চলতি রমজানের পঁচিশতম খতমে তারাবিতে আজ তেলাওয়াত করা হবে আটাশতম পারা। এ পারায় শুরু সুরা মুজাদালা দিয়ে। এরপর রয়েছে- সুরা হাশর, সুরা মুমতাহিনা, সুরা আস সফ, সুরা আল জুমআ, সুরা মুনাফিকুন, সুরা তাগাবুন, সুরা আত তালাক ও সুরা আত তাহরিম।
সুরা মুজাদালার ১১ থেকে ১৩ আয়াতে মজলিস, সভা-সমিতি ও বৈঠকের আদব-কায়দা শেখানো হয়েছে। সেই সঙ্গে এমন কিছু সামাজিক দোষত্রুটি দূর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা মানুষের মধ্যে আগেও ছিল এবং এখনো আছে। কোনো বৈঠকে যদি অনেক লোক থাকে, এমতাবস্থায় পরে আসা লোকদের আগে থেকে বৈঠকে থাকা মানুষরা নিজেরা কিছুটা গুটিয়ে বসে তাদের বসার সুযোগ করে দেওয়ার কষ্টটুকু স্বীকার করতে চায় না। ফলে পরে আসা লোকেরা দাঁড়িয়ে থাকেন, অপ্রস্তুত স্থানে বসেন, কিংবা ফিরে যান। অনেকে আবার উপস্থিত লোকজনকে ডিঙিয়ে ভেতরে চলে আসেন। নবী করিম (সা.)-এর মজলিসে প্রায়ই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো। তাই আল্লাহতায়ালা নির্দেশনা দিয়েছেন, মজলিসে আত্মস্বার্থ এবং সংকীর্ণ মনের পরিচয় দিয়ো না। বরং খোলা মনে পরে আগমনকারীদের জন্য স্থান করে দাও।
মানুষের মাঝে আরও একটি ত্রুটি দেখা যায়। তা হলো- কেউ কারও কাছে গেলে বিশেষ করে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাছে গেলে জেঁকে বসে থাকে এবং এদিকে মোটেই খেয়াল করে না, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় নেওয়া তার কষ্টের কারণ। তিনি যদি বলেন, এখন যান তাহলে সে খারাপ মনে করবে। তাকে ছেড়ে উঠে গেলে অভদ্র আচরণের অভিযোগ করবে। ইশারা-ইঙ্গিতে যদি বুঝাতে চান যে, অন্য কিছু জরুরি কাজের জন্য তার এখন কিছু সময় দরকার- তাহলে শুনেও শুনবে না। নবী করিম (সা.) নিজেও মানুষের এমন আচরণের সম্মুখীন হতেন আর তার সাহচর্য থেকে উপকৃত হওয়ার আকাক্সক্ষায় অনেকে এটা খেয়াল করতেন না যে, তারা অতি মূল্যবান কাজের সময় নষ্ট করছেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহতায়ালা এ কষ্টদায়ক বদঅভ্যাস পরিত্যাগের জন্য নির্দেশ দিলেন।
আজকের পঠিত অংশে রয়েছে ফজিলতময় সুরা হাশরের শেষ তিন। এই তিন আয়াতের ফজিলত সম্পর্কে বিভিন্ন হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হজরত মাকাল বিন ইয়াসার (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সকাল বেলা তিন বার ‘আউজুবিল্লাহিস সামিয়িল আলিমি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ পড়ে সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াত তেলাওয়াত করবেÑ মহান আল্লাহ ওই ব্যক্তির জন্য ৭০ হাজার ফেরেশতা নিযুক্ত করেন; যারা ওই ব্যক্তির জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত মাগফেরাতের দোয়া করতে থাকে। আর এ সময়ের মাঝে যদি লোকটি মারা যায়, তাহলে সে শহীদের মৃত্যু লাভ করবে। আর যে ব্যক্তি এটি সন্ধ্যার সময় পড়বে, তাহলে তার একই মর্যাদা রয়েছে।’ -তিরমিজি: ৩০৯০
হালাল রুটি-রুজির চেষ্টা এবং ইসলামি বিধিবিধান মেনে দুনিয়ার জীবনকে সুন্দর করার শিক্ষা ইসলাম দেয়। এমন চেষ্টা খারাপ কিছু নয়। ইসলাম এ ব্যাপারে শুধু ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই পেশ করেনি, বরং উৎসাহিত করেছে। রিজিক অন্বেষণের তাগিদ দিয়েছে। আজকের তারাবিতে এই বিষয়টিও পাঠ করা হবে।
সুরা জুমআর ১০ নম্বর আয়াতে এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলছেন, ‘অতঃপর নামাজ সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ আল্লামা সুয়ুতি (রহ.) তার বিখ্যাত ‘আল জামি আস সাগির’ গ্রন্থে হজরত আনাস বিন মালেক (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘বৈধ জীবিকা অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ।’
নিজের জীবিকা নিজ হাতে উপার্জনকে অতি উচ্চ মর্যাদা দিয়ে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ভিক্ষা থেকে বিরত থেকে নিজ পরিবারের জন্য হালাল রুজির তালাশ করবে এবং প্রতিবেশীর প্রতি দয়ালু আচরণ করবে, সে পূর্ণ চন্দ্রের মতো মুখচ্ছবি নিয়ে আল্লাহর দিদার লাভ করবে।’ -শোয়াবুল ইমান
অনেকেই রুটি-রুজির জন্য সচেষ্ট হওয়াকে তাকওয়ার পরিপন্থী মনে করেন। তারা মনে করেন এসব কিছু দুনিয়াদারি। এগুলোতে মনোযোগ দেওয়া, চেষ্টা সাধনা করা মুমিনের কাজ নয়। মুমিনের কাজ হলো- সারা দিন ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকবে আল্লাহ তার রিজিকের ব্যবস্থা করবেন। এমন ধারণা ভুল। ইসলামের শিক্ষা হলো- জীবিকার জন্য চেষ্টা চালাতে হবে- এটাই আল্লাহর বিধান। এর ব্যতিক্রম হলে এমনিতেই রিজিক আসবে না। আল্লাহর দেওয়া বিধানমাফিক চেষ্টা না করে শুধু তাওয়াক্কুল করে বসে থাকলে চলবে না।
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের অর্থ এই নয় যে, একজন মুসলিম সব ধরনের প্রচেষ্টা থেকে বিরত থাকবে। তাকে সব ধরনের চেষ্টা করতে হবে এবং একই সঙ্গে উত্তম ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করতে হবে। অর্থাৎ তাওয়াক্কুল করতে হবে চেষ্টা-তদবিরের পর; আগে নয়। শুধু চেষ্টা করেই সব কিছু হয় না। আল্লাহর রহমতের প্রয়োজন হয়। অপরদিকে চেষ্টা-তদবির না করলে তাতেও আল্লাহর রহমত হয় না। এ দু’টির সমন্বয় জরুরি। এক ব্যক্তি তার উট না বেঁধে ছেড়ে রেখেছিল এ ভ্রান্ত ধারণার ওপর যে উটটি পালিয়ে যেতে পারবে না, কেননা আল্লাহ এর ওপর খেয়াল রাখবেন। নবী (সা.) তাকে তিরস্কার করে বলেন, ‘আগে উট বাঁধো এবং তারপর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করো।’
নবী করিম (সা.) পরিবার-পরিজনকে সচ্ছল রাখার প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, ‘তোমার সন্তানদের সচ্ছল অবস্থায় রেখে যাওয়া তাদের অসচ্ছল অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম।’ ইসলাম মনে করে, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং দুনিয়ার জীবনে সচ্ছলতা অর্জনে চেষ্টা করা দোষণীয় নয়; বরং প্রশংসনীয়। তবে তা হতে হবে কোরআন-হাদিসে বর্ণিত পন্থায়, অন্যায় ও অসৎ পন্থায় নয়।
