বাবার চোখের সামনে হারিয়ে গেল সুমাইয়া

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২১, ০৪:৫৮ এএম

রাজধানীর পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় মুসা ম্যানশনের নিচতলায় রাসায়নিকের গুদামে আগুন লাগার পরপরই ভবনটির বিভিন্ন তলায় গিয়ে কলিং বেল চেপে আর ডাকাডাকি করে ঘুমন্ত বাসিন্দাদের সজাগ করেন নিরাপত্তাকর্মী রাসেল। রাসেলের ডাকে ঘুম ভাঙায় বৃহস্পতিবার গভীর রাতের ওই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড থেকে প্রাণে বেঁচে যান অনেকেই। অথচ নিজের জীবন বাঁচানোর চিন্তা না করে সবাইকে ডাকাডাকি করা সেই রাসেলই পরে দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

মুসা ম্যানশনে আগুন লাগার বিষয়টি বুঝতে পারার পর ভবনটির বাসিন্দারা প্রথমে চেষ্টা করেন ছাদে ওঠার। কিন্তু ছাদের দরজা তালাবদ্ধ থাকায় তা আর সম্ভব হয়নি। ভবনের নিচ থেকে আগুনের প্রচন্ড ধোঁয়া ওপরে উঠতে থাকে, আবার ছাদে ওঠার দরজাও বন্ধ, এর মধ্যেই চলে যায় বিদ্যুৎ। বাঁচার জন্য জানালার কাচ ভেঙে চিৎকার করছিলেন ভবনের বাসিন্দারা। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসা বাসিন্দাদের অনেকেই তখন মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। আগুনের লেলিহান শিখা থেকে বেঁচে ফেরা ও নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে ধারণা পাওয়া গেছে সে সময়কার বীভৎস চিত্র সম্পর্কে।

গত বৃহস্পতিবার রাতে সাহরির ঠিক আগে মুসা ম্যানশনের নিচতলায় যখন আগুন লাগে ভবনটির বাসিন্দা অনেক পরিবারই তখন ঘুমিয়ে ছিল। কেউ আবার সাহরির জন্য উঠে ধোঁয়ার গন্ধ টের পান। ভবনের পঞ্চম তলার বাসিন্দা হেনা ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সাহরির জন্য প্রস্তুতি নেব, দারোয়ান রাসেল তখন হঠাৎ বেল টিপতে শুরু করল। জোরে জোরে দরজায় থাবা দিচ্ছিল সে আর ডাকাডাকি করছিল। দরজা খুলে দেখি ধোঁয়া আর ধোঁয়া, কিছুই দেখা যায় না। সিঁড়িতে আগুনের ফুলকি। পরে পাশের বাড়ির বাসিন্দাদের সহায়তায় গ্রিল কেটে বের হই বাসা থেকে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই বেঁচে যাওয়ার জন্য বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী রাসেলের প্রতিও কৃতজ্ঞ। রাসেল না ডাকলে আগুনের বিষয়টি বুঝতে আরও দেরি হয়ে যেতে। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে রাসেল সব ফ্ল্যাটেই কলিং বেল টিপছিল। আগুন লাগছে জানাতে সবাইকে ডাকছিল। ছয়তলার ছাদে থাকত রাসেল। পরে ওর লাশ পাওয়া গেছে দোতলায়।’

তৃতীয় তলার বাসিন্দা জেসমিন আক্তার বলেন, ‘রাতে যখন আগুন লাগে, বাচ্চাদের কারণে তখন আমরা জেগে গিয়েছিলাম। তবে আগুনের বিষয়টি তখনো বুঝতে পারিনি। সাহরির আগে আগে কে যেন দরজায় নক করল। দরজা খুলতেই দেখি আগুন আর ধোঁয়া। দ্রুত দরজা বন্ধ করে আমার স্বামীকে ডাকলাম, কিন্তু ধোঁয়ায় সবার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। পরে বারান্দার গ্রিল ভেঙে মোটা কাপড় দড়ির মতো করে নামিয়ে সবাই বের হয়েছি।’

মুসা ম্যানশনের আগুন নেভানোর পর ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে নিরাপত্তাকর্মী রাসেলের দগ্ধ মৃতদেহ উদ্ধার করেন।

ওই ভবন থেকে বেঁচে ফেরা চতুর্থ তলার বাসিন্দা মো. ইব্রাহিম। আগুনের ধোঁয়া যখন ছড়িয়ে পড়তে থাকে পুরো ভবনে, তখন ইব্রাহিম প্রথমে চেষ্টা করেন ছাদে ওঠার। কিন্তু ছাদের দরজা তালাবদ্ধ থাকায় পরিবারের ছয় সদস্যকে নিয়ে একটি কক্ষে আশ্রয় নেন। ততক্ষণে তার পুরো ফ্ল্যাট ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। এরই মধ্যে মেয়ে সুমাইয়া সরকার (২২) ড্রয়িংরুমের সঙ্গে থাকা টয়লেটে যান। কিন্তু বেশকিছু সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি রুমে না আসায় ইব্রাহিম ও তার ছেলে জোনায়েদ রুম থেকে বের হয়ে দেখেন সুমায়ইয়া টয়লেটের সামনে মেঝেতে পড়ে আছেন, প্রচন্ড শ্বাসকষ্টে নাখ-মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল তার। এর কিছু সময়ের মধ্যেই নিস্তেজ হয়ে পড়েন সুমাইয়া। মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে সুমাইয়াকে সেখানে রেখেই চলে আসেন ইব্রাহিম ও জোনায়েদ। পরে ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা এসে বারান্দার গ্রিল কেটে উদ্ধার করেন তাদের। নিহত সুমাইয়ার মামাতো ভাই মো. ফারুক গতকাল হাসপাতালে এভাবেই ঘটনার বর্ণনা দেন। সুমাইয়া ইডেন কলেজের ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী।

মো. ফারুক দেশ রূপান্তরকে জানান, ইব্রাহিম মামা স্ত্রী সুফিয়া সরকার, দুই সন্তান সুমাইয়া ও জোনায়েদকে নিয়ে ওই বাসায় থাকতেন। কয়েক দিন আগে আরেক মামাতো বোন মোনা বেড়াতে আসে। গত বৃহস্পতিবার রাতে মোনার স্বামী আশিকুজ্জামান খান আসে বাসায়। আগুনে মোনা ও আশিকুজ্জামান গুরুতর আহত হয়েছে। তাদের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। এছাড়া অন্য তিনজনের অবস্থা অনেকটা ভালো।

পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ‘সুমাইয়া আগুন লাগার পরপরই প্রচন্ড ভয় পায়। তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। একপর্যায়ে নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে। অন্যদের ধারণা ভয়ে স্ট্রোক করে সে।’

বার্ন ইনস্টিটিউটের বিছানায় কাতরাতে দেখা যায় একটি শিশুসহ একই পরিবারের আরও ছয় সদস্যকে। দেলোয়ার হোসেন, তার স্ত্রী লায়লা, দুই ছেলে সাফায়েত হোসেন ও শাকিল হোসেন, সাফায়েতের স্ত্রী মিলি ও তাদের দুই বছরের মেয়ে ইয়াশফা আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে সাফায়েতের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় আইসিইউতে রয়েছেন।

তাদের পাশে থাকা দেলোয়ার হোসেনের ভাবী হোসনে আরা বেগম বলেন, ‘রাতে সাহরি খেতে বসেছি মাত্র। তখনই আমার দেবর (দেলোয়ার) ফোন দিয়ে কাঁদছিল। কথাই বলতে পারছিল না সে। শুধু বলছিল আমাদের বাঁচানোর ব্যবস্থা করেন ভাবী। আগুনে আটকা পড়েছি। মরে গেলে মাফ করে দিয়েন।’

মুসা ম্যানশনের তৃতীয় তলার বাসিন্দা জেসমিন আক্তার ও আবদুস সালাম দম্পতি। তাদের রয়েছে দুই সন্তান। আগুনে মৃত্যুর খুব কাছে থেকে বেঁচে ফিরেছেন তারা। জেসমিন আক্তার বলেন, ‘বারবার মনে হচ্ছিল এই বুঝি সব শেষ। ওই সময় কিছুই ভাবতে পারছিলাম না। মৃত্যুর এত কাছ থেকে ফিরে এসেছি যা এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। নতুন জীবন পেয়েছি আমরা। এমন পরিস্থিতিতে পড়ব আমরা, এভাবে মৃত্যুর কাছ থেকে বেঁচে ফিরব ভাবিনি। নতুন করে সবকিছু পেলাম, আমার সন্তানরা এতিম হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাহরি খাওয়ার পর তখনো কেউ ঘুমাইনি আমরা। বাচ্চারা খেলা করছিল। হঠাৎ আমার মেয়ে বলে ওঠে আম্মু ধোঁয়া আসতেছে কেন। এ সময় ফ্ল্যাটের মূল দরজা খুলতেই দেখি বাইরে দাউ দাউ করে আগুন জ্বালছে। আমার স্বামী ঘরের মূল দরজা বন্ধ করে দেয়। এর মধ্যে বিদ্যুৎ চলে যায়। ধোঁয়া আসা বেড়ে গেলে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, চোখ জ্বালা পোড়া করছিল সবার। বেডরুমে দুই ছেলেমেয়ে ভয়ে চিৎকার করছিল, একপর্যায়ে আমার নাক দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হয়। পরে আগুন যখন কমল, সূর্য ওঠায় আশপাশে যখন আলো এলো তখন আমরা বের হওয়ার চেষ্টা করি। ওড়না পেঁচিয়ে আমি কোনোমতে সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে আসি। আর পাশের ফ্ল্যাটে ছিলেন সাতজন। তারা জানালা ভেঙে কাঠের টুকরা দিয়ে সিঁড়ি বানিয়ে নিচে নেমে যান।’

জেসমিন আক্তারের স্বামী আবদুস সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এ ভবনে উঠেছি বেশিদিন হয়নি। স্ত্রী ও ছেলেমেয়েকে নিয়ে এ ধরনের ভবনে ওঠা ছিল জীবনের বড় ভুল। আল্লাহর শুকরিয়া বেঁচে ফিরেছি।’

মুসা ম্যানশনের চিলেকোঠায় ঘুমের মাঝেই মৃত্যু হয় ওয়ালিউল্লাহ (৬৫) ও হুমায়ন কবিরের (৪০)। বাবুবাজারের কাগজের মার্কেটে শ্রমিক ছিলেন তারা। দীর্ঘদিন ধরেই ওই ভবনে থাকতেন তারা। নিহত হুমায়ন কবিরের ভাতিজা মো. সাইফুল বলেন, ‘চিলেকোঠার ওই রুমে যেভাবে লাশ পড়েছিল তাতে মনে হয়েছে ঘুমের মাঝেই মৃত্যু হয় চাচার।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত