পদ্মায় শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌপথ

স্পিডবোটের হর্সপাওয়ার বাড়িয়ে ২৫ মিনিটের পথ ৮-৯ মিনিটে পাড়ি

আপডেট : ০৭ মে ২০২১, ০৩:২৪ এএম

দেশের দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশদ্বারখ্যাত প্রমত্তা পদ্মার শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুট। যেখানে যাত্রীদের প্রলুব্ধ করতে স্পিডবোটের হর্সপাওয়ার বাড়িয়ে ২৫ মিনিটের নৌপথ পাড়ি দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৮ থেকে ৯ মিনিটে। যার ফলে প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা, হচ্ছে প্রাণহানি। অবশ্য অনেক সময় জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীরাই অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে দ্রুতগতির স্পিডবোটে পদ্মা পাড়ি দিতে চায়। আর এ সুযোগে স্পিডবোটের মালিকরা ইঞ্জিনের হর্সপাওয়ার বাড়িয়ে দ্রুতগতিতে যাত্রীদের পদ্মা পার করে দিচ্ছে।

বাংলাবাজার ঘাটের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ নৌরুটে পদ্মাবক্ষে চলাচল করে কমপক্ষে সাড়ে চারশো স্পিডবোট। যার অধিকাংশই অবৈধ হলেও কিছু অসাধু ব্যক্তির সঙ্গে যোগসাজশে বিআইডব্লিউটিএ প্রতি বছরই স্পিডবোট ঘাট ইজারা দিয়ে থাকে। আর সেই সুযোগে প্রতি বছরই দুই ঘাটেই স্পিডবোটের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়তে থাকে। ১৫-২০ বছর আগে যখন এই নৌপথে প্রথম স্পিডবোট চালু হয় তখন একেকটি স্পিডবোটের ইঞ্জিনের হর্সপাওয়ার ছিল মাত্র ৪০। এরপর আসে ৭৫ হর্সপাওয়ারের স্পিডবোট। আর বর্তমানে যেসব স্পিডবোট চলছে তার বেশিরভাগই ১১৫ হর্সপাওয়ারের। অবশ্য কিছুসংখ্যক স্পিডবোটে রয়েছে ২০০ হর্সপাওয়ারের ইঞ্জিন। যেগুলো প্রতি মিনিটে এক কিলোমিটারের চেয়ে বেশি নৌপথ অতিক্রম করতে পারে। শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌপথে পদ্মা নদীর প্রশস্ততা ৬.১৫ কিলোমিটার হওয়ায় এসব স্পিডবোট খুব সহজেই ৮-৯ মিনিটে পদ্মা পাড়ি দিতে পারে। আর ২০০ হর্সপাওয়ার ইঞ্চিনের স্পিডবোটগুলো আকারে বড় হওয়ায় যাত্রীও তুলতে পারে দ্বিগুণ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্পিডবোটচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ২০১২ সাল থেকে স্পিডবোট চালাই। আমি প্রথম যখন স্পিডবোট চালাতাম তখন এর হর্সপাওয়ার ছিল ৪০। তারপর এলো ৭৫ হর্সপাওয়ার। বর্তমানে যেসব স্পিডবোট চলছে তার বেশিরভাগই ১১৫ হর্সপাওয়ারের। খুব কমসংখ্যক স্পিডবোটে রয়েছে ২০০ হর্সপাওয়ার। তবে এ ধরনের স্পিডবোট চালানোর জন্য খুব দক্ষ চালক প্রয়োজন। সঠিকভাবে এসব স্পিডবোট চালাতে হলে তার প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হয়।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক স্পিডবোট চালক বলেন, ‘একটি ২০০ হর্সপাওয়ারের স্পিডবোট প্রতি ১ মিনিটে ১ কিলোমিটারের চেয়ে বেশি পথ অতিক্রম করে। ৮ থেকে ৯ মিনিটে ১৩ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে পারে। এ ধরনের দ্রুতগতিসম্পন্ন স্পিডবোট চালাতে যথেষ্ট প্রশিক্ষণ এবং চালককে শারীরিক ও মানসিকভাবে ফিট থাকতে হবে। তাই মালিকপক্ষের উচিত দক্ষ চালক বাছাই করে তাদের দিয়ে এসব স্পিডবোট চালানো। তা না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। আর এরকম ঘটছেও।’

বাংলাবাজার নৌপুলিশের ওসি আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্পিডবোট চালকরা যাত্রীদের আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য বলে ৮ মিনিটে পদ্মা পার করে দেবে। কিন্তু আসলে সেটা নয়। পদ্মা পার হতে এখনো আগের মতো সময় লাগে। তবে আমার জানামতে বেশকিছু স্পিডবোট এখন ২০০ হর্সপাওয়ারের ইঞ্চিন ব্যবহার করে। স্পিডবোট কোনোটাই বৈধ নয়। কিন্তু এরপরও কীভাবে বিআইডব্লিউটিএ ঘাট ইজারা দেয় সেটা আমার বোধগম্য নয়।’

এ ব্যাপারে শিমুলিয়া বিআইডব্লিউটিএর নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী পরিচালক শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘গত সোমবার স্পিডবোট দুর্ঘটনার দিন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসেছিলেন। তখন তারা জানিয়েছেন যে বেশ কয়েক বছর আগে প্রায় ২৫ ভাগ স্পিডবোট নিবন্ধন করেছিল। তবে আমাদের কাছে সেসবের কোনো নথি বা তথ্য নেই।’

এ প্রসঙ্গে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিটি ঘাট ইজারা দিয়ে থাকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। তবে আমরা চাচ্ছি আগামীতে ঘাটসহ স্পিডবোট চলাচল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে। আমার জানামতে কোনো স্পিডবোটেরই অনুমোদন নেই নৌপথে চলাচলের। তাছাড়া সেদিনের (গত সোমবারের ২৬ প্রাণহানি) দুর্ঘটনায় আমাদের একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। সেই প্রতিবেদন হাতে পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া থেকে গত সোমবার সকাল পৌনে ৭টায় ৩১ জন যাত্রী নিয়ে একটি স্পিডবোট ছেড়ে আসে। পরে মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ী বাংলাবাজার পুরনো ঘাটে থেমে থাকা বালুবোঝাই একটি বাল্কহেডে ধাক্কা দিয়ে ডুবে যায় স্পিডবোটটি। এ সময় সব যাত্রী পানিতে পড়ে যায়। পরে নদী থেকে একে একে ২৫টি লাশ উদ্ধার করা হয়। ছয়জনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে আরও একজনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে রয়েছে তিন শিশু ও দুই নারী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত