সারি সারি চিতা জ্বলছে। মানুষ পোড়া ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে সোজা উঠে যাচ্ছে উপরে, তারপর কাত হয়ে হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে যাচ্ছে মিলিয়ে। একদণ্ড ফুরসত নেই ডোমদের, একটিতে আগুন দিয়েই সাজাতে হচ্ছে আরেকটি। ট্রাক ভরে ভরে আসছে কাঠ। আসছে লাশ। কবরস্থানেও একটার পর একটা নতুন করব খোঁড়া হচ্ছে, তাতে নামছে একটার পর একটা মরদেহ। গত কয়েক দিন ধরেই ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যের শ্মশান আর কবরস্থানের প্রতিদিনকার দৃশ্য এটি।
দেশটির হাসপাতালগুলোর অবস্থা আর খারাপ। কোনো হাসপাতালেই খালি নেই বিছানা। বারান্দা-করিডোরের মেঝে, হাসপাতালের বাইরে অ্যাম্বুলেন্সে অপেক্ষা করতে করতেই মারা যাচ্ছে অনেকে। চিকিৎসকরা একনজর দেখারও সুযোগ পাচ্ছেন না। এর মধ্যেই অনেক হাসপাতালই জানাচ্ছে তাদের অক্সিজেন মজুদ শেষ, অক্সিজেনের অভাবে অনেক হাসপাতাল থেকেই আসছে মৃত্যুর খবর। করোনার সুনামির ধাক্কায় বেহাল ভারতে প্রতিদিনের ভয়াবহতা টেক্কা দিচ্ছে আগের দিনকে।
গত বৃহস্পতিবার দেশটিতে ৩ লাখ ৩২ হাজার ৫০৩ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এক দিনে এত বেশি রোগী পৃথিবীর কোনো দেশেই শনাক্ত হয়নি। এর আগের দিনে ৩ লাখ ১৫ হাজার ৮০২ জনও ছিল বিশ্বরেকর্ড। বৃহস্পতিবার ভারতে মৃত্যুরও রেকর্ড হয়েছে। দিনটিতে ২ হাজার ২৫৬ জনের প্রাণ কেড়েছে করোনা।
এর আগে জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের এক দিনে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৯৭ হাজার ৪৩০ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। ভারতের কর্র্তৃপক্ষ গত ৫ এপ্রিল প্রথমবার ২৪ ঘণ্টায় এক লাখের বেশি রোগী শনাক্তের কথা জানায়; আড়াই সপ্তাহের মধ্যেই তা ৩ লাখ ছাড়িয়ে গেল।
সংক্রমণের ভয়াবহ ঊর্ধ্বগতির কারণে দেশটির বিভিন্ন হাসপাতালে শয্যা, অক্সিজেন ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধের তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে। রোগীদের বাঁচাতে অসংখ্য হাসপাতালকেই এখন অক্সিজেন জোগাড়ে মরিয়া চেষ্টা চালাতে দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছে এনডিটিভি।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণার সফর বাতিল করে শুক্রবার কভিড-১৯ নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করার ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
করোনা অতিমারিতে যে ১০টি রাজ্যের পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ, সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে শুক্রবারই এই আলোচনায় বসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেখানেই অক্সিজেনের অভাব নিয়ে সরব হলেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল।
তিনি বলেছেন, ‘দিল্লিতে অক্সিজেনের অভাব প্রকট। লোকে শুধু অক্সিজেনের অভাবে মারা যাচ্ছেন। আপনি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। না হলে দিল্লির পরিস্থিতি বেদনাদায়ক হয়ে উঠবে।’ পশ্চিমবঙ্গ এবং ওড়িশা থেকে আকাশপথে অক্সিজেন আনার ব্যবস্থা করতেও বলেছেন কেজরি।
করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে পথ দেখানোর অনুরোধ জানিয়েছেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী।
এদিকে দিল্লির স্যার গঙ্গারাম হাসপাতালে অক্সিজেনের অভাবে বৃহস্পতিবার ২৪ ঘণ্টায় ২৫ কভিড রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ অন্য রোগীদের প্রাণ বাঁচাতে আকাশপথে অক্সিজেন চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেছে। শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে হাসপাতালের পক্ষে একটি ‘এসওএস’ বার্তা দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, আর মাত্র ২ ঘণ্টার অক্সিজেন রয়েছে হাসপাতালে এবং ৬০ জন রোগীর প্রাণ বিপন্ন।
হাসপাতালের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় ২৫ জন মুমূর্ষু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। আর মাত্র ২ ঘণ্টার অক্সিজেন রয়েছে। ভেন্টিলেটর এবং বাইপ্যাপ ঠিকমতো কাজ করছে না। যার ফলে ম্যানুয়াল ভেন্টিলেশনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ৬০ জন রোগীর জীবন বিপন্ন। অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন’।
স্যার গঙ্গারাম হাসপাতাল ছাড়াও দিল্লির অন্তত ছয়টি হাসপাতালে অক্সিজেনের মজুদ শেষ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। অক্সিজেনের অপেক্ষায় বেশ কয়েক রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে খবরে বলা হয়েছে।
মহামারীতে দেশটির সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্য মহারাষ্ট্রে বৃহস্পতিবারও ৬৭ হাজার ১৩ জন নতুন কভিড রোগী শনাক্ত হয়েছে; সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত আছে কেরালা, কর্ণাটক, তামিল নাড়ু ও অন্ধ্র প্রদেশেও।
কেরালায় বৃহস্পতিবার ২৬ হাজার ৯৯৫ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে, রাজ্যটিতে এর আগে কখনোই এক দিনে এত রোগী মেলেনি। কর্নাটকে শনাক্ত হয়েছে ২৫ হাজারের বেশি রোগী।
এক দিনে ২৬ হাজারের বেশি নতুন রোগী দেখা দিল্লিতে বৃহস্পতিবার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ৩০৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। শহরটিতে এটাই এক দিনে কভিড-১৯ এ সর্বোচ্চ মৃত্যু।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় হরিয়ানায় শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে সব দোকানপাট বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, জরুরি নয় এমন সব জমায়েতে দেওয়া হয়েছে নিষেধাজ্ঞা।
আসামে নতুন ১ হাজার ৯৩১ জনের দেহে প্রাণঘাতী ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে রাজ্যটিতে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ২ লাখ ৩১ হাজার ছাড়িয়ে গেল। ভাইরাস এ পর্যন্ত রাজ্যটির ১ হাজার ১৬০ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।
চলমান এ জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় বৃহস্পতিবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারকে অক্সিজেন ও জরুরি ওষুধ সরবরাহ এবং টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে একটি ‘জাতীয় পরিকল্পনা’ দাঁড় করাতে নির্দেশ দিয়েছে বলেও জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো।
