করোনা ভাইরাসের কারণে কর্মহীন হয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন নৌযান শ্রমিকরা। শ্রমিকরা জানান, করোনা মহামারীর কারণে ৬ এপ্রিল থেকে যাত্রীবাহী লঞ্চ বন্ধ থাকায় বেশিরভাগ মালিক ভেতন-ভাতা পরিশোধ করেননি। এর আগেরও বেতন-ভাতা বকেয়া রয়েছে। ফলে এবারের ঈদে বেতন-ভাতা পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা।
তাসরিফ লঞ্চের লস্কর পলাশ জানান, লকডাউনের কারণে লঞ্চ বন্ধ থাকায় জমানো টাকাতেই কোনোরকম সংসার চলছে। যারা বাড়িতে চলে গেছেন তাদের অনেকে রিকশা চালিয়ে অথবা দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। আর যারা লঞ্চে রয়ে গেছেন তাদের শুধু একবেলা খোরাকির টাকা দেওয়া হয়।
একই কথা জানালেন অন্য একটি লঞ্চের মাস্টার জাহাঙ্গীর আলম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ৩০ বছর ধরে জাহাজে কাজ করছি। এমন দুরবস্থা আগে কখন হয়নি। আমাদের লঞ্চে ৩৫ জনের মতো কাজ করেন। লঞ্চ বন্ধ থাকায় বেশিরভাগ বাড়িতে। গত মার্চ থেকে বেতন নেই। মালিক পক্ষ বলেছে, লঞ্চ চালু না হলে বেতনের কোনো সম্ভাবনা নেই। আমরা লঞ্চ চালাতে চাই। না হলে সরকারে পক্ষ থেকে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হোক।
লঞ্চ মালিক সমিতির তথ্যমতে, দেশে নিবন্ধিত ৬৮০টির বেশি লঞ্চ রয়েছে। গড়ে প্রতিটি লঞ্চে ৩০ থেকে ৪০ জন কর্মচারী আছেন। সেই হিসাবে লঞ্চের কর্মচারীর সংখ্যা ২০-২২ হাজার। লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় সবাই এখন কর্মহীন।
শ্রমিক নেতারা বলছেন, সরকারের উচিত শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিশ্চিত করে লকডাউন ঘোষণা করা। অনেক লঞ্চ মালিকের বেতন-ভাতা দেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও দিচ্ছেন না। যারা দিতে চাইছেন তাদেরকে বেতন-ভাতা না দিতে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মো. শাহ আলম ভূঁইয়া বলেন, জীবন-জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা না করে ঘোষিত লকডাউনে সবচেয়ে বেশি দুরবস্থার শিকার যাত্রীবাহী লঞ্চ শ্রমিকরা। অনেকের সংসার চালানো বন্ধ হয়ে গেছে। বেশিরভাগ মালিক লঞ্চ মালিক বন্ধের দোহাই দিয়ে শ্রমিকের বেতন-ভাতা পরিশোধ করছে না। অনেক মালিকের আর্থিক অবস্থা ভালো থাকলেও হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। আমরা প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছি। আমরা চাই ঈদের আগে শ্রমিকের ন্যায্য দাবি পরিশোধ করা হোক।
এই শ্রমিক নেতা আরও বলেন, দেশে অন্যসব পরিবহন চালু করে শুধু লঞ্চ বন্ধ রাখার কোনো মানে হয় না। এতে করে বিকল্প উপায়ে যাতায়াত করতে গিয়ে যাত্রীদের দ্বিগুণের বেশি খরচ হচ্ছে এবং স্বাস্থ্যবিধিও মানা হচ্ছে না। আমরা চাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাত্রীবাহী লঞ্চ চালু করা হোক।
লঞ্চ মালিকরা বলছেন, লঞ্চ না চললে বেতন দেওয়া সম্ভব নয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে জেলার অভ্যন্তরীণ রুটে বাস চলার অনুমতি দিয়েছে সরকার। একইভাবে দোকানপাটও খোলা রয়েছে। তাহলে কেন লঞ্চ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা?
সুরভী লঞ্চের নির্বাহী পরিচালক রিয়াজুল কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুই শতাধিকের বেশি মানুষ আমাদের লঞ্চে কাজ করে। লঞ্চ বন্ধ থাকার পরও আমরা অর্ধেক বেতন দিয়েছি। বাকিটা হয়ত তিন-চার দিনের মধ্যে দিয়ে দেব। অন্য খাতের টাকা এনে কর্মকর্তাসহ শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতি এমন চলতে থাকলে হয়ত অর্ধেক বেতনও দিতে পারব না। আমরা সরকারের কাছে বলেছি যদি লঞ্চ বন্ধ রাখতে হয় তবে শ্রমিকদের প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আশা হোক না হলে লঞ্চ চালু করা হোক।
নৌযান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌযান চলাচল সংস্থার সিনিয়র সহ-সভাপতি বদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, জাহাজে এখন যারা রয়েছেন তাদের খোরাকির টাকা দেওয়া ছাড়া বেতন-ভাতা দেওয়ার কোনো সামর্থ্য আমাদের নেই। মালিকদের নিজেদেরই সংসার চলে না। গত বছর লকডাউনে প্রণোদনা দেওয়ার আশ্বাস দিলেও কোনো ধরনের সহযোগিতা পাইনি। এবারও তালিকা নেওয়া হয়েছে। সরকার কোনো সহযোগিতা না করলে আমাদের পক্ষে বেতন-ভাতা দেওয়া সম্ভব নয়।
তবে এ মুহূর্তে যাত্রীবাহী লঞ্চ চালুর কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহনের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক বলেন, সরকার অভ্যন্তরীণ গণপরিবহন চালু করলেও লঞ্চ চালু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আপাতত নেই। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে নৌযান মালিকদের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তাদের দাবির কথা জানিয়েছে। তবে এখনই কোনো কিছু বলা সম্ভব হচ্ছে না। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তাছাড়া শ্রমিকদের জন্য কিছু রেশনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুই-এক দিনের মধ্যে তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, আমরা লঞ্চ মালিকের কাছে শ্রমিকদের তালিকা চেয়েছি। আমরা চেষ্টা করব সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনার ব্যবস্থা করে দেওয়ার। তবে কবে নাগাদ আর্থিক প্রণোদনা পাবে এ বিষয়ে এখন কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া যাচ্ছে না। বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান বলেন, অনেক নৌযান মালিকের পক্ষে সম্ভব এক-দেড় মাসের ভেতন-ভাতা পরিশোধ করা। কিন্তু তারা অনেকেই মহামারীর সুযোগ নিতে চায়। আমরা আশা করব যাদের সামর্থ্য রয়েছে তারা যেন তাদের শ্রমিকদের ভেতন-ভাতা পরিশোধ করে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে লঞ্চ মালিকদের সঙ্গে অলোচনা চলছে। তাদের কাছ থেকে তালিকা চেয়েছি। আমরা চেষ্টা করছি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে যে প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হচ্ছে সেখান থেকে নৌ শ্রমিকদের সহায়তা দেওয়ার। তালিকা অনুযায়ী আমরা তাদের সহায়তা করব।
ঈদের আগে প্রণোদনা শ্রমিকরা পাবেন কিনা এমন প্রশ্নে সচিব বলেন, আমরা সরকারকে এ বিষয়ে অবহিত করেছি। চেষ্টা থাকবে ঈদের আগে দেওয়ার।
