সংক্রমণ রোগ প্রতিরোধ আইনে জরিমানা করার ক্ষমতা পেতে যাচ্ছে পুলিশ। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সবুজ সংকেত মিলেছে বলে পুলিশের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গতকাল মঙ্গলবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংক্রমণ রোগ প্রতিরোধ আইন সংশোধনের খসড়া এখনো আমাদের কাছে আসেনি। তবে আসবে বলে জানতে পেরেছি। আমরা চাই ধারা সংশোধন হয়ে পুলিশের ওপর কিছু দায়িত্ব বণ্টন হোক। করোনাকালে পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করছে তা কিন্তু সত্যি। ফাইল আসার পর দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের সংক্রমণ রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন ২০১৮-এর সংশোধনীর প্রস্তাব পাস না হওয়া পর্যন্ত করোনা সংক্রমণ রোধে বেশকিছু নির্দেশনা পালনের নির্দেশনা দিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি)। গতকাল বিকেলে ড. বেনজীর আহমেদ সব মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও সবকটি জেলার পুলিশ সুপারদের সঙ্গে সরাসারি ও ভার্চুয়াল সভা করে বেশকিছু নির্দেশনা দিয়েছেন।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, আইজিপির নির্দেশনার মধ্যে রয়েছেÑ বাইরে চলাচলের সময় মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা, কেউ মাস্ক না পরলে তাকে খোলা জায়গায় এক ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা, কোনোভাবেই গণপরিবহন চলতে না দেওয়া, গণপরিবহন চালালে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া, সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে করোনা সংক্রমণ মোকাবিলা করা, হেফাজতের বিশৃঙ্খলা এড়াতে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া, শপিং মলের প্রবেশপথে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখা, মাস্ক ছাড়া দোকানি বা ক্রেতা কাউকে দোকানে প্রবেশ করতে না দেওয়া ইত্যাদি।
পুলিশ জরিমানা করার বাড়তি ক্ষমতা পাচ্ছে কি না জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ আইয়ুব দেশ রূপান্তকে বলেন, ‘আমরা জরিমানা করার ক্ষমতা চেয়েছি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে গত বছর ২০ জুন প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এখনো সেটা অনুমোদন হয়নি। অনুমোদন হলে পুলিশ সরাসরি জরিমানা করার ক্ষমতা পাবে।’
কয়েকটি জেলার পুলিশ সুপার গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, হঠাৎ করেই গতকাল আইজিপি মহোদয় বিশেষ বৈঠক করেছেন। তিনি আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ রাখার ব্যাপারে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বিশেষ করে হেফাজত ইসলামের নেতাকর্মীরা কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তাদের কঠোরভাবে দমন করতে বলা হয়েছে। হেফাজতের মাদ্রাসাগুলোর দিকে বাড়তি নজর দিতে বলা হয়েছে। আইজিপি আরও বলেছেন, করোনা প্রকোপ অনেক বেড়ে গেছে। লকডাউন কার্যকর করতে যা যা করা দরকার তাই করতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংক্রমণ রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন ২০১৮-এর সংশোধনীর একটি প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের পাঠানো সংক্রমণ রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন ২০১৮ এর সংশোধনী প্রস্তাবের চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) মহামারী মোকাবিলায় সরকারের অন্যান্য সংস্থাগুলোর মতোই বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরাও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সরকার ঘোষিত সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, লকডাউন কার্যকর করা, সংক্রমণ রোগপ্রবণ এলাকায় জনগণের চলাচল সীমিত রাখা, সংক্রমিত বা সংক্রমণের ঝুঁকি সৃষ্টিকারী যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা, সংক্রমিত ব্যক্তিদের ঘরের ভেতর অবস্থান নিশ্চিত করা, চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে পালিয়ে যাওয়া করোনা রোগীকে চিকিৎসা কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার মতো জরুরি ও ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বগুলো মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের প্রতিনিয়ত করতে হচ্ছে। এমনকি করোনায় আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির লাশবহন ও দাফনের মতো সামাজিক দায়িত্বও পুলিশ সদস্যদের পালন করতে হচ্ছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, কিন্তু সংক্রমণ রোগ আইন ২০১৮ এর ২৮ ধারা অনুসারে আইনে বর্ণিত অপরাধসমূহ অধর্তব্য হওয়ার কারণে করোনাসহ অন্যান্য সংক্রমণ প্রতিরোধ তাৎক্ষণিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে পুলিশ অফিসাররা নানা ধরনের জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছেন। তাই আইনে মাঠপর্যায়ে জরিমানা আরোপসহ তাৎক্ষণিক প্রয়োগের সুবিধার্থে আইনটির কতিপয় ধারা সংশোধনী ও সংযোজনী আনা প্রয়োজন। পুলিশ সদর দপ্তরের সংশোধিত খসড়া প্রস্তাবে সংক্রমণ রোগ প্রতিরোধ সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদে বর্তমানে বিদ্যমান কর্মকর্তাদের পাশাপাশি পুলিশের মহাপরিদর্শক বা আইজিপিকে অন্তর্ভুক্ত করতে বলা হয়। পুলিশ সদর দপ্তর এর যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলে সংক্রমণ রোগের বিস্তার ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়লে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারকে সাধারণ ছুটি ঘোষণাসহ লকডাউন, প্রয়োজনে কারফিউ জারি করার প্রয়োজন হতে পারে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে জনসাধারণের চলাচলের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন দেখা দেয়। এমন জরুরি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যদের প্রত্যক্ষভাবে মাঠে কাজ করতে হয়। বাস্তবতার নিরিখে জরুরি অবস্থা মোকাবিলা লকডাউনসহ যথাযথ আইন প্রয়োগের জন্য পুলিশ বাহিনীর অংশগ্রহণ আবশ্যক বিধায় উপদেষ্টা কমিটিতে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন। কারণ করোনাকালীন বাংলাদেশ পুলিশের জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে পুলিশ প্রধানের অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে অনুভূত হচ্ছে।
দোকানমালিকদের সঙ্গে মতবিনিময় : এদিকে দোকান মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন আইজিপি। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে দোকানপাট এবং শপিং মলসহ সব ধরনের কেনাকাটার ক্ষেত্রে অবশ্যই মাস্ক পরিধান এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান আইজিপি। তিনি করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিস্তার রোধে করণীয় সম্পর্কে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় কিরেন। পুলিশ সদর দপ্তরের সভায় পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি এবং জেলার পুলিশ সুপাররা অনলাইনে যুক্ত ছিলেন। আইজিপি বলেন, কেনাকাটার ক্ষেত্রে দোকানদার এবং ক্রেতা উভয়কে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। দোকান বা শপিং মলের প্রবেশপথে স্যানিটাইজার রাখতে হবে বা হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। শপিং মলে প্রবেশের সময় অবশ্যই শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করতে হবে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা নিশ্চিত করতে একসঙ্গে কোনো দোকানে বেশি লোকের প্রবেশ নিরুৎসাহিত করতে হবে। বড় বড় দোকানের ক্ষেত্রে ক্রেতার অবস্থান গোল চিহ্ন দিয়ে নির্দিষ্ট করে রাখতে হবে।
আইজিপি ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে সারা দেশে সব দোকানপাট ও শপিং মলে স্বাস্থ্য সুরক্ষা মেনে ক্রয়-বিক্রয় করার জন্য ব্যবসায়ী, দোকানমালিক এবং ক্রেতাসাধারণের প্রতি অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, আমরা সবাই সরকারি বিধিনিষেধ মেনে চললে করোনা সংক্রমণ কমবে, মৃত্যুর হারও কমবে। চলমান করোনাকালে জীবন চালাতে হবে, আবার জীবিকাও চালাতে হবে। এর মধ্যে সমন্বয় করে আমাদের চলতে হবে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ দোকানমালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন জানান, তারা প্রতিটি শপিং মলের সামনে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা অথবা স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা রেখেছেন। শতভাগ মাস্ক পরিধান নিশ্চিত করা হয়েছে। বড় বড় শপিং মলে জীবাণুনাশক টানেল বসানো হয়েছে। সারা দেশে ব্যবসায়ীরা করোনাভাইরাস প্রতিরোধে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সোচ্চার এবং সজাগ রয়েছেন। ওই সভায় অতিরিক্ত আইজি (এঅ্যান্ডও) ড. মো. মইনুর রহমান চৌধুরী, অতিরিক্ত আইজি (অর্থ) এসএম রুহুল আমিন, অতিরিক্ত আইজি (এইচআরএম) মো. মাজহারুল ইসলাম, ডিএমপি কমিশনার মোহা. সফিকুল ইসলামসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ দোকানমালিকরা উপস্থিত ছিলেন।
