বিদায় বেলায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উপাচার্য ড. এম আব্দুস সোবহানের দেওয়া বিতর্কিত গণনিয়োগের সব কার্যক্রম স্থগিত করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান প্রশাসন। গতকাল শনিবার এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে রাবি রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আব্দুস সালাম নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিতের এই নির্দেশ দেন।
এদিকে গণনিয়োগের তদন্ত করতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে এসেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা। গতকাল সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পৌঁছান তদন্ত কমিটির সদস্যরা। এই তদন্ত কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন কমিটির আহ্বায়ক ও ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর। তার সঙ্গে আছেন কমিটির সদস্য ও ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. আবু তাহের, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব ড. জাকির হোসেন আখন্দ ও ইউজিসির পরিচালক মোহাম্মদ জামিনুর রহমান।
বিতর্কিত গণনিয়োগের সব কার্যক্রম স্থগিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়োগ সংক্রান্ত কার্যক্রম বন্ধ রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন রাবি রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আব্দুস সালাম। এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সবার অবগতির জন্য আদিষ্ট হয়ে জানানো যাচ্ছে যে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৬ মে তারিখে পত্রের মাধ্যমে জানানো হয়েছে যে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ৫ ও ৬ মে ইস্যুকৃত সব অ্যাডহকভিত্তিক নিয়োগ অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্র্তৃক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিধায় তদন্ত কমিটির রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত উক্ত নিয়োগপত্রে যোগদান এবং তৎসংশ্লিষ্ট সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত রাখতে অনুরোধ করা হলো।
গণনিয়োগ স্থগিত সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল বিকেলে রাবি রেজিস্ট্রার আব্দুস সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ঘটনার তদন্ত চলছে। এটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সব কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।’
মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির কাজ শুরু : সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গণনিয়োগের তদন্ত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা গতকাল বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসে পৌঁছেন। প্রথমেই তারা উপ-উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য) অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহার দপ্তরে যান। পৌনে ১২টার দিকে তদন্ত কমিটির সদস্যরা উপাচার্যের কার্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। দুপুরের পর তদন্ত কমিটির সঙ্গে দেখা করতে ক্যাম্পাসে আসেন সদ্যসাবেক উপাচার্য এম আব্দুস সোবহান। বিদায় বেলার নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। এছাড়া যেসব বিভাগ বা দপ্তরে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সেসব দপ্তরের প্রধানদের সঙ্গেও কথা বলেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। তারা তদন্ত কমিটিকে লিখিতভাবে তাদের বক্তব্য প্রদান করেন।
রাবির সংগীত বিভাগের সভাপতি ড. দিনবন্ধু পাল তদন্ত কমিটির সঙ্গে কথা বলে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকদের বলেন, সংগীত বিভাগে অ্যাডহকে একজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সে বিষয়ে তার সংশ্লিষ্টতা জানতে চায় তদন্ত কমিটি। এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন এবং তিনি গণমাধ্যম থেকেই এসব জেনেছেন বলে জানান। বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে প্ল্যানিং কমিটির কোনো সভাও হয়নি। তবে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া অবৈধ ছিল কি না সে বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাননি তিনি।
আর রাবির রেজিস্ট্রার আব্দুস সালাম তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছেন, এই ‘অবৈধ নিয়োগের’ সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না।
সদ্যসাবেক উপাচার্য এম আব্দুস সোবহান তদন্ত কমিটির সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি কমিটিকে জানিয়েছি এই নিয়োগগুলো হওয়ার দরকার ছিল। দীর্ঘদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ হয়নি। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে ২০১৩ সালের পর আট বছরে কোনো নিয়োগ হয়নি। আমরা এই নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছিলাম। তবে এর মাঝে করোনা চলে আসায় আমরা বন্ধ করে দিই। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য এই নিয়োগ না, আরও নিয়োগ দেওয়া দরকার। কিন্তু কিছুসংখ্যক শিক্ষক শুরু থেকেই বিরোধিতা করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাদের এটি প্রাপ্য বলে মনে করি। আমি ছাত্রলীগকে চাকরি দিয়েছি। আমি কমিটিকে বলেছি, ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী পরিবারের সন্তান তাদের ক্রমাগত দাবি, ক্রমাগত চাপ থেকে আমি মানবিকভাবে বোধ করেছি যে তাদের চাকরিটা পাওয়া উচিত।’ নিয়োগপ্রাপ্তরা সবাই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী কিংবা আওয়ামী পরিবারের সন্তান বলেও দাবি করেন এম আব্দুস সোবহান। তার এই বক্তব্য দেওয়ার সময় নিয়োগপ্রাপ্ত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। পরে আব্দুস সোবহান প্রশাসনিক ভবন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সেøাগান দিয়ে তাকে এগিয়ে দেন নিয়োগপ্রাপ্তরা।
মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘তদন্ত কমিটির সদস্য হিসেবে আমরা এখানে এসেছি। আমরা সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলেছি। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছি। কাগজপত্র দেখেছি। আমরা বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করব, এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেব। কারও প্রতি কোনো বিদ্বেষমূলক আচরণ নয়, আমরা প্রকৃত তথ্য তুলে ধরব।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয় আরোপিত নিয়োগের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে গত বৃহস্পতিবার নিজের শেষ কার্যদিবসে উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সোবহান গণনিয়োগ দেন। ওইদিনই শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই নিয়োগকে অবৈধ উল্লেখ করে তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে ওইদিন মোট কতজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল তা নিয়ে ধূম্রজাল চলছিল। মোট ১৪১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে বলা হলেও সদ্যবিদায়ী উপাচার্য আব্দুস সোবহান গতকাল সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন যে মোট ১৩৭ জনকে ওইদিন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
যোগদান নিয়ে টানাপড়েনে নিয়োগপ্রাপ্তরা : নতুন চাকরি পেয়ে নিয়োগপ্রাপ্তদের খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু তা না হয়ে হয়েছেন চিন্তিত। নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকেই বর্তমানে অন্য কোনো চাকরিতে জড়িত। তারা পড়েছেন দোটানায়। কারণ তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে শেষ পর্যন্ত তাদের এই চাকরি স্থায়ী হবে নাকি বাতিল হয়ে যাবে। এরই মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণা করে তদন্ত কমিটি গঠন করায় সংশয় বেড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজশাহীতে কর্মরত এক সংবাদিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক দিন ধরে প্রত্যাশা ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি চাকরি হবে। সে জন্য লেগেও ছিলাম। চাকরিও হলো। তবে চাকরির নিরাপত্তা কে দেবে সেই চিন্তায় রয়েছি।’
সেকশান অফিসার পদে নিয়োগ পাওয়া এনায়েত করিম বলেন, ‘আমাদের নিয়োগ নিয়ম মেনেই দেওয়া হয়েছে। এরজন্য যে পরিমাণ যোগ্যতা থাকা দরকার সেই ভিত্তিতেই দেওয়া হয়েছে। এজন্য আমি মনে করি এটি বাতিল হওয়ার নয়।’
কোনো শঙ্কা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শঙ্কা থাকেই। যদি ষড়যন্ত্রকারীরা বেশি শক্তিশালী হয় তাহলে অন্যায় সিদ্ধান্ত আসতেই পারে। অন্যায় সিদ্ধান্ত এলে শঙ্কা থাকে। তবে আমি শঙ্কা মনে করছি না। আমাদের যোগ্যতার বলেই এটি পেয়েছি। এই নিয়োগ বাতিল করা সহজ হবে না।’
