দেশের দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশদ্বারখ্যাত শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের শিমুলিয়ায় স্পিডবোট চলাচলে সিরিয়াল পেতে প্রথমেই দিতে হয় ৩০ হাজার টাকা চাঁদা। শিমুলিয়া স্পিডবোট ঘাটের ইজারাদারকে টাকা দিলেই মেলে স্পিডবোট চলাচলের সিরিয়াল। প্রতি মাসেই টাকা দিয়ে নতুন করে একেকটি স্পিডবোটের সিরিয়াল নিতে হয়। স্পিডবোট চলাচলে এমনই অনিয়ম নিয়মে পরিণত হয়ে আসছে গেল আট বছর ধরে। স্পিডবোট মালিক-চালকদের চাঁদা দিতে হয় স্থানীয় কিছু সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যদেরও। প্রতিদিন সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যদের কেউ ২০০ টাকা আবার কেউ ৫০০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করে থাকে স্পিডবোট চালক-মালিকদের কাছ থেকে। এছাড়া স্পিডবোট চলাচলের এই অবৈধ কারবারের জন্য নৌপুলিশ ও বিআইডব্লিউটিএ’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও দিতে হয় মাসোয়ারা।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্পিডবোট চলাচলের অবৈধ কারবারের জন্য প্রতি মাসে মাওয়া নৌপুলিশ ৫০ হাজার টাকা উৎকোচ পেয়ে আসছে। এর সঙ্গে প্রতিদিনের বাড়তি আর্থিক সুবিধা তো রয়েছেই। আর বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তাদের জন্যও প্রতি মাসে রয়েছে নির্দিষ্ট অঙ্কের আর্থিক সুবিধা। গতকাল মঙ্গলবার দিনভর শিমুলিয়া ঘাট ঘুরে স্থানীয় স্পিডবোট চালক ও মালিকদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য মিলেছে। তাদের কথামতে, স্থানীয় প্রশাসনও মাসোয়ারার বাইরে নেই। নৌপুলিশ, বিআইডব্লিউটিএ ও স্থানীয় প্রশাসনের পেছনে স্পিডবোট চলাচলে বছরে ২০ লাখ টাকার মতো খরচা হয়ে থাকে বলে তথ্য মিলেছে।
এদিকে শিবচরের কাঁঠালবাড়ী ঘাটে বাল্কহেডের সঙ্গে স্পিডবোটের সংঘর্ষে ২৬ জন নিহতের ঘটনায় গতকাল সকালে স্পিডবোটের চালকসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অন্যদিকে এই নৌ-দুর্ঘটনায় গঠিত নৌপরিবহন অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটি গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।
জানা গেছে, শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে নিবন্ধন ছাড়াই সাড়ে চারশো স্পিডবোট চলাচল করছে। সকাল ৬টা থেকে শুরু হয়ে থাকে স্পিডবোট চলাচল। প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী, সন্ধ্যার আগমুহূর্ত পর্যন্ত চলাচল করার নিয়ম রয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ম্যানেজ করে রাত ১০টা অবধি চলাচল করে থাকে এসব স্পিডবোট। এ সময় চালকের হাতের টর্চলাইট দিয়ে পদ্মা পাড়ি দিয়ে থাকে স্পিডবোটগুলো। দিন ফুরালে রাতে স্পিডবোটের ভাড়া বেড়ে দাঁড়ায় দ্বিগুণ-তিনগুণে।
দক্ষিণবঙ্গের ২১ জেলার প্রবেশপথ এই নৌরুটে স্পিডবোট চলাচল শুরু হয় ১৫ বছর আগে। এর মধ্যে সিরাজ মেম্বার দুই বছর, রাশেদুল হক মুন্না এক বছর, আবু বকর সিদ্দিক কালু তিন বছর, হামিদুল ইসলাম এক বছর ও মহিউদ্দিন সিকদার এক বছর স্পিডবোট ঘাটের নিয়ন্ত্রণ করেছেন। বর্তমান সরকারের সর্বশেষ আট বছর ধরে স্পিডবোট ঘাট নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন জেলার লৌহজং উপজেলার মেদেনীম-ল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ হোসেন খান। তিনি বিভিন্ন নামে এ ঘাটের ইজারা এনে থাকেন। বর্তমানে স্পিডবোট ঘাটের ইজারাদার হচ্ছেন ইউপি চেয়ারম্যান আশরাফের ভাই শাহ আলম। ঘাটের ব্যবস্থাপনায় রয়েছেন তার শ্যালক ডিজিটাল মাতিন ও পরিচালনা করছেন মেয়ে জামাই সুমন শেখ।
করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে ‘লকডাউনের’ মধ্যে বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে এ নৌরুটে প্রমত্তা পদ্মাবক্ষে স্পিডবোট চলাচল থেমে থাকেনি। সাধারণত একেকটি ছোট আকারের স্পিডবোটে ১০ জন, মাঝারি বোটে ১৫ ও বড় আকারের স্পিডবোটে ২০ জন যাত্রী ধারণক্ষমতা রয়েছে। অথচ ‘লকডাউনের’ মধ্যে দ্বিগুণ যাত্রীবোঝাই করে পদ্মা পাড়ি দিয়ে আসছিল স্পিডবোটগুলো। শিমুলিয়া ঘাটের আশপাশের আলাদা তিনটি পয়েন্ট থেকে যাত্রীবোঝাই করছিল স্পিডবোট চালকরা। এর মধ্যে শিমুলিয়া ঘাটসংলগ্ন চর ও স্পিডবোট ঘাটের দুই পাশে পদ্মার তীর থেকে যাত্রীবোঝাই করে বাংলাবাজারের উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছিল স্পিডবোটগুলো। এছাড়াও মাঝ পদ্মায় ঘাট ছেড়ে যাওয়া ফেরি থেকে যাত্রীবোঝাই করে থাকে। সাধারণত যাত্রীপ্রতি ভাড়া আদায় করা হতো ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। ‘লকডাউনে’ যাত্রী পারাপারে স্পিডবোটের চালকরা মাথাপিছু ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা আদায় করে আসছিল। এমন পরিস্থিতিতে গেল সোমবার মাদারীপুরের শিবচরে কাঁঠালবাড়ী ঘাটসংলগ্ন পদ্মাবক্ষে বাল্কহেডের সঙ্গে সংঘর্ষে স্পিডবোটের ২৬ যাত্রীর প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এ দুর্ঘটনা ঘিরে পদ্মায় স্পিডবোট চলাচলের বৈধতা নিয়ে চলছে নানা কথা। চলমান ‘লকডাউনে’ স্পিডবোট চলাচলের নেপথ্যে উঠে এসেছে শিমুলিয়া স্পিডবোট ঘাটের ব্যবস্থাপনায় থাকা ডিজিটাল মাতিন ও পরিচালনায় থাকা সুমন শেখের নাম। ঘাটে বসেই ডিজিটাল মাতিন স্পিডবোট চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্পিডবোট চালক ও মালিকরা জানিয়েছেন। তারা জানান, বিআইডব্লিউটিএ’র স্পিডবোট ঘাটের পন্টুনের একটি কক্ষে বসে তিনি স্পিডবোট চলাচলের সিরিয়াল দিয়ে আসছেন। আবার মেদেনীম-ল ইউপির চেয়ারম্যান আশরাফ হোসেন খানের অনুমতি ছাড়া এ ঘাট থেকে কোনো স্পিডবোট চলাচল করা অসম্ভব বলেও জানিয়েছেন চালক ও মালিকরা।
এ প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে শিমুলিয়া ঘাটের অধিপতি মেদেনীম-ল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মেদেনীম-ল ইউনিয়নের উত্তর যশলদিয়া গ্রামের বাড়িতে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নাম্বারে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তার ভাই শিমুলিয়া ঘাটের ইজারাদার শাহ আলমের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ইউপি চেয়ারম্যানের শ্যালক ঘাটের ব্যবস্থাপনায় থাকা ডিজিটাল মাতিনের মোবাইল ফোন নাম্বারেও একাধিকবার কল করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। মেয়ে জামাই সুমন শেখের মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া গেছে।
স্পিডবোট চলাচলের কারবার প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিএ’র শিমুলিয়া ঘাটের বন্দর কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লঞ্চ ও স্পিডবোটের মধ্যে একটা পার্থক্য রয়েছে। লঞ্চের পার্থক্য যেটা লঞ্চ পন্টুন ছাড়া চলতে পারে না। আর স্পিডবোট হালকা হওয়াতে যেকোনো জায়গা থেকে যাত্রী ওঠানামা করতে পারে। যদি ঘাট বন্ধও থাকে তবু তারা বিভিন্ন স্থান থেকে যাত্রী ওঠানামা করবে। এখন আমাদের লোকবল কম। তাই আমাদের পক্ষে স্পিডবোট চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও মেসেজ দেওয়া কোনোটাই সম্ভব নয়। আমরা চেষ্টা করি নৌপুলিশ ও ইজারাদারদের নিয়ে এসব করার জন্য। এ ব্যাপারটা নিয়ে আমার মধ্যস্থতা করা ছাড়া আর কিছু বলার নেই।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার বন্দর কর্মকর্তা হিসেবে এখানে মেয়াদ হচ্ছে মাত্র এক মাস। আমি বলতে চাই আমাকে ম্যানেজ করতে পারছে এমন একজন লোক দেখা দরকার। তারা যে বোট চালাচ্ছে এটা বছরের পর বছর ধরে চালাচ্ছে। এটা হচ্ছে দীর্ঘদিনের জঞ্জাল। প্রত্যেকের এই অবহেলা ছিল। বোট মালিক বলেন, ইজারাদার বলেন, নৌপুলিশ বলেনÑ কমবেশি প্রত্যেকেরই অবহেলা ছিল। আবার চেষ্টা যে কেউ করে না তাও না।’
স্পিডবোট চলাচলে মাসোয়ারা আদায়ের কথা অস্বীকার করেছেন মাওয়া নৌপুলিশের ইনচার্জ সিরাজুল কবির। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটের অধিকাংশ স্পিডবোটের নিবন্ধন নেই। চালকদেরও কোনো লাইসেন্স নেই, নেই প্রশিক্ষণ পর্যন্ত। এগুলো দেখভাল করার দায়িত্ব একমাত্র বিআইডব্লিউটিএর। তারাই নির্ধারণ করবে কোন চালক বোট চালাবে, তাদের কোনো লাইসেন্স আছে কি না। ভাড়া আর যাত্রী কত নেবে তা দেখবে বিআইডব্লিউটিএ। নৌপুলিশ শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি দেখে থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘লকডাউনে শিমুলিয়া ঘাট থেকে কোনো স্পিডবোট ছেড়ে যেতে দিইনি আমরা। আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে পাশের কোনো চর এলাকা থেকে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে স্পিডবোট চালাচ্ছিল। চোরাপথে চলাচলের কারণেই স্পিডবোট দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে।’
স্পিডবোট দুর্ঘটনায় চারজনের বিরুদ্ধে মামলা : শিবচরের কাঁঠালবাড়ী ঘাটে বাল্কহেডের সঙ্গে স্পিডবোটের সংঘর্ষের ঘটনায় গতকাল সকালে স্পিডবোটের চালকসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে শিবচর থানায়। কাঁঠালবাড়ী নৌপুলিশ ফাঁড়ির এসআই লোকমান হোসেন বাদী হয়ে বোটের চালক শাহ আলম, মালিক চান্দু ও রেজাউল এবং স্পিডবোট ঘাটের ইজারাদার শাহ আলম খানসহ আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করে এ মামলা করেন। নৌপুলিশের ওসি আবদুর রাজ্জাক এ তথ্য জানিয়েছেন।
মাদারীপুরের পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল বলেন, ‘আমরা মামলা নিয়েছি। একজন আটক রয়েছে আর বাকিদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
তদন্ত কমিটির কাজ শুরু : বাল্কহেডের সঙ্গে স্পিডবোটের সংঘর্ষের ঘটনায় গঠিত নৌপরিবহন অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটি গতকাল ঘটনাস্থলে এসে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে। অধিদপ্তরের স্পেশাল অফিসার মেরিন সেফটি ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইমদাদুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে গতকাল দুপুরে। কমিটির অন্য দুই সদস্য ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার মো. শাহরিয়ার হোসেন ও পরিদর্শক আমির হোসেন ভূঁইয়া।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহায়তা করেছেন মাদারীপুর প্রতিনিধি মেহেদী হাসান সোহাগ।
