হেফাজতের আরও দুই নেতার বিরুদ্ধে ডিজিটাল আইনে মামলা

আপডেট : ০৫ মে ২০২১, ০৭:০১ এএম

এবার হেফাজতে ইসলামের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলা কমিটির সহ-সভাপতি মাওলানা মেহেদী হাসান ও সহ-সাধারণ সম্পাদক মুফতি আমজাদ হোসাইন আশরাফীর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে। গত সোমবার রাতে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রবিউল হোসেন রুবেল সদর মডেল থানায় এজহারটি জমা দেন; গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে মামলাটি নথিভুক্ত হয়। মামলায় মেহেদী ও আমজাদসহ তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। হেফাজত নেতা মেহেদী হাসান নবীনগর পূর্ব ইউনিয়নের বগডহর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য রহিছ উদ্দিনের ছেলে। অন্য আসামিরা হলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কে. দাস মোড়ের বাসিন্দা ও কে দাস ভবনের মালিক সানাউল হক চৌধুরী (৫৫)।

মামলার এজাহারে বলা হয়, আসামিরা গত ২৬ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংগঠিত হেফাজতে ইসলামের তান্ডবের প্রত্যক্ষ মদদদাতা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং আইনশৃঙ্খলা অবনতির জন্য মাওলানা মেহেদী হাসান তার ফেইসবুক আইডি থেকে একটি পোস্ট দেন। মেহেদী তার সেই পোস্টে মোকতাদির চৌধুরীকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসায় হামলাকারী উল্লেখ করেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ঘটানোর অভিপ্রায়ে বাকি দুই আসামি মেহেদীর ওই পোস্ট প্রচার করেন বলে এজহারে উল্লেখ করা হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার ওসি (তদন্ত) মুহাম্মদ শাহজাহান জানান, ছাত্রলীগ সভাপতির দেওয়া এজহারটি গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গেও কথা বলেছি। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে মামলাটি সদর থানায় নথিভুক্ত করা হয়েছে।

এর আগে গত শনিবার সন্ধ্যায় হেফাজতে ইসলামের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কমিটির সভাপতি মাওলানা সাজিদুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক মুফতি মুবারক উল্লাহর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা নেওয়ার জন্য সদর মডেল থানায় এজাহার জমা দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য র. আ. ম. উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। হেফাজতের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও দেড়শ জনকে আসামি করা হয় এজাহারে। তবে এজাহারটি মামলা হিসেবে এখনো নথিভুক্ত হয়নি। এজাহারে উল্লিখিত ফেইসবুক পেইজ ও আইডির লিংকগুলো পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ঢাকার কাছে চিঠি দিয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানা পুলিশ।

হেফাজত তান্ডবের বিচার চেয়ে পদত্যাগ করা হেফাজতের সেই নেতা গ্রেপ্তার : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতে ইসলামের কর্মী-সমর্থকদের চালানো তান্ডবের প্রতিবাদ এবং জড়িতদের বিচার চেয়ে পদত্যাগ করা সংগঠনটির জেলা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বিলুপ্ত কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুফতি আব্দুর রহিম কাসেমীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের ভাদুঘর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি বিজয়নগর উপজেলার দারিয়াপুর গ্রামের মৃত মতিউর রহমানের ছেলে। এছাড়া তিনি জামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার সিনিয়র মুহাদ্দেস ও সহকারি শিক্ষা সচিব ছিলেন। গত ১ ডিসেম্বর মঙ্গলবার মাদ্রাসার নীতিনির্ধারণী ফোরাম মজলিশে এলমিয়ার জরুরি সভায় তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মুফতি মোবারকউল্লাহ স্বাক্ষরিত এক নোটিসে এ তথ্য জানান।

জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লোকমান হোসেন বলেন, মুফতি আবদুর রহিম কাসেমী কসবা-আখাউড়া ও বিজয়নগরসহ বিভিন্ন স্থানে ৫টি কওমি মাদ্রাসা পরিচালনা করেন। ২০১৬ সালের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতি তা-বের মূল নেতৃত্বে ছিলেন। তাকে রিমান্ডে এনে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে। বুধবার তাকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাওয়া হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) মো. রইছ উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, হেফাজতে ইসলামের কর্মী-সমর্থকদের চালানো তা-বের ঘটনা তদন্ত করে আবদুর রহিম কাসেমীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এছাড়া ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চালানো তা-বেও তার সংশ্লিষ্টতা ছিল।

এর আগে হোফাজতে ইসলামের চালানো তান্ডবের ঘটনার প্রতিবাদ এবং জড়িতদের বিচার চেয়ে গত ২৩ এপ্রিল হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে পদত্যাগ করেন আবদুর রহিম কাসেমী। ওইদিন সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো লিখিত বক্তব্যে আবদুর রহিম কাসেমী বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমনকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী হেফাজতে ইসলামের ডাকে যে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, তা নজিরবিহীন ও অমানবিক। দেশ ও জনগণের জানমালের ক্ষতি কোনোভাবেই ইসলামসম্মত হতে পারে না। যাদের প্ররোচনায় দেশ ও জনগণের জানমালের এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান কাসেমী।

হেফাজত তান্ডবের ঘটনায় কওমি ছাত্র পরিষদের সেক্রেটারি ৫ দিনের রিমান্ডে : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতে ইসলামের তান্ডবের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে জেলা কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা বিল্লাল হোসেনকে (৪০) ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার সকালে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা বিল্লালকে আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ড চাইলে বিজ্ঞ আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। এর আগে গত সোমবার সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের কান্দিপাড়া এলাকা থেকে সদর মডেল থানা পুলিশের একটি দল তাকে গ্রেপ্তার করে। তিনি কান্দিপাড়া এলাকার জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক। তিনি জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার মরিচাকান্দি গ্রামের সানাউল্লাহর ছেলে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার অফিসার ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা ওসি (তদন্ত) মো. শাহজাহান বলেন, হেফাজত তান্ডবের অগ্রভাগে নেতৃত্ব দিয়েছেন বিল্লাল। ভিডিও ফুটেজেও তাকে দেখা গেছে। তাকে তান্ডবের একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ডে আনা হয়েছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে গত ২৫ মার্চ বিকেলে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রেস ক্লাব চত্বরে সমাবেশ করে নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশে এলে সারা দেশে রক্তের বন্যা বইয়ে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেয় কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ। এরপর ২৬ মার্চ বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শহরের রেলস্টেশন, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ম্যুরাল, জেলা পরিষদ ডাবাংলোসহ প্রায় ২০টি প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে হেফাজত ও কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ সমর্থিত মাদ্রাসার ছাত্ররা। এছাড়া ২৭ ও ২৮ মার্চ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ব্যাপক হামলা ও নারকীয় তান্ডবেও নেতৃত্বে ছিল হেফাজত ও কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ।

উল্লেখ্য, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে গত ২৬ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ব্যাপক তান্ডব চালায় হেফাজতে ইসলামের কর্মী-সমর্থকরা। তারা সরকারি-বেসরকারি প্রায় অর্ধশত স্থাপনায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এসব ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, সরাইল ও আশুগঞ্জ থানায় ৫৫টি মামলা করেছে পুলিশ ও ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর কর্তৃপক্ষ। এ মামলাগুলোতে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ৫০৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত