ্রনাথ নামের প্রতিভা তখনো সেভাবে উদয় হয়নি, তবে হচ্ছে, সে আলামত কোথাও কোথাও সামান্য মিলছে। বঙ্কিমের প্রয়াণের (১৮৯৪) আগে রবীন্দ্রনাথ তরুণ লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। শিলাইদহ-শাহজাদপুর পর্বে, ‘মানসী’, ‘সোনার তরী’ আর ‘গল্পগুচ্ছ’র প্রথম দিককার গল্পগুলো লেখা হয়ে গেছে।

কিন্তু, সেই সময়ের সাহিত্যের বাজারে নিশ্চয়ই যশের কাঙালও কিছু কম ছিল না। নয়তো বঙ্কিম এ কথা বুঝলেন কী করে? বঙ্গদর্শনের মতো কাগজের সম্পাদক তিনি। নিশ্চয়ই সে কাগজের সম্পাদক হিসেবে কোনো কোনো নবীনের সেই যশের আকাক্সক্ষা তিনি দেখেছেন।

পাঁচ নম্বর দফাটার বিষয়টা তখনো ছিল। এটা পড়তে গিয়ে অবাক হতে হয়। তখন তো সাময়িক পত্রের সংখ্যা কম। তবু, এই ঘটনা ঘটত : ‘যাহা লিখিবেন, তাহা হঠাৎ ছাপাইবেন না। কিছু কাল ফেলিয়া রাখিবেন। কিছু কাল পরে উহা সংশোধন করিবেন। তাহা হইলে দেখিবেন, প্রবন্ধে অনেক দোষ আছে। কাব্য নাটক উপন্যাস দুই এক বৎসর ফেলিয়া রাখিয়া তাহার পর সংশোধন করিয়ে বিশেষ উৎকর্ষ লাভ করে। যাঁহারা সাময়িক সাহিত্যের কার্য্যে ব্রতী, তাঁহাদের পক্ষে এই নিয়ম রক্ষাটি ঘটিয়া উঠে না। এজন্য সাময়িক সাহিত্য লেখকের পক্ষে অবনতিকর।’

এখানে সবই বলেছেন বঙ্কিম। বেশির ভাগই আজকাল মানা হয়তো সম্ভব নয়। আর সাময়িক সাহিত্য বলতে তিনি নিশ্চয় সংবাদপত্রের স্তম্ভ রচনাকে বুঝিয়েছেন। সে দিক থেকে সাংবাদিকগদ্য সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্রের বোঝাবুঝি পরিষ্কার। সাংবাদিকগদ্য গদ্য লেখকের জন্যে অবনতিকর বলেছেন তিনি। যদিও, অনেকের তাই জীবিকা। মান্য করা সম্ভব নয়। এমনকি মান্য না করেও গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য রচনা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। সেটি তারা করেও দেখিয়েছেন।

বিদ্য প্রকাশের চেষ্টা করতে নিষেধ করছেন একটি (সাত) দফায়। লিখেছেন ‘বিদ্যা থাকিলে, তাহা আপনিই প্রকাশ পায়, চেষ্টা করিতে হয় না।’ বিদ্য প্রকাশের চেষ্টা পাঠককের জন্যে বিরক্তির কারণ, আর, ‘রচনার পরিপাট্যের বিশেষ হানিজনক’।

আর-এক জায়গায় (আট), ‘স্থানে স্থানে অলঙ্কার বা ব্যঙ্গের প্রয়োজন হয় বটে; লেখকের ভা-ারে এ সামগ্রী থাকিলে, প্রয়োজন মতে আপনি আসিয়া পৌঁছিবে ভা-ারে না থাকিলে মাথা কুটিলেও আসিবে না।’

তবে, অন্য একটি দফায় যা জানিয়েছেন, তার গুরুত্ব যতই থাক, আজকাল তা মানা প্রায় সম্ভব নয়। বরং, সামাজিক যোগাযোগে সে কাজটি হচ্ছে বলে অনেকে মনে করতে পারেন, কিন্তু আদৌ তা হয়? নয় নম্বর দফা : ‘যে স্থানে অলঙ্কার বা ব্যঙ্গ বড় সুন্দর বলিয়া বোধ হইবে, সেই স্থানটি কাটিয়া দিবে, এটি প্রাচীন বিধি। আমি সে কথা বলি না। কিন্তু পারমর্শ এই যে, সে স্থানটি বন্ধুবর্গকে পুনঃ পুনঃ পড়িয়া শুনাইবে। যদি ভাল না হইয়া থাকে, তবে দুই চারি বার পড়িয়ে লেখকের নিজেরই আর উহা ভাল লাগিবে না বন্ধুবর্গের নিকট পড়িতে লজ্জা করিবে। তখন উহা কাটিয়া দিবে।’

বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গদ্যলেখক নিজের সাহিত্যচর্চার অভিজ্ঞতা থেকে এ কথাগুলো জানাচ্ছেন। শোনা যায়, বঙ্কিমচন্দ্র প্রতিটি উপন্যাস লেখার পরে পড়ে শোনাতেন বন্ধু ও স্বজনদের। প্রতি মুদ্রণের আগে পরিমার্জন করতেনই। এই কথাগুলো যে তার অভিজ্ঞতারই অংশ, তা তো প্রতিটি দফার পড়ার সময়েই মনে হয়। দীর্ঘদিন সাহিত্য রচনায় যে-যে ক্ষেত্রে সংকট ও সুবিধার  ভেতর দিয়ে তিনি গেছেন, সেগুলোইর সরাৎসার এ সব।

দশম দফায় যা লিখেছেন তিনি, সেটি সরলতা নিয়ে, কিন্তু মান্য করা সবচেয়ে কঠিন।

‘সকল অলঙ্কারের শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার সরলতা। যিনি সোজা কথায় আপনার মনের ভাব পাঠককে বুঝাইতে পারেন, তিনিই শ্রেষ্ঠ লেখক। কেননা, লেখার উদ্দেশ্য পাঠককে বুঝান।’

এই সরল কথাটাই পালন করা সবচেয়ে কঠিন। সরলতা অলঙ্কার বটে। কিন্তু সে অলঙ্কারকে ভূষণ করা খুব জটিল। এ কথা রবীন্দ্রনাথও বলেছেন। হয়তো, রবীন্দ্রনাথ এ কথার প্রতিধ্বনিই করছেন। কিন্তু যে কোনো লেখকের পক্ষে এটি সবচেয়ে কঠিন কাজ। একজন নবীন লেখকের পক্ষে তো বটেই। যশের প্রলোভন, খ্যাতির আকাক্সক্ষা আরও কত কিছু। সবাই তো কর্ণের মতন তীরন্দাজ নন। জয় লোভ যশ লোভেও যিনি বীরের সদগতি থেকে ভ্রষ্ট হবেন না। এটা রবীন্দ্রনাথেরও বক্তব্য। অন্তত, বঙ্কিমের জীবনের শেষ দশ বছরে এই কথা নিশ্চয়ই রবীন্দ্রনাথের কানেও পৌঁছেছিল।

তবে, সবকটি দফার পরে, বঙ্কিমচন্দ্র আশা করেন, ‘বাঙ্গালা সাহিত্য, বাঙ্গালার ভরসা। এই নিয়মগুলি বাঙ্গালা লেখকদিগের দ্বারা রক্ষিত হইলে, বাঙ্গালা সাহিত্যের উন্নতি বেগে হইতে থাকিবে।’

একশ পঁয়ত্রিশ বছর বাদে, এই কথা এখনো প্রাসঙ্গিক। শুধু নব্য লেখকের জন্যে নয়, প্রাচীনের জন্যেও। সেখানেই বঙ্কিমের দফার গুরুত্ব (বারো) : ‘যে কথার প্রমাণ দিতে পারিবে না, তাহা লিখিও না। প্রমাণগুলি প্রযুক্ত করা সকল সময়ে প্রয়োজন হয় না, কিন্তু থাকা চাই।’

২ বৈশাখ ১৪২৮ : ১৫ এপ্রিল ২০২১। সিলেট।

লেখক কথাসাহিত্যিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত