২০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার লক্ষ্যে এগোচ্ছিল হেফাজত

আপডেট : ১০ মে ২০২১, ০৭:২৯ এএম

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে লক্ষ্য রেখে ছক আঁটছিল ‘অরাজনৈতিক দল’ হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনটি অন্তত ২০০ আসনে নির্বাচন করার টার্গেট করেছিল। আর এ লক্ষ্যে হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতারা কয়েক দফা বৈঠকও করেছেন। কোন কোন এলাকায় তারা প্রার্থী দেবেন তাও অনেকটা চূড়ান্ত করে এনেছিলেন। ইতিমধ্যে ওই তালিকাটিও উদঘাটন করেছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। ওই তালিকা ধরে আরও অনুসন্ধানও চালানো হচ্ছে। নির্বাচনে যাতে হেফাজতের প্রার্থীরা জয়ী হতে পারেন সেজন্য একটি জোট গঠন করার প্রক্রিয়াও চলছিল। জামায়াত ইসলামীর একাধিক নেতাও হেফাজতের ব্যানারে থেকে নির্বাচন করার পরিকল্পনা নিয়েছিল। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া হেফাজতের শীর্ষ নেতা মামুনুলসহ অন্তত ২৫ নেতা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে এ ধরনের তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা। হেফাজতের নির্বাচন করাসহ তাদের কর্মকা- নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের একটি প্রতিবেদনেও একই তথ্য উঠে এসেছে বলে একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে। বিষয়গুলো সরকারের উচ্চপর্যায়কে অবহিত করা হয়েছে।

২০১৩ সাল থেকে হেফাজত ইসলাম বেপরোয়া আচরণ শুরু করে। ওই বছরের ৫ মে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বর দখলের নামে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা চালায়। গত বছর নভেম্বরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করে আবার মাঠে নামে তারা। চলতি বছর ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ৫০ বছর ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ঢাকা সফরের বিরোধিতা করে আন্দোলনের নামে তা-ব চালায় সংগঠনটি। এ সময়ে ১৩ জন মারা যাওয়ার পাশাপাশি অসংখ্য মানুষ আহত হন। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করাসহ ব্যাপক ক্ষতি করে তারা। ঘটনার পর পুলিশ-র‌্যাবসহ সরকারের প্রতিটি গোয়েন্দা সংস্থা তদন্তে নেমে পড়ে। তারপর থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে হেফাজতের অন্তত ২৫ শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ও র‌্যাব। তাদের দফায় দফায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। তাছাড়া পুলিশ সদর দপ্তর আলাদাভাবে তদন্ত করে।

পুলিশ সদর দপ্তরে শীর্ষপর্যায়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হেফাজত অরাজনৈতিক সংগঠন হলেও তারা গোপনে গোপনে রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হচ্ছে। আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দল গোছানোর চেষ্টা করছিল। নির্বাচনে অন্তত ২০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার টার্গেট করেছিল। এজন্য তারা প্রার্থীর নামও প্রায় চূড়ান্ত করে এনেছে। আর এজন্য তারা জোট গঠন করার চেষ্টা চালায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের তদন্তে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তাছাড়া হেফাজতের যেসব নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারাও একই ধরনের তথ্য দিচ্ছেন। জামায়াত ইসলামীর অনেকেই হেফাজতের ব্যানারে থেকে নির্বাচন করার পাঁয়তারা করছেন। নির্বাচনে যাতে ভালো রেজাল্ট করতে পারে সেজন্য জেলা, উপজেলার পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি করতে চাচ্ছিলেন। আর এসব ছক এঁকেছিলেন মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী ও মাওলানা মামুনুল হক। বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা সম্প্রতি হেফাজতকে উদ্দেশ্য করে বলেন আগামী নির্বাচনে প্রয়োজনে আমরা শয়তানের সঙ্গে জোট করব। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মতো তৃণমূল পর্যায়েও তারা সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। কোনো কোনো নেতার রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ছিল। আবার অন্য রাজনৈতিক দলও হেফাজতকে ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।’ ইতিমধ্যে বিষয়টি সরকারের হাইকমান্ডকে অবহিত করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

পুলিশ সদর দপ্তরের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হেফাজতের সাবেক আমির আল্লামা আহমদ শফি অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে হেফাজতের কয়েক নেতার সঙ্গে গোপন যোগাযোগ শুরু হয়। যেকোনো উপায়ে জুনায়েদ বাবুনগরীকে সংগঠনের প্রধান হিসেবে নিতে তারা আলাপ-আলোচনা চালান। অথচ হেফাজতের গঠনতন্ত্রে বলা আছে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজত ইসলাম। মামুনুলসহ কেউ কেউ অরাজনৈতিক এই সংগঠনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন। আগামী সংসদ নির্বাচনে যারা অংশ নিতে পাঁয়তারা করছিলেন তাদের নাম আছে প্রতিবেদন। তার মধ্যে মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী, মুহাম্মদ মাহফুজুল হক, মাহমুদুল হাসান, মাওলানা ইউনুছ আহমাদ, মাওলানা মাহমুদুল হাসান সিরাজী, মাওলানা জাকারিয়া নোমান ফওজী, মাওলানা আবদুল আলিম সাইফি, মাওলানা আবদুল হক, মুফতি হোসাইন কাসেমী, সাজিদুর রহমান, মুফতি মোবারক উল্লাহ, মাওলানা মো. বোরহান উদ্দিন কাশেমী, আশেক এলাহী, মাওলানা হাফেজ ইদ্রিস, মাওলানা বোরহান উদ্দিন, হাফেজ জোবায়ের আহাম্মদ আনসারী, মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, মাওলানা মেরাজুল হক কাশেমী, মো. আবু তাহের, মাওলানা মো. জিয়াউদ্দিন জিয়া, জুনায়েদ আল হাবিব, মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমেদ, মাওলানা মামুনুল হক, মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব, মাওলানা যুবায়ের আহমেদ, মাওলানা জালাল উদ্দিন, মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন রাজী, মাওলানা মঞ্জুরল ইসলাম আফেন্দী, মাওলানা ইলিয়াস হামিদী, মুফতি শরীফুল্লাহ, শায়খুল হাদীস মাওলানা বশিরুল্লাহ, মাওলানা মহিউদ্দীন খান, মাওলানা শাহজাহান শিবলী, মাওলানা হাফেজ মোয়াজ্জেম হোসেন, মাওলানা অলিউর রহমান, মাওলানা রফিকুল ইসলাম মাদানী, গোলাম রাব্বানী ইসলামাবাদী, জাকারিয়া নোমান, মুফতি হারুন, জাফর আহম্মদ ছাদেক, এমরান সিকদার, ওবায়দুল্লাহ ওবায়েদ, মাওলানা মীর ইদ্রিস, ওজাইর আহমদ হামিদী, মাওলানা ফখরুল ইসলাম প্রমুখের নাম। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, বরিশাল, খুলনা, গোপালগঞ্জ, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী জেলাগুলোতে বেশি প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা হেফাজতের।

এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের তদন্তে এসেছে জামিয়াতুল আবরার হাফিজিয়া মাদ্রাসা, মা. হাদুশ শাইখ ইদরীম আর ইসলামী ও আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসা, আশরাফিয়া মহিলা মাদ্রাসা, আব্দুল আলী দারুস সালাম হিফজুল কোরআন মাদ্রাসা, ইফয়জুল উলুম মুহডিচ্ছুন্নাহ আরাবিয়্যাহ মাদ্রাসা, আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া নূরুল কোরআন মাদ্রাসা, জামিয়া মুহাম্মদীয়া মাদ্রাসা, কারামাতিয়া মাতালাউল উলুম মাদ্রাসা, মেখল হাটহাজারীর জামিয়া ইসলামিয়া হামিউস সুন্নাহ মাদ্রাসা, চারিয়া হাটহাজারীর জামিয়া ইসলামিয়া ক্বাসেমুল উলুম মাদ্রাসা, ফতেহপুর হাটহাজারীর জামিয়া হামিদিয়া নাছেরুল ইসলাম মাদ্রাসা, পটিয়ার আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসাসহ অন্তত হাজারখানেক মাদ্রাসার শিক্ষকদের নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর কথা ছিল। আমরা প্রতিটি বিষয় নিয়ে আরও তদন্ত করছি।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রিমান্ডে থাকা হেফাজত নেতাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। হেফাজতের অনেকে নির্বাচন করার কথাও স্বীকার করেছেন। হেফাজতের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ছিল তাদের কথায় আমরা অনেকটা নিশ্চিত। অনেক রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে সংগঠনটির কারও কারও গোপন যোগাযোগ ছিল। সবকটি বিষয়ই আমরা খতিয়ে দেখছি।’ একই কথা বলেছেন ডিএমপির তেজগাঁও ডিভিশনের সদ্য পদোন্নতি পাওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি হারুন-অর-রশীদ। তিনি বলেন, ‘আগামী সংসদ নির্বাচনে টার্গেট করেছে হেফাজত। এই সংক্রান্ত মামুনুল অনেক তথ্য দিয়েছেন। তারা একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করারও পরিকল্পনা করেছিলেন। কোন কোন আসনে নির্বাচন করবে তার ছকও এঁকেছে সংগঠনটি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত