বরেণ্য অভিনেতা, নাট্যকার ও নির্দেশক আবুল হায়াত সম্প্রতি করোনা জয় করেছেন। এখন তিনি কেমন আছেন তা জানার জন্য ভক্ত ও শুভাকাক্সক্ষীদের অনেক আগ্রহ। তিনি বললেন, ‘করোনার ধকল কাটিয়ে বাসায় ফিরেছি বেশিদিন হয়নি। এখন আগের চেয়ে একটু ভালো। চিকিৎসক বলেছেন, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু প্রচ- রকম শারীরিক দুর্বলতা অনুভব করছি। সৃষ্টিকর্তার কাছে অসীম কৃতজ্ঞতা, করোনা থেকে মুক্তি পেয়েছি। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।’ এখন সময় কাটছে কীভাবে? ‘কাজকর্মে মন দিতে পারছি না। সারাক্ষণ শুয়ে-বসে দিন পার করছি। এই বয়সে যেমন থাকা যায়, তেমনই আছি। তারমধ্যেও মন ভালো রাখার চেষ্টা করি। টিভি দেখছি। হাতের কাছে বই রাখছি। যখন ভালো লাগে না তখন বই পড়ি। মাঝেমধ্যে মোবাইল ক্যামেরায় ছবিও তুলি।’
বয়সকে তোয়াক্কা না করে নিয়মিত অভিনয় করেন আবুল হায়াত। কিছুদিন আগেই মুক্তি পেয়েছে তার অভিনীত সিনেমা ‘স্ফুলিঙ্গ’। সাধারণত সৎ ও ন্যায়বান মানুষের চরিত্রে তাকে বেশি দেখা যায়। কিন্তু জাত অভিনেতা সব চরিত্রেই যে সমানভাবে মিশে যান তা দেখিয়েছেন আবুল হায়াত। এ ছবিতে নেতিবাচক চরিত্রেও সমান প্রশংসা পেয়েছেন। ঈদেও নতুন কোনো নাটকে আপনাকে দেখা যাবে কি না জানতে চাইলে এই গুণী অভিনেতা বলেন, ‘করোনা আক্রান্ত হওয়ার আগে চয়নিকা চৌধুরীর পরিচালনায় ‘স্যারের মেয়ে’ নামে একটি নাটকে অভিনয় করেছি। এটি ঈদে প্রচার হবে। বেশ কিছু নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি নাটক পরিচালনার ইচ্ছা ছিল। করোনা সব পরিকল্পনা এলোমেলো করে দিল। শরীরের যে অবস্থা তাতে ঈদের আগে শ্যুটিংয়ে ফেরা সম্ভব হবে না।’
স্যারের মেয়ে নাটকটি করতে আগ্রহী হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখন তো অভিজ্ঞ অভিনেতাদের সেভাবে ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু এই নাটকে আমার চরিত্রটি খুবই শক্তিশালী। বলতে গেলে একজন শিক্ষক ও তার মেয়ের ওপরেই গল্প। আমি সেই শিক্ষকের চরিত্রটি করেছি। আমার মেয়ের চরিত্রে কাজ করেছে নতুন একটি মেয়ে। তার নাম মৌসুমী মৌ। উপস্থাপনায় সে বেশ পরিচিত। অভিনয়ে একেবারেই নতুন। তারপরও বেশ সিনসিয়ারলি কাজটি করেছে। এছাড়া ছিল মনোজ প্রামাণিক। সেও দারুণ সম্ভাবনাময় অভিনেতা। তাদের দুজনের মধ্যেই কাজের প্রতি ভালোবাসা দেখেছি। এটা অটুট থাকলে তারা ভালো শিল্পী হবে। আর চয়নিকার কথা কী বলব? সে তো আমার ঘরের মেয়ে। আমাকে বাবার মতো সম্মান করে। সে সব সময় গুছিয়ে কাজ করে। এজন্য নাটকগুলো দর্শক পছন্দ করে।’
টিভি মিডিয়ার বর্তমান অবস্থা নিয়ে এখন নানা জনের নানা মত শোনা যায়। আপনার অভিমত কী? ‘মিডিয়ার সত্যিই এখন দুঃসময় চলছে। অভিনয়, পরিচালনা- সব ক্ষেত্রেই চাপ নিয়ে কম বাজেটে কাজ করতে হচ্ছে। বেড়েছে এজেন্সিনির্ভরতা। যে জন্য ক্রমেই কাজের মান কমছে। এখনকার নাটকে সিনিয়র শিল্পীদের চরিত্র কমে যাচ্ছে। এসবের মধ্যেও কাজ চলছে, কাজ করছি। এক লাখ টাকা দিয়েও এখন নাটক তৈরি হয়। এটা কি সম্ভব! এ নাটকের কী কোয়ালিটি হতে পারে? এক দিনে দৃশ্যধারণ শেষ করতে হয়। তাড়াহুড়োর মধ্যে কাজ শেষ করেন শিল্পীরা। আবার এক ঘণ্টার নাটকে ১০ লাখ টাকাও বাজেট থাকে। সেসব নাটক ভালো হচ্ছে। ভালো নির্মাতা, অভিনয় শিল্পীরা কাজ করেন ওই নাটকে। হাতে ধরে ধরে কাজ হয়। তবে এ ধরনের নাটক কম হচ্ছে’, বললেন আবুল হায়াত।
অভিনয়ের পাশাপাশি নিয়মিত লেখালেখি করেন আবুল হায়াত। প্রতি বইমেলায় তার এক বা একাধিক বই বের হয়। লকডাউনের এই অবসরে নতুন কিছু লিখছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সম্প্রতি দুটি বই লিখেছি। গল্পের বইয়ের নাম ‘স্বপ্নের বৃষ্টি’, ‘দুটো মঞ্চ নাটক’। গত বইমেলায় বই দুটি প্রকাশ করেছে প্রিয় বাংলা প্রকাশন। স্বপ্নের বৃষ্টিতে আছে দুটি গল্প, যা নিয়ে ইতিমধ্যে নির্মিত হয়েছে টিভি নাটক।”
অভিনয় জীবনের পাঁচ দশক পার করেছেন। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমাকে কীভাবে দেখছেন?
‘অভিজ্ঞতাময় সফরের মধ্য দিয়ে এই লম্বা পথ পাড়ি দিয়েছি। আমি আমার বাবা এবং মায়ের কাছে কৃতজ্ঞ। চলার পথে তাদের সহযোগিতা পেয়েছি। স্ত্রী আমার পাশে থেকেছেন। অভিনয়ে পাঁচ দশক হয়েছে; এটা ভাবতেই অবাক লাগে। মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা। বাবার সঙ্গে মঞ্চনাটক দেখতে যেতাম। সেই থেকেই শুরু হয় নাটক আর অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা। পড়াশোনা শেষ করে যোগ দিই ঢাকা ওয়াসার প্রকৌশলী পদে। এ পেশায় কাজ শুরু করলেও মূল আকর্ষণ ছিল অভিনয়ের প্রতি। তাই তো অভিনয়ের সঙ্গেই জড়িয়ে আছি।’