টাকা সব সময় রঙিন। তবে যে টাকার আয় এবং আয়ের উৎস ঘোষণা না দিয়ে রাষ্ট্রের প্রাপ্য কর ফাঁকি দেওয়া হয় বা যায়, যে টাকা অবৈধভাবে অর্জিত, সে টাকাই কালো টাকা। মূলত এবং মুখ্যত এই কালো টাকাই যেকোনো অর্থনীতিতে আয়-বৈষম্য, প্রতারণা বঞ্চনার, অস্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যত্যয়ের প্রমাণক এবং অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও ন্যায়নীতিহীনতার সূচক। অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্তির পরিবর্তে বিচ্যুতির মাধ্যমে সমূহ ক্ষতি সাধনের প্রভাবক ভূমিকা পালন করে এ কালো টাকা। এ প্রেক্ষাপটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি নানান আঙ্গিকে বিচার-বিশ্লেষণের অবকাশ আছে।
কালো টাকা সাদা করার পদ্ধতি প্রক্রিয়া নিয়ে নানান মতভেদ যাই-ই থাকুক না কেন, এর যথা বিধিব্যবস্থা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সামাজিক অর্থনীতি তথা রাষ্ট্রের এখতিয়ার। সরকার পরিচালিত রাজনৈতিক অর্থনীতির নয়; কেননা কালো টাকা তো সরকারের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার সৃষ্টি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায়ন্যায্যতা নীতিনির্ভরতায় ব্যর্থতার প্রতিফল। সাম্প্রতিক নজির থেকে দেখা যায়, তুলনামূলক সুশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাওয়ার পর হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, ইরান, নিকারাগুয়া, বলিভিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে উঠতে পেরেছে। এসব দেশ প্রথম পর্বে কালো টাকাকে প্রযত্ন দিতে সাদা করাকে গুরুত্ব দিত, পরবর্তীকালে শক্ত হাতে কালো টাকা সৃষ্টির উৎস বন্ধ করার রাষ্ট্রীয় প্রতিবিধান জোরদার করার ফলে সেসব দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নে চমকপ্রদ গতিসঞ্চার হয়েছে। আরও খোলাসা করে বলা যায়, যেমন সুহার্তোর ১৯৬৫-৯৮ সালের ৩৩ বছরের শাসনকে ইন্দোনেশিয়ার উন্নয়নতত্ত্বে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ আখ্যা দেওয়া হতো। কিন্তু গত দুই দশকে সর্বগ্রাসী দুর্নীতি কমিয়ে সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হওয়ায় সেখানে এখন অর্থবহ উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে বা হচ্ছে।
ভারতীয় প্রজাতন্ত্র ১৯৯৭ সালে ‘ভলান্টারি ডিসক্লোজার অব ইনকাম স্কিম’ (ভিডিআইএস) এবং ২০১৫ সালে ‘আনডিসক্লোজড ফরেন ইনকাম অ্যান্ড এসেটস (ইউএফআইএ) অ্যান্ড ইমপোজিশন অব ট্যাক্স’ অ্যাক্ট জারি করে। ভিডিআইএস প্রবর্তনের পর ভারতের সিঅ্যান্ডএজির পর্যবেক্ষণ ছিল : The Comptroller and Auditor General of India condemned the scheme in his report as abusive and a fraud on the genuine taxpayers of the country. Comptroller and Auditor General of India’s report on just hwo the VDIS scheme was serially abused, and the reason why the scheme was a runaway success was not because it was brilliantly designed, it was a success because it gave tax evaders and thieves (what else would you call ‘cobbler scam’ and ‘hawala’ accused who participated in it?) the best deal they’d ever got. .
ভারতের সিঅ্যান্ডএজির পর্যবেক্ষণ অনুসারে বলা যায় সামান্য কিছু অর্থ দুর্নীতিবাজ ১০ শতাংশ কর দিয়ে বৈধ করে নিলে ওই বৈধকরণের নথিপত্রগুলো তাদের হাজার হাজার কোটি কালো টাকা নিরাপদে রেখে দেওয়ার ভালো দালিলিক সুরক্ষা দিতে পারে। ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে কালো টাকা আড়াল করার ভালো ব্যবস্থার সুবাদে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জনের মানেই হলো একটা সুনির্দিষ্ট সমঝোতা-নেটওয়ার্কের সহায়তায় দুর্নীতিবাজরা নিজেদের সুরক্ষা-ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সমর্থ হচ্ছে। এটি দৃশ্যত দুর্নীতিবাজদের জন্য সম্ভাব্য দুর্নীতি দমনের জাল থেকে পলায়নের পথ খুলে দেওয়ার শামিল। এ ব্যবস্থা রাখার মাধ্যমে কালো টাকার মালিকদের সিগন্যাল দেওয়া হচ্ছে যে এ সুবিধা নিলে তাদের দুর্নীতিকে দমন করা হবে না।
কালো টাকাকে কর প্রদানের সময় ‘অপ্রদর্শিত অর্থ’ সংজ্ঞায়িত করে গুরুতর অপরাধটিকে হালকা করার অবস্থান নেওয়াকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে সমালোচনা হচ্ছে। সংবিধানের ২০(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসেবে কোনো ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না’। সংবিধানের এ বিধান মতে, ‘অনুপার্জিত আয়’ যদি কালো টাকা হয় তাহলে কালো টাকার সংজ্ঞা হিসেবে ‘অপ্রদর্শিত অর্থ’ এবং এই সংজ্ঞা দুর্নীতির সঙ্গে কালো টাকার যে ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে, সেটাকে অনেকটাই গৌণ বা লঘু করে দিচ্ছে কি না, তা দেখা এবং পরীক্ষা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তবে এটা অনস্বীকার্য যে অনেক সময় বৈধভাবে অর্জিত অর্থের ওপর যেমন জমিজমা, অ্যাপার্টমেন্ট, প্লট, দোকান ইত্যাদি রিয়েল এস্টেট ক্রয়-বিক্রয়ে প্রকৃত দাম না দেখিয়ে কম দাম দেখালে রেজিস্ট্রেশন খরচ, স্ট্যাম্প খরচ, সম্পদ কর ও ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া যায়। এসব ক্ষেত্রে কালো টাকাকে ‘অপ্রদর্শিত অর্থ’ বলাই সংগত এবং তা প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে, তবে কোনো অবস্থায়ই বিদ্যমান কর হার হ্রাস করে নয়, উপরন্তু জরিমানা দিয়ে তো বটেই। প্রসঙ্গত যে, ২০০৭-০৮ অর্থবর্ষে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০০৮) প্রযোজ্য করসহ বছরপ্রতি ১০ শতাংশ হারে (সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ) জরিমানা দিয়ে এ জাতীয় অপ্রদর্শিত আয় ‘প্রদর্শন’ বা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সময় শেষ হওয়ার পর যাদের কাছে অপ্রদর্শিত আয়ের টাকা পাওয়া যেত তাদের বিরুদ্ধে আয়কর আইনেই জেল-জরিমানার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল।
আশির দশকের তুলনায় নব্বই দশক থেকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বাড়তে বাড়তে তখনকার সাড়ে ৪-৫ শতাংশ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছালেও এ প্রবৃদ্ধির সুফল প্রধানত কয়েক হাজার ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছেই পুঞ্জীভূত হয়ে চলেছে। সেজন্যই মার্কিন গবেষণা সংস্থা ‘ওয়েলথ এক্স’-এর গবেষণা প্রতিবেদনে ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৩০ মিলিয়ন ডলার বা ২৫০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক ব্যক্তিদের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার নির্ণীত হয়েছে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ, যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। করোনাভাইরাস মহামারী আঘাত হানার আগের ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা (৭৫ বিলিয়ন ডলার) বিদেশে পাচার হয়েছে বলে মার্কিন গবেষণা সংস্থা ‘গোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি’র গবেষণায় উদ্ঘাটিত হয়েছে। বেশি দিন আগের কথা নয়, হলমার্ক, বিসমিল্লা, এমএলএম কেলেঙ্কারি, ব্যাংক ও লিজিং কোম্পানির সাগর চুরির পর ক্যাসিনো-কাণ্ড, প্রখ্যাত প্রতারক, স্বনামধন্য গাড়িচালক ও গোল্ডেন ব্যক্তিনিচয়ের যে ছিটেফোঁটা কেচ্ছা-কাহিনী সামনে আসে সেটা থেকেও তো অনুমান করা চলে কী ধরনের ক্ষরণের শিকার হতে চলেছে এই দেশের অর্থনীতি। স্বেচ্ছা সহনশীল সলিলা (রেজিলিয়েন্ট) শক্তির জোরে, আমজনতার ইমিউন পাওয়ার এখনো বলশালী বলেই অর্থনীতি স্ট্রোক করছে না। এটাকেই আত্মতুষ্টির হেতু ধরে নিয়ে অর্থনীতির মৌল সহায়ক নৈতিক শক্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা থেকে বিরত থাকাটাই হবে একে ভালো থাকতে দেওয়ার অন্যতম উপায়। প্রতিকার প্রতিবিধান ছাড়া কালো টাকা অর্থনীতির জন্য অর্থনীতির ভালো ফল বয়ে আনতে পারে না।
সৎও নিয়মিত করদাতা ১৫-২৫ শতাংশ কর দেবেন আর কালো টাকার মালিক ১০ শতাংশ কর দিয়ে টাকা সাদা করতে পারবে, এ নীতির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত যে বছরের পর বছর ১০ শতাংশের নিচে রয়ে যাচ্ছে, তার অনেকগুলো কারণের মধ্যে এহেন অনৈতিক নীতির পরিপোষণও একটি। কয়েক বছর আগে কালো টাকায় কেনা স্থাবর সম্পত্তি এখন নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হলে বিগত বছরগুলোতে এ সম্পত্তি ব্যবহারজাত আয়ের ওপর কর আহরণের বিষয়েও ছলচাতুরীর প্রশ্রয় দেওয়া হবে। স্থাবর সম্পত্তি ও গৃহায়ন খাতে মূল্যস্ফীতির সুযোগ বেড়েছে। এই নজিরের ফলে এ ধরনের খাতে কর প্রদানে বিলম্ব বা বিরত থাকার প্রবণতা বাড়বে। রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘দুর্নীতিজাত অনুপার্জিত আয়’-এর উৎস, উপায় ও উপলক্ষ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করা। অবৈধভাবে অর্জিত বা আয়ের জ্ঞাত সূত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন যেকোনো অর্থ-বিত্তকেও কালো টাকা অভিহিত করার যে আইনি অবস্থান রয়েছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে সেটাই সাংবিধানিকভাবে বেশি যৌক্তিক। জরিমানা ছাড়া, অত্যন্ত হ্রাসকৃতহারে কর প্রদানের সুযোগ এবং ‘অর্থের উৎস নিয়ে আয়কর কর্তৃপক্ষসহ অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবেন না’ জাতীয় বিধান বলবৎ থাকলে দেশ সমাজ ও অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিত্জের কনসেপ্ট ‘নৈতিক বিপদ’-এর উপস্থিতি হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাবে।
কোনো উদীয়মান অর্থনীতিতে উন্নয়ন অর্জনে সফল হওয়ার পরও যদি আয় ও সম্পদ বৈষম্য না কমে, বরং বাড়ে তাহলে বুঝতে হবে সেই অর্থনীতিতে এমন ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে যার প্রতিষেধক ভ্যাকসিনের আবিষ্কার ও প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। দুর্নীতিজাত কালো টাকা লালন থেকে সরে না এলে আয় ও সম্পদ বণ্টনের ক্রমবর্ধমান বৈষম্য থেকে বাংলাদেশের মুক্তি মিলবে না। কালো টাকা সাদা করার মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে যৌক্তিকতা দেওয়ার চেষ্টা না করাই সমীচীন। নানান আঙ্গিক ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরীক্ষা পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, পুষ্টি সাধনের নিমিত্তে কালো টাকার অর্থনীতিতে ফিরে আসার পরিবর্তে অর্থনীতিই বরং কালো টাকামুখী হওয়ার আশঙ্কা প্রবল হতে পারে। ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে’ এই চিন্তা চেতনাকে আড়াল করতে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র প্রবণতায় কালো টাকা সৃষ্টির প্রেরণা ও প্রযতœ প্রদানের নীতি সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য।
