করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সারা দেশে ‘গণপরিবহন বন্ধ’ ও ‘কঠোর বিধিনিষেধ’ চলাকালে গত সোমবার পদ্মায় একটি স্পিডবোট দুর্ঘটনায় নিহত হয় ২৬ জন। ওইদিন সকালে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বাংলাবাজার ফেরিঘাটে বালুবাহী একটি বাল্কহেডের সঙ্গে একটি স্পিডবোটের সংঘর্ষে ওই দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে ২৬ জনের লাশ উদ্ধারের পাশাপাশি আহত আরও পাঁচজনকে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পদ্মায় মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় নৌপথে নৈরাজ্য-বিশৃঙ্খলার বিষয়টি আবারও সামনে আসে। প্রশ্ন উঠে একটি স্পিডবোটের যাত্রী ধারণক্ষমতা কতজন আর তাতে সওয়ার হয়েছিলেন কতজন? এরপর জানা যায়, আসলে এসব স্পিডবোটে যাত্রী বহনেরই কোনো বৈধতা নেই। সে সঙ্গে এগুলোর কোনোটিরই কোনো নিবন্ধন নেই। তাহলে বছরের পর বছর ধরে শিমুলিয়া-বাংলাবাজার রুটে পদ্মা পারাপারসহ অন্যান্য স্থানে এসব স্পিডবোট কীভাবে যাত্রী পরিবহন করছে? এসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং নৌপুলিশের কর্তাব্যক্তিরা।
এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানে বৃহস্পতিবার পদ্মায় স্পিডবোট দুর্ঘটনা নিয়ে একটি ফলোআপ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় দেশ রূপান্তরে। ‘বৈধ ইজারায় অবৈধ স্পিডবোট চলাচল!’ শিরোনামের প্রতিবেদনে উঠে আসে দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশদ্বারখ্যাত শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে পদ্মাবক্ষে চলাচল করে ৪৫০টিরও বেশি স্পিডবোট। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এ নৌরুটে এসব স্পিডবোট চলাচল করে আসছে। কিন্তু বেশিরভাগেরই কোনো নিবন্ধন নেই। চালকদের কারও নেই নৌযান চালানোর লাইসেন্স। অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক সব চালকই হাল ধরেন স্পিডবোটের। অদ্ভুত বিষয় হলো অবৈধ এসব নৌযান চলাচল করছে বৈধভাবে ইজারা দেওয়া ঘাট দিয়ে। জানা যায়, মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে স্পিডবোট ঘাট প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে জেলা পরিষদ এটা ইজারা দিয়ে আসছিল। এ নিয়ে জেলা পরিষদের সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয় বিআইডব্লিউটিএ’র। ওই বিরোধের জেরে জেলা পরিষদ থেকে হাতবদল হয়ে বর্তমানে বিআইডব্লিউটিএ শিমুলিয়া স্পিডবোট ঘাটের ইজারা দিয়ে আসছে। প্রশ্ন হলো, সারা দেশে নৌ চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ কীভাবে তাদেরই ইজারা দেওয়া একটি ঘাটে বছরের পর বছর ধরে অবৈধ নৌযান চলাচলের সুযোগ দিয়ে যাচ্ছে?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘাটের ইজারাদারের কাজ হচ্ছে স্পিডবোটের সিরিয়াল দেওয়া। যাত্রীদের কাছ থেকে টিকিট কাটা। কোনো স্পিডবোটের নিবন্ধন রয়েছে কি না তা তাদের দেখার বিষয় নয়। চালকদের লাইসেন্স রয়েছে না নেই কিংবা অদক্ষ চালকের বিষয়টি দেখার কাজও তাদের নয়। নৌযান বা স্পিডবোটের নিবন্ধন ও চালকদের লাইসেন্স রয়েছে কি না তা দেখার দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিএ’র। শুধু এ রুটে চলাচলকারী প্রায় সাড়ে চারশো স্পিডবোটের নিবন্ধনের কোনো সুর্নিদিষ্ট তালিকাও বিআইডব্লিউটিএ’র কাছে নেই। অন্যদিকে বিআইডব্লিউটিএ’র শিমুলিয়া ঘাটের এক বন্দর কর্মকর্তা বলেন, স্পিডবোট চলাচলের ক্ষেত্রে তদারকির দায়িত্ব হচ্ছে নৌপুলিশের। স্পিডবোটে যাত্রীদের পরনে লাইফ জ্যাকেট রয়েছে কি না কিংবা অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া হচ্ছে কি না তা নিয়ন্ত্রণ করবে নৌপুলিশ। আবার বৈরী আবহাওয়ায় স্পিডবোট চলাচলের নিয়ন্ত্রণেও নৌপুলিশ কাজ করবে। ইজারাদার, স্পিডবোটের চালক, বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তা, নৌপুলিশ ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং নানা তথ্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, সংশ্লিষ্ট সবার জ্ঞাতসারেই প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার বাণিজ্যের কারণেই শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে এ নৈরাজ্য চলছে।
নৌপথে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে উপযুক্ত নৌযান, দক্ষ চালক এবং অনুকূল আবহাওয়ার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যাত্রীবাহী অথবা মালবাহী প্রতিটি নৌযানের ডিজাইন, ধারণক্ষমতা, কারিগরি দিক, রুট ইত্যাদি বিবেচনা করে বিআইডব্লিউটিএ’র অনুমতিপত্র বা ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়ার বিধান পুরোপুরি কার্যকর হতে দেখা যাচ্ছে না। যাত্রীবাহী লঞ্চ-স্টিমারে পর্যাপ্ত বয়া ও লাইফ জ্যাকেট রাখা এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা বিধানেরও কোনো তদারকি নেই। আর এখন শিমুলিয়া-বাংলাবাজারের ঘটনায় দেখা গেল নৌ-চলাচল নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের ইজারা দেওয়া ঘাট থেকেই প্রতিদিন চলছে স্পিডবোটের মতো অবৈধ নৌযানে যাত্রী পরিবহন।
চোখের সামনে যেভাবে নদী মরছে সেভাবেই গুরুত্ব হারিয়েছে নৌপথ। ১৯৭৫ সালে মোট জাতীয় পরিবহনের ৩৭ শতাংশ হতো নদীপথে। তখন ১৬ শতাংশ যাত্রী নৌপথে যাতায়াত করত। এখন এ হিস্যা কমে যথাক্রমে ১৬ শতাংশ এবং ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে জানা গেছে বিশ্বব্যাংকের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। জ্বালানী সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব এবং তুলনামূলক নিরাপদ হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের অভাব এবং সরকারের কর্মকৌশলে নৌপরিবহন দীর্ঘদিন ধরেই অবহেলিত। একইভাবে অবহেলিত নৌপথে চলাচলকারী মানুষের নিরাপত্তা। এমতাবস্থায় দেশের নৌপথগুলোতে বিদ্যমান কাঠামোগত বিশৃঙ্খলা-নৈরাজ্য বন্ধ করে নৌযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
