মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফেরা রায়ান ম্যাসন

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২১, ০৩:১২ এএম

২২ জানুয়ারি ২০১৭। স্টামফোর্ড ব্রিজে চেলসির সঙ্গে ম্যাচ খেলছে হাল সিটি। নিজেদের বক্সে চেলসির একটি কর্নার বাঁচাতে শূন্যে লাফিয়েছিলেন রায়ান ম্যাসন। লাফিয়েছিলেন চেলসির গ্যারি কাহিলও। কিন্তু কাহিলের মাথা গিয়ে বীভৎসভাবে আঘাত করে ম্যাসনের মাথার ডান দিকে। ৯ মিনিট মাঠেই পড়েছিলেন। সেখান থেকে নেওয়া হয় হাসপাতালে। অস্ত্রোপচারে মাথার খুলিতে বসানো হয়েছিল ১৪টি মেটাল প্লেট, যা ধরে রেখেছে ২৮টি স্ক্রু। মাথাজুড়ে ৪৫টি সেলাই এবং ৬ ইঞ্চি দাগ ছিল। বছরের পুরোটা সময় মাঠে ফেরার প্রক্রিয়ায় ছিলেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা তাকে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল না খেলার পরামর্শ দেন। ২০১৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মাত্র ২৭ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবল থেকে অবসর নিতে হয়।

সুস্থ হয়ে ওঠা ম্যাসনকে জড়িত করা হয় শৈশবের ক্লাব টটেনহ্যাম হটস্পারের কোচিং টিমে। হোসে মরিনহো বরখাস্তের পর মাত্র ২৯ বছর বয়সেই স্পার্সের অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হয়েছেন ম্যাসন। এত অল্প বয়সে তার কোচ হওয়ার পেছনের গল্প এটি। আজ সেই লিগ কাপ ফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে খেলতে নামছেন দল নিয়ে। ম্যাসনের মস্তিষ্ক কি পারবে তার দলকে ১৩ বছর পর কোনো শিরোপা এনে দিতে?

জন্ম লিভারপুলের অ্যানফিল্ডে। ফুটবলে হাতেখড়ি এই টটেনহ্যাম ক্লাবেই। ১৯৯৯-০৮ পর্যন্ত খেলেছেন টটেনহ্যামের বয়সভিত্তিক দলে। পরে ২০০৮-১৬ পর্যন্ত টটেনহ্যামে ছিলেন ইংলিশ এ মিডফিল্ডার। এ সময় স্পার্সদের হয়ে ৫৩ ম্যাচ খেলে বাকি সময়টা বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন ধারে। ২০১৬-১৮ হাল সিটিতে থাকতেই তার জীবনে নেমে আসে প্রাণসংহারী সেই আঘাতের অভিজ্ঞতা। ম্যাসন জানিয়েছেন, ছোটবেলার ক্লাবকে কোচিং করাবেন এমন স্বপ্ন নিয়েই ঘুমাতে যেতেন। সেই স্বপ্ন এখন সত্যি, যা তাকে বানিয়েছে প্রিমিয়ার লিগ ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সী কোচ। তার অধীনে এরই মধ্যে টটেনহ্যাম ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে একটি ম্যাচ খেলেছে। স্পার্সররা ২-১-এ হারিয়েছে সাউদাম্পটনকে। তবে ম্যাসনের বড় পরীক্ষা আজ লিগ কাপ ফাইনাল। প্রতিপক্ষ ফর্মের তুঙ্গে থাকা সিটি।

ম্যাসন বলেন, ‘প্রতিটি ক্লাবই শিরোপা জিততে চায়। এটি কঠিন এই দেশে (ইংল্যান্ডে)। সম্ভবত এই দেশেই শিরোপা জেতাটা সবচেয়ে কঠিন কাজ। আমরা তা আগেও দেখেছি। বেশ কয়েক বছর আমরা (টটেনহ্যাম) শিরোপার কাছাকাছি গিয়েছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা রেখাটি অতিক্রম করতে পারিনি। এবার তা করতে চাই।’ ২০০৯ ও ২০১৫ সালে লিগ কাপ ফাইনালে হারে টটেনহ্যাম। ২০১৯ সালে তারা হেরেছে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে।

বৃহস্পতিবার ভালো ঘুম হয়েছে ম্যাসনের। তার আগে তিন দিন ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি। পারবেনই বা কীভাবে। সেই সময়টাতে ইউরোপিয়ান সুপার লিগের ডামাডোল চলছিল। টটেনহ্যামও ছিল সুপার লিগের প্রতিষ্ঠাতা ১২ ক্লাবের একটি। সমর্থকরা ছিলেন না এর পক্ষে। এসবের মধ্যেই বুধবার ছিল দলের লিগ ম্যাচ, যা ম্যাসনের কোচিং ক্যারিয়ারে প্রথম। এসব মাথায় নিয়ে কি আর ঘুম হয়। তবে এটি ম্যাসন দেখেই হয়তো সামলে নিতে পেরেছেন। ওই যে ১৪ মেটাল প্লেট ও ২৮ স্ক্রুর ধকল যে সয়েছেন।

একবার ভেবেই দেখুন দলের খেলোয়াড় গ্যারেথ বেল, হুগো লরিসসহ আরও বেশ কয়েকজন আছেন যাদের বয়স ম্যাসনের চেয়ে বেশি। হ্যারি কেইনের সঙ্গে অ্যাকাডেমিতে সময় কাটিয়েছেন সতীর্থ হিসেবে। একসঙ্গে খেললে হয়তো সিনিয়রদের থেকে নিতেন পরামর্শ। কিন্তু এখন যে তাকেই করতে হবে ম্যাচ জয়ের মাস্টারপ্ল্যান।

অপারেশনপরবর্তী সময়ে ম্যাসন ও তার পরিবারের কষ্টের কথাও উঠে এসেছে এক সাক্ষাৎকারে। সেখানে ম্যাসন জানিয়েছেন, তার মাথায় ইনজুরির পর প্রথম তিন মাস তার সামনে এসেছিল নানা চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, ‘প্রথমেই ছিল আমি কি বিছানায় উঠে বসতে পারব? তারপর ছিল আমি কি আবার হাঁটতে পারব? মানসিকভাবে যা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ আমার এবং আমার পরিবারের জন্য। বাড়িতে আমার স্ত্রী কোনো ধরনের আলো এবং টেলিভিশন ছাড়া আট থেকে নয় সপ্তাহ ছিল আমার সঙ্গে। দিনের বেশিরভাগ সময় চুপচাপ আমার পাশে বসে থাকত সোফায়। যখন তার একটু বিশ্রামের প্রয়োজন হতো তার জায়গায় আমার মা বসে থাকত।’ ইনজুরির কারণে ম্যাসন ভারসাম্য রাখতে পারতেন না, সোজাসুজি হাঁটতেও পারেননি প্রায় আড়াই মাস। ১২ সপ্তাহ পর ম্যাসন সোজা হয়ে হাঁটতে শুরু করেন। পরবর্তীতে ম্যাসনকে কোনো ডাক্তার বলতেন তিনি আর ফুটবলে ফিরতে পারবেন না, তো কেউ বলতেন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবেন। তবে ফুটবল খেলা থেকে অবসর নিলেও কোচ হিসেবে ঠিকই মাঠে থাকছেন ম্যাসন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত