৮ মে ১৭৯৪ গিলোটিনে বধ করা হয় আধুনিক রসায়নের জনক ল্যাভয়সিয়েকে। অক্সিজেন সংকটের দিনগুলোতে মানুষ তাকে স্মরণ করছে।
১৯৭৭ সালে গিলোটিন ব্লেডে সর্বশেষ মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়, প্রমাণিত খুনি হামিদা জানদুবির মাথা সেটি। তারপর আর গিলোটিন চালনা না করার কারণ ফ্রান্সের বিচারব্যবস্থায় শাস্তিহিসেবে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ হয়ে যায়। ২৫ এপ্রিল ১৭৯২ নিকোলাস জ্যাক পেলেটিয়ে নামের একজন দুর্বৃত্তকে প্রথম গিলোটিনে সোপর্দ করা হয়। ১৭৮৯ সালে ফরাসি চিকিৎসক এবং জাতীয় পরিষদ সদস্য জোসেফ-ইনাক গিলোটিন একটি ‘মানবিক বিল’ আনয়ন করেন। তাতে অপরাধীকে ফাঁসি কিংবা অন্য কোনোভাবে কষ্টকর মৃত্যু আরোপের বদলে যন্ত্রের সাহায্যে মুহূর্তের মধ্যে মাথা বিচ্ছিন্ন করার সুযোগ সৃষ্টি করার প্রস্তাব রাখা হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী গিলোটিন যন্ত্রের বৃত্তাকার জানালা দিয়ে মাথাটা বের করে দেবে। ক্রসবিমে সংযুক্ত ওঠানামা করতে পারে এমন একটি ভারী পাতের ধারালো ছুরি ওপর থেকে ঘাড়ে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে তা বিচ্ছিন্ন করা ফেলে। প্রথমে কিছুসংখ্যক মৃতদেহের ওপর পরীক্ষা চালানো হলে নিশ্চিত সাফল্য দেখার পর তা অনুমোদিত হয়। যন্ত্রটির উদ্ভাবক শল্যচিকিৎসক ও শরীর বিজ্ঞানী আন্তোইন লুইসের নামে শুরুতে যন্ত্রটিকে লুইসেট বলা হলেও পরে জোসেফ গিলোটিনের নামে এটি গিলোটিন হয়ে ওঠে। রাজা ষোড়শ লুই এবং রানী ম্যারি আন্তোইনেতকেও গিলোটিনে প্রাণ দিতে হয়।
ফরাসি বিপ্লবের বিপ্লবীদের অবিবেচনা ও নির্মমতার শিকার রসায়নশাস্ত্রের জনক হিসেবে সমাদৃত বিজ্ঞানী ল্যাভয়সিয়ে। অক্সিজেন আবিষ্কার ও শনাক্তকরণের কৃতিত্ব তিন বৈজ্ঞানিকের : প্রিস্টলি, শিলি ও ল্যাভয়সিয়ে।
বিজ্ঞানী ল্যাভয়সিয়ে কেবল অক্সিজেন শনাক্ত করেননি, তিনি তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু করেছেন। সে সময়কার খ্যাতিমান গণিতবিদ জোসেফ লুই লারঞ্জি গিলোটিনে প্রাণ হারানো ল্যাভয়সিয়েকে নিয়ে বলেন, তার মাথাটা কেটে ফেলতে তাদের মাত্র এক মুহূর্ত লেগেছে, কিন্তু ১০০ বছরেও ফ্রান্স এমন একটি মাথা তৈরি করতে পারবে কি না সন্দেহ।
শুধু ল্যাভয়সিয়ে নন ফরাসি বিপ্লবের উগ্রবিপ্লববাদীদের অবিচার ও নির্মমতার শিকার হয়ে গিলোটিনে প্রাণ দিয়েছেন আরও অনেকেই : জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিদ জ্য সিলভিয়া বেইলি (১২ নভেম্বর ১৭৯৩) খনিজ বিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিদ ফিলিপ্পে ফ্রেডেরিক দ্য ডিট্রিক (২৯ ডিসেম্বর ১৭৯৩), জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিদ জ্যা বাপতিস্তে গ্যাসপার দ্য সারো (২০ এপ্রিল ১৭৯৪), উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও আইনজীবী গিওম ডি মালেশার্বেস (২৩ এপ্রিল ১৭৯৪), রসায়নবিদ চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদ লুই গিওম লে ভিলার প্রমুখ। তবে এই তালিকায় সবচেয়ে খ্যাতিমান ল্যাভয়সিয়ে।
অক্সিজেন আবিষ্কারের সঙ্গে তিনটি নাম বেশি উচ্চারিত : কার্ল ভিলেম শিলি ১৭৭৩ সালে অক্সিজেন আবিষ্কার করেন, কিন্তু প্রবন্ধ নিবন্ধ লিখে বা পেটেন্ট গ্রহণ করে তিনি তা প্রতিষ্ঠিত করেননি। জোসেফ প্রিস্টলিও পৃথকভাবে আবিষ্কার করেন এবং ১৭৭৪ সালে তার আবিষ্কার নিয়ে প্রবন্ধ লেখেন, তার আবিষ্কৃত দহন সহায়ক বায়ুর নাম দেন ‘ডেফ্লোগিস্টিক্যাটেড এয়ার’ তিনি একে রাসায়নিক মৌল হিসেবেও চিহ্নিত করতে পারেননি। ফরাসি বিজ্ঞানী এবং রসায়নের জনক হিসেবে খ্যাত আন্তোইন ল্যাভয়সিয়ে ১৭৭৭ সালে এর নাম দেন অক্সিজেন এবং এবং সর্বপ্রথম একে একটি রাসায়নিক মৌল হিসেবে চিহ্নিত করে দহনে এর ভূমিকা ব্যাখ্যা করেন।
খ্রিস্ট জন্মের দুইশ বছর আগে বাইজেন্টিয়ামের যন্ত্রকৌশলী ফিলোই প্রথম দহনের সঙ্গে বাতাসের একটি সম্পর্কের কথা বলেন। তবে তিনি তার গবেষণা সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারেননি। কিন্তু শিল্পী ও বিজ্ঞানী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিই প্রথম জানালেন শ^সন ও দহন দুটো কাজের পরই চারদিকের কিছু বাতাস ব্যবহৃত হয়ে যায়। সপ্তদশ শতকে রবার্ট বয়েল বললেন, বাতাস ছাড়া আগুন ধরানো সম্ভব নয়। তারপর ইংরেজ রসায়নবিদ জন মেয়ো বললেন, আগুন জ¦ালাতে বাতাসে একাংশ-স্পিরিটাস নাইট্রোনরিয়াস দরকার হয়।
এই রচনাটিতে অক্সিজেন আবিষ্কার কাহিনী নয় বরং অক্সিজেনের সঙ্গে সম্পৃক্ত স্মরণীয় নাম ল্যাভয়সিয়ের সংক্ষিপ্ত জীবন এবং ট্র্যাজিক পরিণতির কথা তুলে ধরা হবে।
ল্যাভয়সিয়ের জন্ম প্যারিসের ধনী ও সম্ভ্রান্ত এক পরিবারে ২৬ আগস্ট ১৭৪৩। প্যারিস পার্লামেন্টের একজন প্রভাবশালী অ্যাটর্নির পুত্র আন্তোইন লরেন্ত ল্যাভয়সিয়ে ৫ বছর বয়সে মা হারিয়ে মায়ের বিপুল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন। বয়স ১৮-তে না পড়তেই তিনি রসায়ন, উদ্ভিদবিদ্যা, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞানের খ্যাতনামা ছাত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৭৬৩ সালে আইনে ডিগ্রি নেন, কিন্তু কখনো ওকালতি করেননি। তিনি বিজ্ঞানচর্চা অব্যাহত রাখেন। ২১ বছর বয়সে ইউরোপের একটি খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান ফরাসি অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সে সায়েন্টিফিক পেপার উপস্থাপন করেন। ১৭৬৮-তে ২৫ বছর বয়সে অ্যাকাডেমিতে যোগ দেন। ১৭৬৯ সালে ফ্রান্সের প্রথম ভূ-তাত্ত্বিক মানচিত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখেন।
ল্যাভয়সিয়ে নিজের সম্পদ জনকল্যাণে দান করে কৃষি, শিল্প ও বিজ্ঞানের সঙ্গে মানুষের ভাগ্যকে জড়িত করতে চেষ্টা করেন। ফরাসি অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স ১৭৬৫ সালে ল্যাভয়সিয়ের কাছ থেকে ‘অদ্ভুত প্রস্তাব’ পেল তিনি শহরের রাস্তার সান্ধ্য বাতির উন্নয়ন করতে চান। ১৭৬৮ সালে তিনি শহরের পয়ঃনিষ্কাশন পদ্ধতির আধুনিকায়নে হাত দিলেন। বাতাসে গান পাউডারের প্রভাবে যে স্বাস্থ্যঝুঁকি তিনি সে বিষয়ে গবেষণা শুরু করলেন। একটি বৃহৎ অগ্নিদগ্ধ হাসপাতাল বিশুদ্ধ বাতাস ও পর্যাপ্ত আলোর প্রবাহ নিশ্চিত করতে রেট্রোফিটিং করলেন।
প্যারিসের কারাগার সংস্কার বিশেষ করে কারাবন্দিদের জীবনমান উন্নয়নে তিনি দুবছর কাজ করলেন এবং ব্যাপক সংস্কার করলেন। তার সব কাজে বিজ্ঞান এবং মানবকল্যাণের একটি স্পষ্ট সেতু নির্মিত থাকত। তিনি শৈশব থেকে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার ওপর জোর দেন। তিনি বিজ্ঞান শিক্ষার দুটি লাইসিয়াম-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করেন।
২৬ বছর বয়সে ফরাসি অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স তাকে সদস্য করে নেয় কনিষ্ঠতম সদস্য। ব্যবসায়িক দিক থেকে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ল্যাভয়সিয়ে জেনারেল ফার্ম নামক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কিনে নিলেন। এ প্রতিষ্ঠানের কাজ ট্যাক্স ফার্মিং অর্থাৎ সরকারের হয়ে কর আদায় করে দেবে এবং নির্দিষ্ট কমিশন কেটে রাখবে। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের শেয়ার মালিক হিসেবে প্রভূত বিত্তশালী হলেন। তিনি প্যারিস শহরকে একই দেয়ালের ভেতর নিয়ে আসার কাজ শুরু করলেন যাতে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে কোনো ব্যবসায়ী শহর ছেড়ে বেরোতে না পারে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান আরও সুসংহত হওয়ার পর তিনি জেনারেল ফার্মের জ্যেষ্ঠ সদস্যের ১৩ বছর বয়সী কন্যা ম্যারি অ্যানকে বিয়ে করলেন। ল্যাভয়সিয়ের বিজ্ঞান সাধনায় ম্যারি অ্যান এলেন আশীর্বাদ হয়ে, ইংরেজি ও ফরাসি দুই ভাষায় দক্ষ এই নারী বিভিন্ন ইংরেজি দলিল, প্রিস্টলির রচনা তার পড়ার সুবিধার জন্য ফরাসিতে অনুবাদ করে দিতেন।
জেনারেল ফার্ম তখন তামাক উৎপাদন, আমদানি ও বিক্রয়ের একচেটিয়া বাজার ভোগ করত। কিন্তু কালোবাজারে ছাইমিশ্রিত তামাক চলে আসায় তাকে ভেজাল ধরার পদ্ধতি আবিষ্কার করতে হয়। এতে তামাকের খুচরা বিক্রেতাদের অনেকেই তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়। তিনি রয়্যাল এগ্রিকালচারাল কমিশনে সেক্রেটারি হিসেবে নিজের টাকায় অনুর্বর অঞ্চলে কৃষিজমি পরীক্ষা করে সরকারকে জানান, কৃষি সংস্কারের চেয়ে বেশি দরকার কৃষকের কর সংস্কার। কৃষি সংস্কারের পর কৃষক কোনোভাবে টিকে থাকতে পারবে, কিন্তু উচ্চহার কর তাদের মাথা তুলে দাঁড়াতে দেবে না।
তিনি দীর্ঘদিন গানপাউডার কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। এ সময় একটি ল্যাবরেটরি ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে আবার গবেষণায় মন দেন। ১৭৭২ থেকে দাহ্য পদার্থ ও দহন প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। জোসেফ প্রিস্টলির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয় এবং তার গবেষণা সম্পর্কে অবহিত হন। ১৭৭৭ তিনি অক্সিজেন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট মতামত দেন। তিনি ক্যালসিনেশন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ১৭৭৮ সালে জোসেফ প্রিস্টলিকে সঙ্গে নিয়ে আবিষ্কার করেন মার্কারি অক্সাইড। ১৭৭৯ সালে তিনি বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ নির্ধারণ করেন। ল্যাপলেসকে নিয়ে তিনি শ্বসনে অক্সিজেনের ভূমিকা শনাক্ত করেন। তার পরীক্ষায় ‘বস্তুর নিত্যতার তত্ত্ব’ প্রতিষ্ঠিত হয়। পানি যেকোনো মৌল নয়, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের যৌগ ল্যাপলেসের সঙ্গে তা প্রতিষ্ঠা করেন। পানিতে অক্সিজেনের আনুমানিক পরিমাণও নির্ধারণ করেন। তিনি ৫৫ মৌলের প্রকৃতি নির্ধারণ করেন। ১৭৮৯ সালে তার প্রকাশিত এলিমেন্টারি ট্রিটিজ অন কেমিস্ট্রি রসায়নের একটি আকর গ্রন্থ।
ফরাসি বিপ্লব ছিল মূলত অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে। বিপ্লবীরা জেনারেল ফার্মের ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। তারা তাকে গানপাউডার কমিশন থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। ২৪ নভেম্বর ১৭৯৩ ট্যাক্স ফার্মারদের গ্রেপ্তার করার আদেশ হয়। ল্যাভেয়সিয়ে ও অন্যদের বিরুদ্ধে প্রতারণাসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়। ল্যাভয়সিয়ের মন্তব্যের কারণে ফরাসি অ্যাকাডেমিতে ঢোকার সুযোগ পাচ্ছিলেন না এমন একজন ছদ্মবিজ্ঞানী জ্য পল মারা বিপ্লবীদের দলভুক্ত হয়ে তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চান। ৮ মে ১৭৯৪ তাকে গিলোটিনে বধ করা হয়। তবে জ্য পল মারা ল্যাভয়সিয়ের মৃত্যু দেখে যেতে পারেননি, তার আগেই শার্লট কোর্ডে নামের এক সুন্দরী তাকে ছুরির আঘাতে হত্যা করে।
কারাগার থেকে ল্যাভয়সিয়ে তার কাজিনকে লিখেছিলেন : এটি আমাকে বার্ধক্যের যাতনা থেকে মুক্তি দিল।
এক জীবনে এত কাজ করার পরও যখন তাকে গিলোটিনে নেওয়া হলো তার বয়স মাত্র ৫০ বছর। মৃত্যুর দেড় বছর পর ফরাসি সরকার ঘোষণা করল, ল্যাভয়সিয়ে সম্পূর্ণই নির্দোষ ছিলেন। ফরাসি বিপ্লবের যত বড় সাফল্যই থাকুক ল্যাভয়সিয়েকে গিলোটিনে হত্যা করা বিপ্লবের একটি কলঙ্কিত অধ্যায়।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক
