বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেই চলছে স্পিডবোট

আপডেট : ০৪ মে ২০২১, ০৪:০০ এএম

করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেই দেশের দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশদ্বার খ্যাত শিমুলিয়া- বাংলাবাজার নৌরুটে পদ্মাবক্ষে স্পিডবোট চলাচল করছে। গতকাল সোমবার সকালে মাদারীপুরের শিবচরে বাল্কহেড ও স্পিডবোটের সংঘর্ষে ২৬ জনের প্রাণহানি হয়। শুধু তাই-ই নয়, দুর্ঘটনাকবলিত স্পিডবোটের যাত্রীদের কারও পরনেই লাইফ জ্যাকেট পর্যন্ত ছিল না। দুর্ঘটনাকবলিত স্পিডবোটটি যৌথ মালিকানাধীন। তাদের দুজনের বাড়িই মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলায়।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, গতকাল সকালে শিমুলিয়াঘাট এলাকা থেকে কমপক্ষে ৩২ জন যাত্রীবোঝাই করে স্পিডবোটটি বাংলাবাজারঘাটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। পথিমধ্যে মাদারীপুরের শিবচরে পদ্মাবক্ষে বাল্কহেডের সঙ্গে সংঘর্ষে স্পিডবোট ডুবে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। লকডাউনের মধ্যে স্পিডবোট চলাচল নিয়ে কিছুই বলতে পারছে না মাওয়া নৌ-পুলিশ। কীভাবে স্পিডবোট চলছে তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি মাওয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সিরাজুল কবীর। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘কীভাবে স্পিডবোট চলছে আমার জানা নেই। গতকাল কখন ও কোথা থেকে ওই স্পিডবোটটি ছেড়ে গেছে তাও আমার জানা নেই।’

তিনি জানান, দুর্ঘটনাকবলিত স্পিডবোট মালিক হচ্ছেন মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার যশলদিয়া পদ্মা সেতুর পুনর্বাসন কেন্দ্রের বাসিন্দা চান্দু মোল্লা। স্পিডবোট চালক শাহ আলম ও তার সহকারী আবুল কালাম খানের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়।

শিমুলিয়াঘাট এলাকার দক্ষিণবঙ্গগামী বেশ কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে কথা হলে তারা জানিয়েছেন, ঘাটের অদূরের একটি চর থেকে মূলত যাত্রীবোঝাই করে স্পিডবোট ছেড়ে যায়। আবার কোনো কোনো স্পিডবোট ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়ার পর মাঝ পদ্মায় ফেরির পেছন থেকে যাত্রী তুলে থাকে। নিয়ম ভেঙে এভাবেই শিমুলিয়া থেকে দক্ষিণবঙ্গের এ নৌরুটে চলাচল করছে স্পিডবোট।

শিমুলিয়া স্পিডবোট ঘাটের ইজারাদার জেলার লৌহজং উপজেলার মেদেনীম-ল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ হোসেন খান জানান, দুর্ঘটনাকবলিত স্পিডবোটের মালিক হচ্ছেন দুজন। এদের একজন জহিরুল ইসলাম ও অন্যজন চান্দু মোল্লা। জহিরুলের বাড়ি লৌহজং উপজেলার কুমারভোগ গ্রামে ও চান্দুর বাড়ি যশলদিয়া গ্রামে।

‘লকডাউনে’ বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে স্পিডবোট চলাচল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এক মাস ৭ দিন যাবৎ লকডাউনে স্পিডবোট চলাচল বন্ধ রয়েছে। আমার লোকজন ঘাটে পর্যন্ত যাচ্ছে না। তবে কিছু অসাধু মালিক ও চালক শিমুলিয়ার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে অবৈধভাবে স্পিডবোট চালাচ্ছেন। ছেড়ে যাওয়া ফেরিগুলো থেকে মাঝ পদ্মায় যাত্রী তুলছেন স্পিডবোট চালকরা। স্থানীয় প্রশাসনকে আমরা বারবার এ ব্যাপারে বলেছি। তারপরও কোনো কাজেই আসেনি।’

যারা স্পিডবোট চালু করছে তাদের বিচার হওয়া উচিত : ‘এই লকডাইনের মধ্যে কীভাকে স্পিডবোট চালু হয়েছে। অবশ্যই ওপারের পুলিশ টাকা খেয়ে স্পিডবোট ছাড়ছে তাই আজ এতগুলো প্রাণ গেল। পুলিশ আর ঘাটের মানুষ না ছাড়লে কীভাবে আসলো স্পিডবোট। আর কেনই বা এতগুলো তাদের পরিবার থেকে চলে গেল।’ কথাগুলো দেশ রূপান্তরকে বলেন, গতকালের নৌ-দুর্ঘটনাস্থলের পাশের বাসিন্দা পারভিন।

স্থানীয় আরও এক ব্যক্তি বলেন, ‘আজ কিছু অসাধু লোকের জন্য কতগুলো প্রাণ গেল। আগে তাদের বিচার হওয়া উচিত। সঙ্গে যারা এটা পরিচালনা করে।’

গত এক সপ্তাহ আগে বাংলাবাজার ঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, গত সপ্তাহ থেকে ঢাকাগামী যাত্রীদের ভিড় বাড়তে থাকে শিবচরের বাংলাবাজার ঘাটে। ফেরিতে রয়েছে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়। পদ্মা পার হতে যাত্রীদের মধ্যে এক ধরনের ‘তাড়া’ রয়েছে। ফেরিতে নিজের জায়গা করে নিতে এক ধরনের তাড়াহুড়া দেখা গেছে যাত্রীদের মধ্যে। আবার ফেরিতে উঠতে ব্যর্থ হয়ে অনেক যাত্রীই পার হচ্ছেন স্পিডবোটে। ফেরিঘাট ছেড়ে যাওয়ার পর কিছু কিছু স্পিডবোট ফেরির সঙ্গে ভিড়িয়ে যাত্রীদের তুলে নিচ্ছে। সেক্ষেত্রে আড়াইশ টাকা করে ভাড়া নিচ্ছে তারা। এছাড়াও স্পিডবোট ঘাটের পাশে লঞ্চ ও ফেরিঘাটের মাঝামাঝি স্থান থেকে কিছু স্পিডবোট যাত্রী পারাপার করছে। সেক্ষেত্রে তিনশ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে স্পিডবোট ভাড়া। স্বাভাবিক সময়ে এই ভাড়ার পরিমাণ ছিল দেড়শ টাকা!

বাংলাবাজার ঘাটের কর্মকর্তারা জানান, লঞ্চের পাশাপাশি স্পিডবোট চলাচলও নিষেধ। তবে বাংলাবাজার ঘাটের এবং শিমুলিয়া থেকে যাত্রী নিয়ে আসা কিছু স্পিডবোট যাত্রী পারাপার করছে। যদিও স্পিডবোট ঘাট থেকে না নিয়ে পাশেই নদীর পার থেকে যাত্রী উঠাচ্ছে তারা। কিছু বোট আবার ফেরির সঙ্গে ঠেকিয়ে যাত্রী উঠাচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঘাটের এক ব্যক্তি বলেন, স্থানীয়ভাবে যারা প্রভাবশালী তাদের বোটগুলোই যাত্রীদের পারাপার করছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এসব স্পিডবোট যাত্রী পারাপার করে থাকে। ভাড়াও আদায় করছে দ্বিগুণের বেশি। যদি ‘লকডাউনের’ আইন মানত তাহলে এতগুলো মানুষে প্রাণহানি হতো না।

এ প্রসঙ্গে কাঁঠালবাড়ী নৌপুলিশ ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘ঘাটে যাত্রীদের প্রচ- চাপ রয়েছে গত এক সপ্তাহ ধরে। এরই মধ্যে কিছু কিছু স্পিডবোট ঘাটের বিভিন্ন স্থান থেকে যাত্রী পারাপার করছে। আমরা সেখানে গেলেই আবার দ্রুত ওই স্থান ত্যাগ করে তারা। তবে আমরা চেষ্টা করেছিলাম  যাতে অবৈধভাবে স্পিডবোটে যাত্রী পার না করতে পারে।’

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘নিষেধ থাকার পরও কিছু কিছু স্পিডবোট যাত্রী পারাপার করছে বলে জানতে পেরেছি। এ বিষয়ে নৌপুলিশকে জানানো হয়েছে। তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেবে বলে আমাদের জানিয়েছিল।’

মাদারীপুর জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন বলেন, ‘এই লকডাউনের মধ্যে যারা অবৈধভাবে স্পিডবোট চালু রেখেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, এই দুর্ঘটনার বিষয় একটি ৬ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তিন দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। আমরা রিপোর্ট পেলেই আইনগত যে ব্যবস্থা সেটা গ্রহণ করব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত