ঘুম ভেঙে গেল ‘খেলা হবে’ গানে। ভোর থেকে পাড়ায় পাড়ায় তৃণমূল কর্মী-সমর্থকরা উৎসবে মেতেছে। স্বাভাবিক। একটা চাপা টেনশন মুখে না বললেও মমতা ব্যানার্জি ও তার সমর্থকদের মধ্যে ছিলই। যেভাবে খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে অমিত শাহ, যোগী আদিত্যনাথ থেকে চুনোপুঁটি নেতারা প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে মমতা বিদায় হচ্ছেই বলে আসর দাপাচ্ছিলেন, তাতে বাইরে যতই আপাত আত্মবিশ্বাসী লাগুক অতি বড় বিজেপিবিরোধীও জোর দিয়ে বলতে পারছিলেন না যে মমতা তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় আসছেনই।
বিজেপিকে বিপুলভাবে হারাবার পরে স্বভাবতই খোশ মেজাজে তৃণমূল সমর্থকরা করোনা আতঙ্ক পরোয়া না করে সবুজ আবির মেখে রাস্তায় নেমে এসেছেন। ‘খেলা হবে’ ছিল এবার তৃণমূলের সিগনেচার টিউন। মমতা ব্যানার্জি স্বয়ং সভা-সমাবেশে বারবার বলেছেন খেলা হবে। মা-বোনদের কাছে আবেদন করেছেন খেলার মাঠ থেকে আউট করে দিন বিজেপিকে।
বস্তুত এটাই এবার নির্ণায়কের ভূমিকা নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের ভোটে। মমতা ব্যানার্জির সাফল্যের পেছনে আছে খেলার মাঠ থেকে চরম দক্ষিণপন্থি সাম্প্রদায়িক বিজেপিকে দূর করে দেওয়ার বাঙালি আবেগ। মমতা ব্যানার্জির দশ বছরের উন্নয়নের খতিয়ান নিঃসন্দেহে গরিব মানুষের বড় একটা অংশকে প্রভাবিত করেছে এবারের ভোটে। তবু আমি এক নম্বরে রাখব সামগ্রিকভাবে বাঙালির বিজেপি-বিদ্বেষকে। বাঙালির বিজেপি বিরোধিতার পেছনেও আছে নানা কারণ।
১. গুজরাট গণহত্যার স্মৃতি মধ্যবিত্ত হিন্দুর মনে এখনো দগদগে ঘায়ের মতো থেকে গেছে। মধ্যবিত্ত বাঙালি মূলত শান্তিপ্রিয়। সে মোটামুটি নিশ্চিন্তে পরিবার নিয়ে জীবন কাটাতে পারলেই খুশি। বঙ্গ সংস্কৃতি এত ঝড়ঝাপ্টার পরেও মোটের ওপর সুখী গৃহকোণ শোভে গ্রামোফোনের প্রাচীন বিজ্ঞাপনের মতো একই থেকে গেছে।
২. বাঙালি মননে একধরনের স্থিতাবস্থার প্রতি পক্ষপাত আছে। কোনোরকম ঝুঁকির পথে সে যেতে চায় না। যা চলছে চলুক এই মনোভাব থেকেই সে চেনা মমতা ব্যানার্জিকে হটিয়ে অচেনা মোদিকে আনতে চায়নি।
৩. গড় বাঙালির মধ্যে একধরনের প্রগতিশীল হওয়ার, অন্তত সাজার একটা অহমিকা আছে। ফলে সে খোলাখুলি চরম ঘোষিত এক সাম্প্রদায়িক দলকে ভোট দেয়নি। পাশাপাশি মোদি-অমিত শাহদের গগনচুম্বী অহংকার ও আস্ফালন সাধারণ বাঙালি প্রত্যাখ্যান করেছে।
৪. এবারের ভোটে মমতা ইচ্ছে করেই একধরনের বাঙালি জাতীয়তাবাদের হাওয়া তুলে দিয়েছিলেন। জয় বাংলা, বাংলা নিজের মেয়েকে চায় ইত্যাদি মেসেজ সে বড় অংশের মধ্যে যথাযথভাবে চারিয়ে দিতে পেরেছিলেন ।
মমতা ব্যানার্জি বহিরাগত বলে বিজেপির দিকে আঙুল তুলে খুব ভুল করেননি। আসলে এর মধ্য দিয়ে বঙ্গ সংস্কৃতি বনাম গো-বলয়ের সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বকে উনি সামনে নিয়ে এসেছেন। মিথ্যে বলে লাভ নেই, বঙ্গ সংস্কৃতিতে বা উৎসবেও রাম নবমী, গণেশ পুজো বা বজরঙ্গ বলি নিয়ে মাতামাতি কোনোদিনই ছিল না। এ-সবই হচ্ছে ব্রাহ্মণবাদী রাজনৈতিক এজেন্ডা। এসব বিজেপি জোর করে পশ্চিমবঙ্গে ঢোকাতে চেয়েছে। যা বিরক্ত করেছে সাধারণ বাঙালি মননকে। ভোটে সে-সবেরই প্রতিফলন ঘটেছে।
খেয়াল করবেন যে, আমি এর আগে ইচ্ছে করেই মূলত হিন্দু বাঙালি শব্দটা লিখেছি। তিরিশ শতাংশ যে মুসলিম তারা মূলত আতঙ্ক থেকে নিরাপত্তার কারণে মমতার পেছনে দলবদ্ধভাবে এসে দাঁড়িয়েছেন। শীতলকুচির কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলি করে নিরীহ সংখ্যালঘুদের খুন করার পরে তাদের কাছে মমতা ব্যানার্জিকে বেছে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। ফলে মালদা মুর্শিদাবাদের মতো চিরকালের কংগ্রেসের গড়েও এবার তৃণমূলের জয়জয়কার।
বিজেপি-বিরোধী প্রশ্নে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু-মুসলমান একজোট হওয়া যেমন মমতার পালে হাওয়া দিয়েছে, ঠিক তেমনি মহিলাদের বড় অংশ বিজেপি নেতাদের অত্যন্ত দৃষ্টিকটু পিতৃতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে মমতা ব্যানার্জিকে সমর্থন করেছেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অশ্লীল দিদি ডাক শুধু দিদির নয় পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের অপমান এটা গ্রামের খেটে খাওয়া মহিলা থেকে শহরের অনেক এলিটও বুঝতে ভুল করেননি। মমতার বেশ কিছু সামাজিক প্রকল্প-স্বাস্থ্য সাথী, বিনে পয়সায় রেশন কন্যা শ্রী ইত্যাদি সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশের মন জয় করেছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
এক এক সময় এটা হয় সব কিছু ঠিকঠাক মিলে গেলে সাফল্য আসবেই। এবার মমতা ব্যানার্জির ঠিক তাই হয়েছে। তবে এই বিপুল সাফল্যের পেছনে আর একজনের কথা না বললে অন্যায় হবে। ভারতের রাজনীতিতে তিনি এখন পরিচিত এক বর্ণময় চরিত্র। প্রশান্ত কিশোর বা পিকে। পেশাদার এই রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিস্ট এবার মমতা ব্যানার্জির দলকে জেতাবার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। লোকসভা ভোটে বিজেপির ১৮টি আসন পাওয়ার পরেই মমতা ওকে নিয়োগ করেছিলেন ভরাডুবির হাত থেকে বাঁচতে। পিকে নিজের টিম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন নতুন নতুন কৌশলে তৃণমূলকে সাফল্য এনে দিতে। বাংলা নিজের মেয়েকে চায় বা জয় বাংলা এসব সেøাগানের পেছনে পিকের উদ্ভাবনী শক্তি কাজ করেছে। বস্তুত বাংলা জাতীয়তাবাদের আবেগ দিয়ে গো-বলয়ের মনুবাদী রাজনীতি ঠেকাবার কৌশল নির্মাণের মূল কারিগরই প্রশান্ত কিশোর। পিকে এও বলেছিলেন যে মমতা না জিতলে তিনি পেশা ছেড়ে দেবেন। মোদি-অমিত শাহকে সাইডলাইনের বাইরে ঠেলে দিয়ে আসল নায়ক কিন্তু প্রশান্ত কিশোরই। যখন তৃণমূল শিবিরের মধ্যে সংশয় ছিল জয় নিয়ে, তখনো পিকে জোর দিয়ে বলে গেছেন বিজেপি কোনোভাবেই একশোর বেশি সিট পাবে না। অন্যদিকে তৃণমূল দুশোর ওপরে যাবে।
সমস্যা হচ্ছে সাফল্য অনেক কিছু আড়াল করে রাখে। হিন্দিতে একটা কথা আছে যো জিতা ওহি সিকান্দার। মমতা জিতেছেন বলে এখন ওকে নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না। ভোটে জেতা মানেই কিন্তু ফ্যাসিবাদী রাজনীতি আটকানো নয়। প্রশান্ত কিশোর আগামী দিনে থাকবেন না। তখন আজকের রণকৌশল খাটতে নাও পারে। তৃণমূল একান্তই ব্যক্তিনির্ভর দল। দল বলছি বটে, আসলে তৃণমূল এখনো এক অর্থে একধরনের মঞ্চ। আনন্দে গা ভাসাতে ভাসাতে আমরা যেন ভুলে না যাই এই প্রথম, স্বাধীনতার পরে চরম হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সাতাত্তরটি আসন জিতেছে বিধানসভায়। আড়াই কোটির কাছাকাছি ভোট পেয়েছে। ৩৬ শতাংশ ভোট মানুষ বিজেপিকে দিয়েছে। তৃণমূল মমতা ব্যানার্জির ক্যারিশমাকে সম্বল করে একটা ভয়ংকর রেজিমেন্টেড দলকে কতদিন ঠেকিয়ে রাখতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ফ্যাসিবাদ স্রেফ ভোটে কত আসন পেল না পেল তা দিয়ে তার বিপদ বোঝা যায় না। সমাজ সংস্কৃতিতে ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ কতটা ঢুকে পড়তে পেরেছে তা নিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে বামেদের র্যাডিক্যাল অংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকজন চুপ করে আছেন দেখে একটু অবাক হচ্ছি। এখন আনন্দের সময়। তাই অপ্রিয় কথা না বলাই ভালো। তুললে বিপদও হতে পারে। তবু না বলে পারছি না। মমতা ব্যানার্জির অতি বড় সমর্থকও অন্তত আড়ালে মানবেন যে, তৃণমূল সুপ্রিমো আর যাইহোক গণতন্ত্রে খুব একটা বিশ্বাস করেন না। এই জায়গায় এক অদ্ভুত মিল কেন্দ্রের শাসকদের সঙ্গে। বিরোধী স্বর মমতা ব্যানার্জির পছন্দ নয়। ইতিমধ্যেই গ্রামে গ্রামে তৃণমূল বিরোধীদের ওপর ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হামলা শুরু হয়ে গেছে। এসব গণতন্ত্রের পক্ষে ইতিবাচক নয়। গণতন্ত্র না থাকলে এক স্বৈরতন্ত্র কখনো ফ্যাসিস্ট শক্তিকে আটকাতে পারবে না। ফলে সাময়িক স্বস্তি মিললেও আগামী দিন আমাদের পশ্চিমবঙ্গের জনগণের কাছে নির্ভেজাল আনন্দ আনবে বলে মনে হয় না।
