সিলেট নগরের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে যুবক রায়হান আহমদের (৩৪) মৃত্যুর ঘটনায় ওই ফাঁড়ির তখনকার ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ পুলিশের পাঁচ সদস্য এবং আকবরের এক আত্মীয়কে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। ঘটনার প্রায় সাত মাস পর গতকাল বুধবার মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) অভিযোগপত্র পুলিশের প্রসিকিউশন শাখায় জমা দিয়েছে। প্রসিকিউশন শাখা অভিযোগপত্রটি ভার্চুয়াল আদালতে উপস্থাপন করবে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা পিবিআই সিলেট জেলার পুলিশ সুপার মুহাম্মদ খালেদ-উজ-জামান।
তিনি বলেছেন, ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আসামিরা রায়হান ছিনতাইকালে গণপিটুনিতে মারা গেছে বলে মিথ্যা তথ্য প্রচার করে।
অভিযোগপত্র জমার বিষয়ে গতকাল দুপুরে পিবিআই সিলেট কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে কর্মকর্তারা জানান, অধিকতর তদন্ত ও চলমান করোনা পরিস্থিতির কারণে মামলাটির অভিযোগপত্র দিতে কিছুটা দেরি হয়েছে। অভিযুক্ত আসামিরা হলেন বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া (৩২), এএসআই আশেক এলাহী (৪৩), এএসআই হাসান উদ্দিন (৩২), কনস্টেবল হারুন অর রশিদ (৩২) ও টিটু চন্দ্র দাস (৩২) এবং এসআই আকবরের আত্মীয় সংবাদকর্মী আবদুল্লাহ আল নোমান। অভিযুক্তদের মধ্যে আকবর, আশেক এলাহী, হারুন ও টিটু নির্যাতন ও হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত এবং হাসান ও নোমান আলামত নষ্ট ও আসামিদের পালাতে সহায়তা করেন। অভিযুক্ত আসামিদের মধ্যে আবদুল্লাহ আল নোমান ছাড়া অন্য পাঁচজন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এ ঘটনায় তৌহিদ মিয়া নামে আরেক পুলিশ কনস্টেবলকে গ্রেপ্তার করা হলেও সম্পৃক্ততা পাওয়া না যাওয়ায় তাকে অভিযোগপত্রে অভিযুক্ত করা হয়নি। অভিযোগপত্রে যেসব আইনে অভিযোগ আনা হয়েছে তা প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে বলে জানিয়েছেন পিবিআই কর্মকর্তারা।
অভিযোগপত্রে আসামিদের বিরুদ্ধে ৩০২, ৫০১ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন ২০১৩ এর ১৫(২), ১৫(৩) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এ দুই আইনের একটিতে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও অন্যটিতে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবনের কথা উল্লেখ আছে।
১৯৬২ পৃষ্ঠার এ অভিযোগপত্রে ৬৯ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে জানিয়ে পিবিআই সিলেট বিভাগের এসপি হুমায়ুন কবির বলেন, এর মধ্যে ১০ জন ১৬৪ ধারায় আদালতে সাক্ষী দিয়েছেন। যাদের মধ্যে ৭ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। তবে রায়হানকে ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে নির্যাতন পূর্বপরিকল্পিত কিংবা পূর্ববিরোধের জের ধরে নয় বলে জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, রায়হান আহমদকে ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে নির্যাতন চালানোর প্রমাণ মিলেছে তদন্তে। বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ বহিষ্কৃত এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া, বহিষ্কৃত সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আশেক এলাহী, পুলিশের কনস্টেবল হারুন অর রশিদ ও টিটু চন্দ্র দাস নির্যাতনে অংশ নেন বলে তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এসপি খালেদ উজ জামান ব্রিফিংয়ে জানান, গত বছর ১০ অক্টোবর রাতে সিলেটের গোলাগঞ্জের সাইদুল শেখ ও রনি শেখ নগরীর কাস্টঘর সুইপার কলোনি থেকে চার পিস ইয়াবা ক্রয় করে। পরে ইয়াবাগুলো আসল নয় বলে দাবি করে তারা। এরপর এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রায়হান আহমদ মারধর করে সাইদুল শেখের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও ৯ হাজার ৭০০ টাকা নিয়ে যায়। পরে বন্দরবাজারের মাশরাফিয়া রেস্টুরেন্টের সামনে গিয়ে পুলিশ ফাঁড়ির সিয়েরা-৪ ও রোমিও-৪ এর কাছে সাইদুল শেখ ও রনি শেখ মৌখিকভাবে অভিযোগ করেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ কাস্টঘরের চুলাই লালের ঘর থেকে রায়হান আহমদকে আটক করে ফাঁড়িতে নিয়ে যায়। এরপর এসআই আকবরসহ অন্যরা তাকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেন। নির্যাতনে আহত রায়হানকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আসামিরা রায়হান ছিনতাইকালে গণপিটুনিতে মারা গেছে বলে মিথ্যা তথ্য প্রচার করেন এবং ঘটনার সংশ্লিষ্ট আলামত ধ্বংস করেন।
এদিকে নিহত রায়হানের মা সালমা বেগম ঘটনার পর থেকেই অভিযোগ করে আসছেন, অন্য কারও ইন্ধনে পূর্বপরিকল্পনার জেরে রায়হানকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করেছে পুলিশ। তবে গতকাল এসপি খালেদ উজ জামান বলেন, দীর্ঘ তদন্ত, সবার সাক্ষ্যগ্রহণ এবং রায়হান, আকবরসহ সংশ্লিষ্টদের মোবাইল ফোন আলাপ সংগ্রহ করেও আমরা এরকম কোনো প্রমাণ পাইনি। রায়হানকে নির্যাতনের সঙ্গে পূর্ববিরোধের কিছু পাওয়া যায়নি।’
সিলেটের কোর্ট ইন্সপেক্টর প্রদীপ কুমার জানান, বহুল আলোচিত রায়হান হত্যা মামলার অভিযোগপত্র পিবিআই হন্তান্তর করেছে। করোনাভাইরাসের কারণে আদালতের কার্যক্রম ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে চলার কারণে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হচ্ছে না। ভার্চুয়াল মাধ্যমেই তা আদালতে উপস্থাপন করা হবে।
অভিযোগপত্র দাখিলের পর রায়হানর আহমদের মা সালমা বেগম বলেন, ‘আমি একজন সাধারণ গৃহিণী। অভিযোগপত্রে কী আছে না আছে সেটা আমাদের পক্ষের আইনজীবীরা দেখবেন। তবে আমার একটাই দাবি সব আসামির যেন ফাঁসি হয়, আমি জীবিত থাকতেই যেন আমার ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে পারি।’
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার এমএ ফজল চৌধুরী জানান, পিবিআই দাখিলকৃত অভিযোগপত্রে আপাতত কোনো অসংগতি চোখে পড়েনি। তবে অভিযোগপত্রসহ অন্যান্য কাগজপত্র দেখে বিস্তারিত জানা যাবে।
সিলেট নগরের আখালিয়া নেহারিপাড়ার বাসিন্দা রায়হান আহমদকে গত বছর ১০ অক্টোবর রাতে সিলেটের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। এরপর কয়েক ঘণ্টা চলে নির্যাতন। শেষ রাতে এক পুলিশ সদস্যের মোবাইল ফোন থেকে নিজের চাচাকে ফোন করে রায়হান। এ সময় রায়হান কান্নাজড়িত কণ্ঠে দ্রুত ১০ হাজার টাকা নিয়ে ফাঁড়িতে যাওয়ার জন্য চাচাকে অনুরোধ করে। ভোরে টাকা নিয়ে ফাঁড়িতে হাজির হন রায়হানের চাচা। তবে তখন তাকে রায়হানের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি এবং রাহয়ান হাসপাতালে আছে বলে জানানো হয়। ১১ অক্টোবর সকালে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রায়হানের লাশ পান পরিবারের সদস্যরা। এ ঘটনায় পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার বাদী হয়ে এসএমপির কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। ময়নাতদন্তে রায়হানের শরীরে ১১১টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। ভিসেরা রিপোর্টেও উল্লেখ করা হয়েছে অতিরিক্ত আঘাতেই তার মৃত্যু হয়েছে।
রায়হানের মৃত্যুর পর ফাঁড়ির তখনকার ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া গা ঢাকা দেন। গত ৯ নভেম্বর সিলেটের কানাইঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর চেষ্টাকালে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। আকবর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ থানার বগইর গ্রামের জাফর আলী ভূঁইয়ার ছেলে। তিনি সিলেটের কোতোয়ালি থানার অধীন বন্দরবাজার ফাঁড়িতে প্রায় এক বছর ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
