কঠোর বিধিনিষেধ কিংবা ‘সর্বাত্মক লকডাউনের’ মধ্যেই দোকানপাট, শপিং মল রাত ৮টার পরিবর্তে চার ঘণ্টা সময় বাড়িয়ে ১২টা পর্যন্ত খোলা রাখার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির নেতারা। ব্যবসায়ীদের এ সংগঠনটির দাবি, রাত ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকলে দোকানপাট ও শপিং মলে ভিড় কম হবে। গতকাল রবিবার এ দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বরাবর চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেসরকারি অফিসগুলোর বেশির ভাগই বিকেল ৪টায় ছুটি হয়। তারা সাড়ে ৫টা পর্যন্ত কেনাকাটা করেন। ফলে এ সময় পর্যন্ত ক্রেতার চাপ এবং প্রচণ্ড ভিড় হয়। অন্যদিকে ইফতারের পর ঘণ্টাখানেকের জন্য মার্কেট খোলা থাকে। এ সময়ে মার্কেট প্রায় ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ে।
সময় বাড়িয়ে রাত ১২টা পর্যন্ত করলে কর্মচারীদের কষ্ট হবে জানিয়ে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘তবুও আমরা সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার চেষ্টা করব।’
ঈদের আগে ভিড় আরও বাড়বে জানিয়ে এই ব্যবসায়ী বলেন, তবে বেচা বিক্রি ভালো না। আর আশানুরূপ বিক্রি হচ্ছে না। আর হবেও না। তিনি বলেন, এখন আর তেমন বিক্রি হবে না। মানুষ তো এখন আর বিলাসী পণ্য কিনছে না। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনেই তারা চলে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেওয়া চিঠি আসলে বিবেচনাযোগ্য কি না, প্রশ্নের জবাবে হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কোনো কিছু চেয়ে কখনো ফেরত আসি নাই। আমরা কিছু না কিছু পাই।’
মার্কেটে ভিড় : তবে ‘বিক্রি কম দাবি ব্যবসায়ীদের। ‘লকডাউনের’ মধ্যেও সাপ্তাহিক ছুটির দ্বিতীয় দিন গত শনিবার রাজধানীর মার্কেট ও শপিং মলে উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। কিছু শপিং মলে স্বাস্থ্যবিধি মানতে দেখা গেলেও কিছু মার্কেটে স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। ভিড়ের কারণে আশপাশের রাস্তায় যানজটও দেখা গেছে।
এ ছাড়া গতকাল রাজধানীর মার্কেটগুলোতে ক্রেতা একটু কম থাকলেও চিত্রগুলো অনেকটা একই রকম। বিভিন্ন শপিং মলের সামনে থেমে থেমে যানজট সৃষ্টি হচ্ছিল। তবে শপিং মলগুলোতে প্রায় সবাইকে মাস্ক পরে প্রবেশ করতে দেখা গেছে।
ভেতরে ঢোকার আগে একজন স্যানিটাইজার দিচ্ছেন সবার হাতে। আরেকজন শরীরের তাপমাত্রা মেপে ভেতরে ঢোকাচ্ছেন।
পরিবার নিয়ে বসুন্ধরা শপিং মলে এসেছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ইশতিয়াক হোসেন। তিনি বলেন, ‘গত বছরের ঈদে বাচ্চাদের কিছু কিনে দিতে পারি নাই। ওদের ঈদের আনন্দ নষ্ট হয়েছিল। তাই এই বছর শপিংয়ে আসা। বেশি কিছু না, অল্প কিনেই চলে যাব।’
এদিকে এই শপিং মলে ভিড়ের তুলনায় বিক্রি কম বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা। তবে সেখানে বাইরে মাইকে সবাইকে সচেতন করতে দেখা গেছে। ভেতরে ঢোকার আগে সবার হাতে স্যানিটাইজার দেওয়া হচ্ছে। এরপর জীবাণুনাশক টানেলের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করে শরীরের তাপমাত্রা মেপে ভেতরে ঢোকানো হচ্ছে।
বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সে দিনভর ভিড় দেখা গেলেও বেচাকেনায় খুশি নন বিক্রেতারা :
শপিং মলে সবচেয়ে বেশি ভিড় কাপড়, জুতা ও মোবাইলের দোকানে। ভেতরে ঢুকে অনেকেই মাস্ক খুলে ফেলছেন।
কাপড় ব্যবসায়ী ফাহাদেস শাহ বলেন, ‘মার্কেটে লোক দেখলেও বেচাবিক্রি তেমন নেই। সবাই আসছে ঘুরতে। ঘুরে-ফিরে চলে যাবে।’
নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাত থেকে শুরু করে মার্কেটের ভেতরের সবখানেই উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে গত শনিবার। তবে সেই দিনের তুলনায় গতকাল উপচে পড়া ভিড় ছিল না বলে বলা যায়। নিউমার্কেট ওভারব্রিজে ধাক্কাধাক্কি করে কে কার আগে যাবে, সেই প্রতিযোগিতা ছিল দৃশ্যমান।
নিউ সুপার মার্কেটের তিনতলার কাপড়ের দোকানি সাইফুল মিয়া বলেন, ‘করোনার আগে অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর ৬০ শতাংশ বেচাকেনা কম। তবে ঈদের কারণে এখন মোটামুটি বেচাকেনা হচ্ছে।’
স্বাস্থ্যবিধির কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা তো বলি। কাস্টমাররা যদি না শোনে, আমরা কী করতে পারি?’
পুরান ঢাকার পাইকারি মার্কেটগুলোতে কমেছে বেচাকেনা। তবে খুচরায় বেচাকেনা বাড়লেও রাত ৮টার পর দোকান বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশনা থাকায় বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। এখানকার ব্যবসায়ীরা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, সরকারের উচিত গণপরিবহন চালু করা। সেই সঙ্গে দোকান খোলার সময় বাড়িয়ে দেওয়া। এতে করে এই কদিন ভালোভাবে বেচাকেনা করতে পারলে লোকসান থেকে কিছুটা রেহাই পাওয়া যাবে।
গতকাল পুরান ঢাকার ইসলামপুর, সদরঘাট, গ্রেট ওয়াল শপিং মলসহ বেশ কয়েকটি মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, পাইকারি মার্কেটগুলোতে এক দিনের ব্যবধানে কমেছে বেচাকেনা। খুচরায় বেচাকেনা স্বাভাবিক থাকলেও সরকারি নির্দেশনায় বেশির ভাগ দোকানে রাতে তেমন বেচাকেনা হচ্ছে না।
ইসলামপুরের জে জে করপোরেশনের মালিক আরমান ওয়াহিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইসলামপুর পাইকারি মার্কেট হওয়ায় এখন বেচাকেনা কিছুটা কম। খুচরা মার্কেটে এখন বাড়বে বেচাকেনা। তবে গণপরিবহন যদি চালু থাকলে এ সময় আরও কিছু বেচাকেনা করা যেত বলে মনে করেন এই ব্যবসায়ী।
সদরঘাট গ্রেট ওয়াল শপিং সেন্টারের এক বিক্রেতা শাওন খান জানান, দিনে বেচাকেনা ভালো থাকলেও রাতে অনেক ক্রেতাই যাতায়াতের বিষয়টি চিন্তা করে মার্কেটগুলোতে আসতে পারছেন না। এখন এই কয়দিন যদি গণপরিবহন চালু না হয়, তাহলে দোকান খুলেও কোনো লাভ হবে না।
মার্কেটে আসা মো. রাকিব নামে এক ক্রেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন মার্কেটে শপিং করাটা বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় রিকশার ভাড়া আগের থেকে দ্বিগুণ হয়েছে। তা ছাড়া অনেক সময় রিকশা পাওয়া যায় না।’ তাহলে সরকার কেন শুধু শুধু মার্কেটগুলো খোলা রাখল?
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার প্রথমে ৫ এপ্রিল থেকে চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে। তখন সব দোকান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় ১৪ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত আরও কঠোর বিধিনিষেধ দিয়ে ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ শুরু হয়। পরে আবার লকডাউনের সময় বাড়ানো হয়। তবে ব্যবসায়ীরা দোকান খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। পরে ২৩ এপ্রিল থেকে প্রথমে ১০টা থেকে ৫টা পর্যন্ত, পরে ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়।
এদিকে ২৩ এপ্রিল শপিং মল খোলার প্রথম দিনই মন্ত্রিপরিষদের ঘোষিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বেঁধে দেওয়া সময় থেকে সরে এসেছিল সরকার। প্রথম দিনেই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, দোকানপাট বিকেল ৫টার পরিবর্তে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে। তবে আবারও ‘লকডাউনের’ সময় বাড়ানোর প্রজ্ঞাপনের ফলে দোকান খোলা রাখার সময় আরও এক ঘণ্টা সময় কমে এসেছিল। আর এখন চার ঘণ্টা সময় বাড়িয়ে রাত ১২টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখতে চান ব্যবসায়ীরা।
