প্রধানমন্ত্রীকে খোলা চিঠি

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২১, ০২:২৪ এএম

বাড়িতে করোনা রোগীর চিকিৎসা

রোগের উপসর্গ বিবেচনা করে সাধারণত করোনা রোগীদের চার ভাগে ভাগ করা যুক্তিসংগত,- (১) মৃদু (Mild) উপসর্গের রোগী (২) সহনীয় (Moderate) উপসর্গের রোগী (৩) সহনীয় রোগীদের উপসর্গ (Moderate) রোগীদের সঙ্গে অসংক্রামক রোগ(Non Communicable – NCD)  (৪) গুরুতর (Severe) করোনা রোগী। সব ক্ষেত্রে মূল প্রয়োজন মাফিক ওষুধ ও পুষ্টির ব্যবস্থা করলে সাধারণত দুই সপ্তাহের চিকিৎসায় অধিকাংশ রোগী নিরাময় হবেন। ৫-১০% গুরুতর রোগীদের জন্য ICUব্যবস্থা করতে হবে। সার্বিক চেষ্টার পরও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (ICU) প্রায় ৪০% রোগীকে বাঁচানো যায় না। স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, লাইফ সাপোর্ট মানে মৃত্যুর হাতছানি।

ব্যবহৃত ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যয়

মৃদু উপসর্গের (Mild) রোগীর চিকিৎসা        

১.         ট্যাবলেট ইভারমেকটিন ১২ মিলিগ্রাম করে ৫ দিন।

২.         ট্যাবলেট লেভোফ্লোক্সাসিন ৫০০ মিলিগ্রাম দৈনিক ১টা করে ৭ দিন।

৩.         ভিটামিন সি ও ডি, জিংক ট্যাবলেট এবং বি-কমপ্লেক্স সিরাপ-৭ দিন।

৪.         ট্যাবলেট মিথাইল প্রেডনিসোলন বা ডেক্সামেথাসন ৭ দিন।

৫.         ট্যাবলেট রিভারোক্সাবান ১০ মিলিগ্রাম ১৪ দিন।

৬.         ট্যাবলেট প্যারাসিটামল দৈনিক ১-২ করে ৭ দিন

৭.         ট্যাবলেট অ্যান্টিহিস্টামিন বা সেট্রিজিন ১-২টা করে ঢ ৭ দিন

৮.         পুষ্টিকর ফুড সাপ্লিমেন্ট

সপ্তাহে ব্যয় ১০০০.০০ টাকা

সহনীয় (Moderate) উপসর্গের রোগীর চিকিৎসা

১.         অক্সিজেন .প্রতিদিন ৪-৫ ঘণ্টা প্রতি মিনিটে + ৫-৭ লিটার অক্সিজেন প্রদান  দৈনিক ব্যয় ৪০০.০০ টাকা

২.         মৃদু উপসর্গের সব ওষুধের অতিরিক্ত নিম্নলিখিত ওষুধসমূহ দিতে হবে।

            -ট্যাবলেট মন্টিলুকাস্ট ১৪ দিন

            -ট্যাবলেট ফেক্সোফেনাডিন ১৮০ মিলিগ্রাম ৭ দিন

            -জি সলবুটামল সলিউশন ২ মিলিগ্রাম করে প্রতি ৪ ঘণ্টা পরপর ১৪ দিন

            -জি-ডেক্সামেথাসোন ইনজেকশন ৫ মিলিগ্রাম

দিনে দুইবার

            -নেবুলাইজেশন ইনজেকশন এসিটাইন সিসিটাইন  সেবন ১৪ দিন

প্লাজমা  সপ্তাহে একবার     

সপ্তাহে ব্যয় + ৮৫০০.০০ টাকা

অসংক্রামক সমেত সহনীয় উপসর্গের করোনা রোগী (Comorbidiy +Moderate)

১.         প্রতিদিন ৫-৮ ঘণ্টা প্রতি মিনিটে + ৭-১০ লিটার অক্সিজেন প্রদান, দৈনিক ব্যয় ৬০০.০০ টাকা

২.         সহনীয় (Moderate) উপসর্গে  

            ব্যবহৃত ওষুধসমূহের 

            অতিরিক্ত ইনজেকশন

            মেরোপেনাম দিনে দুইবার।

বহুমূত্র থাকলে-

            -ট্যাবলেট মেটফরমিন ৫০০ মিলিগ্রাম

            -ট্যাবলেট গ্লিকাজাইড ৮০ মিলিগ্রাম

উচ্চ রক্তচাপ থাকলে

            -ট্যাবলেট লোসারটন ৫০ মি.গ্রাম

            -ট্যাবলেট প্রাজোসিন ১-২ মিলিগ্রাম

            -ট্যাবলেট  ফুসেমাইড ২০০ মি. গ্রাম দিনে একবার

            সপ্তাহে একাধিকবার বুকের এক্সরে   

সপ্তাহে ব্যয় ১২০০০.০০ টাকা

তীব্র (Severe) করোনা রোগীদের সাধারণত কোমমেরবিডিটি থাকে

১.         হাসপাতালে স্থানান্তর ও প্রয়োজনে নিবিড় পরিচর্যা

২.         প্রতিদিন ৮-১২ ঘণ্টা প্রতি মিনিটে ১০-১৫ লিটার অক্সিজেন প্রদান। দৈনিক ব্যয় ১০০০.০০ টাকা

৩.         সহনীয় (গড়ফবৎধঃব) মাত্রার করোনা রোগীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ওষুধ ছাড়াও একাধিক উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন মেরোপেনাম, ভ্যানকোমাইসিন, কলিস্টিন ইনজেকশন প্রয়োজন হয়।

৪.         প্রয়োজন মাফিক হৃদরোগ ও বিকল কিডনি রোগের ওষুধসমূহ

৫.         প্লাজমা সপ্তাহে ২ বার

সপ্তাহে ব্যয় ২০০০০.০০ (বিশ হাজার) টাকা

আরও ব্যয় হবে প্রতিদিন এক্সরে ও বিভিন্ন রক্ত পরীক্ষার জন্য আনুমানিক ব্যয় ৮০০০.০০ (আট হাজার) টাকা

২০০০ (দুই হাজার) রোগীর চিকিৎসার নিমিত্তে প্রতি মাসে ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা দলের বেতন ভাতা, জ্বালানি, অক্সিজেন, ওষুধ ও পুষ্টিকর খাদ্য সহায়তা প্রভৃতির জন্য অমূলধনীয় (Recurrent) ব্যয় হবে প্রায় দেড় কোটি টাকা অর্থাৎ রোগীপ্রতি গড়ে ৭৫০০.০০ (সাত হাজার পাঁচশত) টাকা।

সরকার, দানশীল ব্যক্তি, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের দান ও জাকাত থেকে ছয় মাসের চিকিৎসা বাবদ ৯০ মিলিয়ন (৯ কোটি) টাকা সংগ্রহ করা হবে। পরিবার রোগীর সব পরীক্ষা ও প্লাজমা খরচ বহন করবেন।

সরকারের জরুরি কর্তব্যসমূহ

১.         অক্সিজেন, ওষুধ, মেডিকেল যন্ত্রপাতি ও সামগ্রী থেকে বিশেষ SRO (Statutory Regulatory Order) এর মাধ্যমে সব ধরনের শুল্ক, অগ্রিম আয়কর, মূসক (VAT) প্রভৃতি প্রত্যাহার করা।

২.         ICU পরিচালনার জন্য জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসক ও নার্স প্যারামেডিকদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করা- ২০০ জন চিকিৎসক ও ৫০০ জন নার্স টেকনিশিয়ানকে ICU তে দ্রুত অক্সিজেন প্রদান (High Flow Nasal Canula), নন-ইনভেসিব শ্বাসপ্রশ্বাস প্রক্রিয়া (Non-invasive Ventilatory Support), শ্বাসতন্ত্রে টিউব মারফত অক্সিজেন সরবরাহ (Intubation and Mechanical Ventilatory Support), অন্যান্য নিয়ন্ত্রিত শ্বাসপ্রশ্বাস ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া (ECMO- Exracorporeal Membrane Oxygenation) এবং শ্বাসনালি ট্যাকিয়া (Tracheostomy) ছিদ্র করে দ্রুত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করার  জন্য এক মাসের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করা।

৩.         সব ওষুধের মূল্য এবং রোগ পরীক্ষার পদ্ধতিসমূহের চার্জ সরকার কর্তৃক নির্ধারণ করে দেওয়া।

৪.         কারাগারে আবদ্ধ সব ব্যক্তিকে দ্রুত টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া এবং খুনের দায়ে এবং দুর্নীতির কারণে দ-িত অভিযুক্ত ছাড়া অন্য সবাইকে জামিনে মুক্তি দেওয়া।

৫.         সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজসমূহে প্রতি বছর ২০.০০০ (বিশ হাজার) ছাত্র ভর্তি করা এবং গইইঝ পাসের পর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্র এক বছর বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ করা। অতীতে এই নিয়ম চালু করে দুই সপ্তাহ পর প্রত্যাহার করে ভুল করেছিলেন।

৬.         আগামী বাজেটে সব ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের নিরাপত্তা বেষ্টনী সংস্কার,  গভীর নলকূপ ও বিদ্যুতায়ন ব্যবস্থার উন্নয়ন, মেডিকেল, নার্সিং, ফিজিওথেরাপি ও টেকনিশিয়ানদের জন্য ডরমিটরি, ক্লাসরুম, লাইব্রেরি, ডাইনিং রুম এবং ৫ জন চিকিৎসক ও ১০ জন নার্সিং, ফিজিওথেরাপি ও টেকনিশিয়ান প্রধানদের জন্য ৬০০-৭০০ বর্গফুটের বাসস্থান, বহির্বিভাগসহ ৩০ শয্যার হাসপাতাল, ল্যাবরেটরি ও অপারেশন থিয়েটার নির্মাণের জন্য ৬ (ছয়) কোটি টাকা এবং অপারেশন থিয়েটার, এক্সরে আলট্রাসনোলজি, চক্ষু ও বিভিন্ন ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতির জন্য অন্যূন ৪ (চার) কোটি টাকা বরাদ্দের ব্যবস্থা নিন। এরূপ উন্নয়নে ইউনিয়নের প্রায় এক লাখ জনগণের জন্য আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।

৭.         লকডাউন কার্যকর করার জন্য দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারদের সরাসরি আর্থিক প্রণোদনার পরিবর্তে বিনামূল্যে মাসিক রেশনে চাল, ডাল, আটা, আলু, তেল, চিনি, পেঁয়াজ, রসুন প্রভৃতি দিতে হবে। রেশন বিতরণের জন্য সামরিক বাহিনী, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং এনজিও কর্মীদের ব্যবহার সুফল দেবে।

৮.         ট্রিপসের বাধ্যতামূলক (Compulsory) লাইসেন্সের মাধ্যমে ভ্যাকসিন উৎপাদন সুবিধা সৃষ্টির জন্য নোবেল লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে আপনার বিশেষ দূত করে ইউরোপে পাঠান।

৯.         ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য ০.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করুন, সুফল পাবেন।

১০. গত বছর দ্রুত সিনোজাকের ট্রায়াল অনুমোদন না দিয়ে যে ভুল করা হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়।

১১. গণস্বাস্থ্য উদ্ভাবিত অ্যান্টিবডি অ্যান্টিজেন অনুমোদন এক বছরে হয়নি। ড. বিজন কুমার শীলের ভিসা না হওয়ায় বাংলাদেশে ফিরতে পারছেন না। ৬ মাস আগে ৪ বিজ্ঞানীর তত্ত্বাবধানে Real time PCR ল্যাবরেটরি স্থাপিত হলেও ব্যবহার শুরু করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অদ্যাপি অনুমতি দেয়নি।

ক্ষতি হচ্ছে দেশের, বিষয়টি আপনাকে পুনরায় অবগত করলাম। দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে জাতির কঠিন সমস্যা থেকে মুক্তির সম্ভাবনা সমধিক।

লেখক : গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত