দেশের বিভিন্ন স্থানে গত ৪ এপ্রিল গরম বাতাস ও শিলাবৃষ্টিতে ২০ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ১৫ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। শতকরা ৫-১০ শতাংশ হারে ধান নষ্ট হয়েছে। এখন চলছে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রণয়নের কাজ। এসব কৃষককে ৫ হাজার টাকা করে প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। ঈদের আগেই কৃষকদের মোবাইল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ চলছে।
এ বিষয়ে অধিদপ্তরের পরিচালক (সরেজমিন বিভাগ) এ কে এম মনিরুল আলম গত বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা যে তথ্য পেয়েছি তাতে ৫-১০ শতাংশ হারে ফসল নষ্ট হয়েছে। মূলত ওই সময়ে যেসব ধানে ফুল ফুটেছিল সেগুলো চিটা হয়ে গেছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, আমাদের মাঠকর্মীরা জানিয়েছেন, খুব বেশি ক্ষতি হয়নি। আমরা এখন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নের কাজ করছি। আগামী ৩০ এপ্রিলের (আজ) মধ্যে তালিকা প্রস্তুতের কাজ সম্পন্ন হবে। তখন চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা জানা যাবে। এছাড়া আমরা ঈদের আগেই ক্ষতিগ্রস্তদের ৫ হাজার টাকা প্রণোদনা কৃষকদের মোবাইল ব্যাংকে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছি।’
অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ৪ এপ্রিল রাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে কালবৈশাখী আঘাত হানে। এ সময় হঠাৎ গরম হাওয়া বইতে শুরু করে। এতে গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, পাবনা ও চাঁদপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ধানের শিষ ফেটে চিটা (শুকিয়ে যাওয়া) হয়ে যায়। এছাড়া সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে শিলাবৃষ্টিতে কিছু ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। প্রথম দিকে ধারণা করা হয়েছিল, এসব এলাকার অধিকাংশ ধানই নষ্ট হয়ে গেছে। তবে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পান, যেসব ধানে ঘটনার দু’একদিন আগে থেকে ফুল ফুটেছিল কেবল সেগুলোর কিছু অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। বাকি ধানের কোনো ক্ষতি হয়নি।’
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার চাষি আবু বকর দেশ রূপান্তরকে জানান, রাতে প্রথমে ঝড় বইতে শুরু করে। এরপর হঠাৎ রাত ১২টার দিকে গরম বাতাস বইতে শুরু করে। সকালে তিনি ধানক্ষেতে গিয়ে দেখতে পান, যেসব ধানের ছড়ায় দুধ (কচি ধানের তরল অংশ) এসেছিল সেগুলো ফেটে গেছে। দিনে রোদের তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা শুকিয়ে যায়।’ তিনি বলেন, ‘ধারদেনা করে ধান চাষ করেছিলাম। তাও শেষ হয়ে গেল। দেশে করোনা চলছে। সরকার লকডাউন দিয়েছে। কাজকর্মও নেই। ৫ হাজার টাকায় কি এই ক্ষতি মিটবে?’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর বোরোতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪৮ লাখ ৫ হাজার ২০০ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ৪৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে হাইব্রিড ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১১ লাখ ৪ হাজার ৬৩৩ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ১২ লাখ ১৩ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে। গত বছরের তুলনায় এ বছর মোট আবাদ বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার হেক্টর ও হাইব্রিডের আবাদ বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে। গত বছর ১ কোটি ৯৬ লাখ ৪৫ হাজার টন বোরো চাল পাওয়া গিয়েছিল। এবার ২ কোটি ৫ লাখ টন ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছে অধিদপ্তর।
ধানের ক্ষতি হওয়ার পরেও এবার এত বেশি চাল পাওয়া আদৌ সম্ভব হবে কি না জানতে চাইলে মনিরুল আলম বলেন, ‘আমরা জরিপ করেই এই তথ্য দিচ্ছি। যতটা না ক্ষতি হয়েছে তার থেকে পেনিক (আতঙ্ক) ছড়িয়েছে বেশি। একসঙ্গে তো সব ধানের ফুল ফোটে না। আর ওইদিন (৪ এপ্রিল) কেবল ফুল ফোটা ধানেরই ক্ষতি হয়েছে। তাও কিন্তু সব ফুল নষ্ট হয়নি। তাই যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তাতে উৎপাদনে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। এছাড়া এবার তো লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আবাদ বেশিই হয়েছে।’
