ঢাকার উপকণ্ঠে সাভারে ‘রানা প্লাজা’ ভবনের ধসের পর পেরিয়ে গেল আটটি বছর। ১ হাজার ১০০-এর বেশি মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় এখনো বিচারই শুরু হয়নি। দুই আসামির ক্ষেত্রে মামলার কার্যক্রমে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ থাকা এবং এ বিষয়ে আইনি প্রশ্নের সুরাহা না হওয়ায় বিচারিক আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হচ্ছে না। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানান, স্থগিতাদেশ বাতিলের উদ্যোগ এবং আইনি সুরাহার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তারা চারবার চিঠি দিয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিলেও সেটি না হওয়ায় বিচারকাজে অগ্রগতি নেই। অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগে আসা এসব চিঠির বিষয়ে অবগত ছিলেন না। এছাড়া করোনাভাইরাসজনিত মহামারীর কারণে দীর্ঘদিন আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তবে উচ্চ আদালত খুললে দ্রুত বিষয়টি উপস্থাপন করে সুরাহার উদ্যোগ নেবেন।
আলোচিত এ হত্যা মামলাটি ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা আদালতে বিচারাধীন। ফৌজদারি মামলায় আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর সাক্ষ্যগ্রহণের (জবানবন্দি ও জেরা) মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। এরপর আসামিপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থন, সাফাই সাক্ষ্য ও সবশেষ উভয়পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তি-তর্কের শুনানি শেষে মামলা রায়ের পর্যায়ে আসে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানান, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর নিহতদের শোকাগ্রস্ত স্বজন ও ভুক্তভোগীরা দ্রুত বিচারের আশায় থাকলেও দীর্ঘসূত্রিতায় তারা হতাশ। তারা আরও জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে অভিযোগ গঠনের পর তারিখের পর তারিখ পড়লেও আইনি জটিলতায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করা যায়নি। ইতিমধ্যে তিনজন আসামি মারা গেছেন। সাক্ষীরাও অনেকে অন্য ঠিকানায় চলে গেছেন। দীর্ঘদিন ধরে করোনা মহামারীর প্রভাব পড়েছে আদালত অঙ্গনে। ফলে সাক্ষী হাজির করে বিচার শুরু এবং তা নিষ্পত্তি আরও দীর্ঘসূত্রিতায় পড়তে পারে।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে ঢাকার অদূরে সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ধসে পড়ে রানা প্লাজা ভবন। আগের দিনই ভবনটিতে ফাটল দেখা দেওয়ায় সতর্ক করা হয়। ভবন ধসে নিহত হন ১ হাজার ১৩৬ জন। আহত হন দুই হাজারের বেশি মানুষ। চিরজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে কর্মক্ষতা হারিয়ে ফেলেন অনেকে। প্রায় মাসব্যাপী উদ্ধারকাজ চলে। হতাহতদের বেশিরভাগ ছিলেন ওই ভবনে থাকা বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিক এবং আহতদের অনেকে আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। পৃথিবীকে নাড়িয়ে দেওয়া মর্মস্পর্শী এ ঘটনাটি দেশ-বিদেশে আলোচনার শিরোনাম হয়।
ঘটনার পর ভবন মালিক ও মূল আসামি সাভার যুবলীগ নেতা (পরে বহিষ্কৃত) সোহেল রানাসহ ২১ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা হয়। তদন্ত শেষে অভিযোগপত্রে (চার্জশিট) ৪১ জনকে আসামি করা হয়। সাক্ষী করা হয় ৫৯৪ জনকে। সোহেল রানা ছাড়া অন্য আসামি সবাই জামিনে রয়েছেন। ২০১৫ সালের এপ্রিলে চার্জশিট দেওয়ার পর ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ এসএম কুদ্দুস জামান (বর্তমানে হাইকোর্টের বিচারপতি) আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর (সাক্ষ্যগ্রহণ) আদেশ দেন। ৩৮ আসামির বিরুদ্ধে দ-বিধির ৩০২ ধারায় হত্যার অভিযোগ এবং ঘটনার পর রানাকে পালাতে সহযোগিতা করার অভিযোগে তার তিন ঘনিষ্ঠজনকে আসামি করে তাদের বিরুদ্ধে দ-বিধির ২১২ ধারার অভিযোগ আনা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, হত্যা মামলায় অভিযোগ গঠনের পর সেটিকে চ্যালেঞ্জ করে আটজন আসামি হাইকোর্টে মামলার কার্যক্রম স্থগিতাদেশ চেয়ে আবেদন করেছিলেন। পর্যায়ক্রমে ছয়জনের ক্ষেত্রে স্থগিতাদেশ বাতিল হয়ে যায়। ২০১৮ সালের ৯ মে হাইকোর্ট মামলার আসামি সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. রেফাতউল্লাহ ও ১৪ ই মে আরেক আসামি সাভার পৌরসভার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলীর বিচারিক কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়। স্থগিতাদেশ বহাল থাকা এবং এমন পরিস্থিতিতে এ দুজনকে বাদ দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ হবে কি না, এ আইনি জটিলতার কারণে সাক্ষ্যগ্রহণ হচ্ছে না।
জানতে চাইলে মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত কৌঁসুলি মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘সাধারণত কোনো মামলায় আসামির বিচার কার্যক্রমে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকলে অন্যদের ক্ষেত্রে সেই আদেশ বহাল থাকে। এখন এ দুজনকে বাদ দিয়েই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলে পরে তাদের স্থগিতাদেশ উঠে গেলে দুবার করে সাক্ষ্য নিতে হবে, যেটি অসম্ভব। তাই এ বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা এবং স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে চিঠি দেওয়া হলেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’ তিনি জানান, স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিতে এবং আইনি জটিলতার সুরাহা করতে ২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল, ২০১৮ সালের ৩ নভেম্বর, ২০১৯ সালের ২৭ মে এবং একই বছরের ২৯ আগস্ট অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের উদ্দেশ্যে চারটি চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু চিঠির কোনো জবাব বা পদক্ষেপ দেখা যায়নি। আগামী ৫ মে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য পরবর্তী দিন ধার্য থাকলেও আইনি জটিলতায় সেটি সম্ভব হবে না।
অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রতিটি ধার্য তারিখে সাক্ষীরা দূরদূরান্ত থেকে আসেন। সবশেষ চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে একজন সাক্ষী এসেছিলেন। কিন্তু সাক্ষীরা হতাশ হয়ে ফিরে যান। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। গত বছর থেকে করোনার প্রকোপ চলছে। অনেক সাক্ষীর ঠিকানা পরিবর্তন হয়ে গেছে। যে পরিস্থিতি তাতে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলেও এত বেশিসংখ্যক সাক্ষী হাজির করা অনেকটা দুঃসাধ্য। তাই বিশেষ উদ্যোগ না নিলে সহসাই বিচার শুরু এবং তা শেষ করা কঠিন হবে। এত বড় একটি ঘটনার বিচার যদি না হয় তাহলে দেশে ও দেশের বাইরে ভুল বার্তা যাবে।’ জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চিঠিগুলো এসেছে আমি দায়িত্ব নেওয়ার অনেক আগে। আমাকে কেউ অবগত করেনি। যে কারণে এ বিষয়ে আমার কোনো ধারণা ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে করোনাভাইরাসজনিত পরিস্থিতির কারণে আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এখনো নিয়মিত বিচার কার্যক্রম বন্ধ। তবে এটুকু বলতে পারি, যেহেতু অবগত হলাম আদালত খোলার প্রথম দিনই আমি এটি উপস্থাপন করে সুরাহার উদ্যোগ নেব।’
আইনজীবীদের তথ্যমতে, রানা প্লাজা ভবন ধসের পর হত্যা মামলা, সোহেল রানার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা, ভবন নির্মাণে ইমারত আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে রাজউকের একটি এবং দুদকের পক্ষে আরেকটি মামলা হয়। এছাড়া রানার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দুটি এবং শ্রম আদালতে বেশ কয়েকটি মামলা বিচারের অপেক্ষায় থাকলেও সেগুলোর বিচারে অগ্রগতি নেই। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, হত্যা, দুর্নীতি ও ইমারত আইনের মামলাগুলোতে অভিযোগ গঠনের পর শুধু বিচারের পর্যায়ে এসেছে। প্রতিটি মামলাতেই সোহেল রানা প্রধান আসামি। এর মধ্যে দুর্নীতির মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আনোয়ারুল কবীর বাবুল দেশ রূপান্তরকে জানান, এ মামলায় ২০১৬ সালের জুলাইকে অভিযোগ গঠন হলেও একজন আসামির ক্ষেত্রে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ থাকায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করা যাচ্ছে না।
