সম্প্রতি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উন্নয়নকাজের জন্য কাটা হয়েছে বেশ কয়েকটি গাছ। এ নিয়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে। পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠনও প্রতিবাদী মানববন্ধন করেছে। তবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় বলছে, উদ্যানে গৃহীত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছু গাছ কাটা হলেও প্রায় ১ হাজার গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সরেজমিনে দেখা যায়, ইতিমধ্যে বেশ কিছু গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। আরও কিছু গাছে লাল রং দিয়ে কাটার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে একটি সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে, ‘ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় উদ্যানের সৌন্দর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে পরিকল্পিত সবুজায়ন ও পরিবেশ উন্নয়নের কাজ চলমান।’
এদিকে গাছ কাটার প্রতিবাদ জানিয়েছে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)। রেস্টুরেন্ট নির্মাণ, নির্বিচারে গাছ নিধন বন্ধ করাসহ ৬ দফা সুপারিশ করে সংগঠনটি। সুপারিশে বলা হয়েছে, ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পরিবেশ, তত্ত্বাবধান, সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা, দৈনন্দিন পরিচালনা বিশ^মানের করতে হবে। রমনা গ্রিন ধরে রাখতে হবে। উদ্যানের স্থান ও পরিবেশ সংরক্ষণ করতে একটি উপযুক্ত কর্র্তৃপক্ষের কাছে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিতে হবে; উদ্যানে রেস্তোরাঁ, ওয়াকওয়ে কিংবা এ জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা বিস্তৃতভাবে অবিলম্বে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে এবং উদ্যানসহ সব ঐতিহাসিক স্থাপনা বা এলাকার উন্নয়নের জন্য নগর পরিকল্পক, স্থপতি, শিল্পী, ইতিহাসবিদ, উদ্যানবিদ, প্রকৌশলী, শিক্ষক, পরিবেশবিদ ও কবি-সাহিত্যিক সব স্টেকহোল্ডারের সমন্বয়ে একটি কমিটি করতে হবে। যারা পরিকল্পনা থেকে শুরু করে উন্নয়নকাজগুলো পর্যবেক্ষণ করবেন ও প্রয়োজনীয় মতামত দেবেন।’
নিয়মানুযায়ী নগরে ২৫ ভাগ বনভূমি থাকার কথা থাকলেও রাজধানীতে ২৫ ভাগ বনভূমি নেই উল্লেখ করে পরিবেশবাদীরা বলছেন, সবুজ ধ্বংস করে রেস্টুরেন্ট বানানো ভয়াবহ অপরাধ। এর বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। বেশ কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গাছ কাটার প্রতিবাদ জানিয়েছে। গাছ কাটা বন্ধ না হলে তীব্র আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনগুলো। এসব সংগঠনের মধ্যে রয়েছে নোঙর বাংলাদেশ, স্বাধীনতা উদ্যান সাংস্কৃতিক জোট ও গ্রীন প্ল্যানেট।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গাছ কাটার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। গতকাল বুধবার মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক হাজার গাছ লাগানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। মন্ত্রণালয় এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা সুফি মারুফ স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনে বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন, ঘটনাসহ মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও বিশ^বাসীর নিকট তুলে ধরার উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইতিমধ্যে শিখা চিরন্তন, স্বাধীনতা স্তম্ভ ও ভূগর্ভস্থ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রভৃতি নির্মাণ করা হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ, আধুনিক নগর উপযোগী সবুজের আবহে আন্তর্জাতিক মানে গড়ে তোলা ও দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে ‘ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ’ (৩য় পর্যায়)’ শীর্ষক মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে বর্তমানে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণকাজ যেমন পাকিস্তানি শাসনবিরোধী ২৩ বছরের মুক্তিসংগ্রাম ও ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসসংবলিত ভাস্কর্য স্থাপন, সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের স্থানে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থানে ভাস্কর্য স্থাপন, ইন্দিরা মঞ্চ নির্মাণ, ওয়াটার বডি ও ফাউনটেইন নির্মাণ, ভূগর্ভস্থ ৫০০ গাড়ির পার্কিং, শিশুপার্ক নির্মাণসহ বিভিন্ন নির্মাণকাজ চলমান। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গৃহীত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছু গাছ কর্তন করা হলেও প্রায় এক হাজার গাছ লাগানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসব কার্যক্রমের বিষয়ে খ-িত তথ্য প্রচারিত হওয়ায় অনেকের মাঝে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে।’
মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ ও স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে আন্তর্জাতিক মানের স্মৃতিকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেশপ্রেমিক-সচেতন নাগরিকদের সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে।
