জীবাশ্ম জ্বালানীতে বিনিয়োগ করবে না এডিবি

আপডেট : ০৮ মে ২০২১, ০৩:৪৩ এএম

বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের কোথাও কয়লা, গ্যাস ও তেল খনিতে ঋণ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও নতুন করে আর কোনো ঋণ দেবে না এডিবি। এমনকি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঞ্চালন লাইন নির্মাণসহ এ ধরনের কোনো অবকাঠামোতেও বিনিয়োগ করবে না আন্তর্জাতিক এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি। গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত এডিবির খসড়া জ্বালানি নীতি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

এর আগে ২০১৬ সালে এশিয়ান ইনফ্রাস্টাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) এবং ২০২০ সালে বিশ্বব্যাংক কয়লা খাতে সব ধরনের বিনিয়োগ বন্ধের ঘোষণা দেয়। এডিবির নতুন সিদ্ধান্তের মধ্যে দিয়ে বিশ্বের প্রায় সব বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান কয়লাভিত্তিক জ্বালানিতে বিনিয়োগ বন্ধ করল। এডিবির মতো বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কয়লাভিত্তিক জ্বালানি ও জীবাশ্ম জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিপাকে পড়বে বাংলাদেশ।

দীর্ঘদিন ধরে এডিবিকে জীবাশ্ম জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ না করার জন্য চাপ দিয়ে আসছিল ‘এনজিও ফোরাম অন এডিবি’। এ প্রতিষ্ঠানটি এডিবির ঋণ পর্যবেক্ষণ করে থাকে।

এ প্রসঙ্গে এনজিও ফোরাম অন এডিবির নির্বাহী পরিচালক রায়ান হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এডিবির নতুন খসড়া জ্বালানি নীতি ঘোষণা করার মধ্যে দিয়ে এশিয়া অঞ্চলে কয়লাতে বিনিয়োগের অবসান হলো। কয়লাতে বিনিয়োগের ফলে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মানুষ ও প্রকৃতির ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘এডিবি এখনো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), গ্যাস ও বড় জলবিদ্যুতে বিনিয়োগ করছে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। আমরা এডিবির কাছে আবেদন জানাই দ্রুত সৌর ও বায়ুবিদ্যুতে তারা বিনিয়োগ করুক।’

এডিবির নতুন সিদ্ধান্তের বিষয়ে এনজিও ফোরাম অন এডিবির সদস্য সংগঠন ক্লিন বাংলাদেশের প্রধান হাসান মেহেদী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘ সংগ্রামের পর এটা দুর্দান্ত বিজয়। প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী ১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা যদি কমাতে হয় তাহলে এডিবিকে গ্যাসসহ আরও অনেক জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিনিয়োগ বন্ধ করতে হবে।’

বাংলাদেশে কী প্রভাব পড়বে?

দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানি গ্লোবাল কোল ম্যানেজমেন্টে (জিসিএম বা সাবেক এশিয়া এনার্জি) বিনিয়োগ করার কথা থাকলেও এখন তা আর করবে না এডিবি। দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) অধীনে ৮০ হাজার কোটি টাকার ছয়টি প্রকল্পের অর্থায়ন এখনো নিশ্চিত হয়নি। এসব প্রকল্পের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঞ্চালন ব্যবস্থাও রয়েছে। এডিবির নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এসব প্রকল্পের অর্থায়নও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ল।

দেশে ইতিমধ্যে ২১টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে একমাত্র পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট উৎপাদনে এসেছে। সেখানে একই ক্ষমতার আরেকটি ইউনিটের নির্মাণকাজ চলছে। এ কেন্দ্রে বিনিয়োগ করেছে চীনের এক্সিম ব্যাংক। অন্যদিকে বাগেরহাটের রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগ করেছে ভারতের এক্সিম ব্যাংক। এ দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়া বাকি ১৯টি কেন্দ্রের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই।

রামপাল ও পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঞ্চালন লাইন নির্মাণে এডিবির অর্থায়ন রয়েছে। চলমান এ দুটি প্রকল্পে অর্থ দেওয়া বন্ধ করবে না এডিবি। তবে নতুন করে দেশের কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঞ্চালন লাইন নির্মাণ ও এ সংক্রান্ত কোনো অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করবে না আন্তর্জাতিক এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি।

দেশে ইতিমধ্যে অনুমোদন পাওয়া ২১টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে মাত্র ৫টি কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ব্যাংকঋণ নিশ্চিত হয়েছে। বাকি ১৬টি কেন্দ্রের এখন পর্যন্ত ব্যাংকঋণ নিশ্চিত হয়নি। ফলে এডিবি, বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবির মতো বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কয়লা জ্বালানি থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে আসায় এসব কেন্দ্রের বিনিয়োগ অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। এসব কেন্দ্র আদৌ আলোর মুখ দেখবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে এ বিষয়টি নাগরিক সংগঠন ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা ইতিবাচকভাবে দেখছেন। ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের এমনিতেই কোনো প্রয়োজন ছিল না। সরকার যথাযথ পর্যালোচনা না করেই এসব কেন্দ্রের অনুমতি দিয়েছিল। এসব কেন্দ্র উৎপাদনে এলে শুধু পরিবেশেরই ক্ষতি হতো না, দেশের অর্থনীতিকে শেষ করে দিত। এডিবির এমন সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশের জন্য ভালো হয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত