শ্রম আইনে বেঁধে দেওয়া ৭ কর্মদিবসের মধ্যে পোশাক (গার্মেন্টস) শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করতে পারেনি বেশিরভাগ কারখানা। ঈদ ছুটির আগে সব কারখানা বেতন পরিশোধ করতে পারবে কি না তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রুগ্ণ কারখানাগুলোর শ্রমিকের বেতন পরিশোধ করতে প্রয়োজন ব্যাংকঋণের শর্ত শিথিল। আর এজন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ে নির্দেশনা চাচ্ছে মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। এদিকে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ান বলেছেন, ঈদে ছুটি যে কয়দিনই হোক না কেন, সবাইকে কর্মস্থলে অবস্থান করতে হবে।
বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘করোনায় সবারই ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল কমে গেছে। এতে অনেক কারখানা মালিক বেতন-বোনাস নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। আমরা বিষয়টি মাথায় নিয়ে সরকারের কাছে একটি প্রণোদনাও চেয়েছিলাম। এরপরে গত ৩ মে অর্থ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদারকে আমরা বলেছিলাম, অন্তত আমাদের ব্যাংকঋণটা সহজ করে দিতে, যাতে শ্রমিকের বেতন দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ পাই। কিন্তু এখনো এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা পাইনি। সরকার যদি এখনই উদ্যোগ না নেয় তাহলে কিছু কারখানা বেতন-বোনাস নিয়ে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে। শিল্প ও শ্রমিকদের বাঁচিয়ে রাখতে এটি খুবই জরুরি।’
বিজিএমইএর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা ৭০০ কারখানাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। এর মধ্যে ৬৮৪টি কারখানা পরিদর্শন শেষ হয়েছে। পরিদর্শন তথ্য অনুযায়ী, ৯৪ শতাংশ কারখানার বেতন ও বোনাস নিয়ে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। বাকি কারখানাগুলোর কারও বোনাস, কারও কারও বেতন ও বোনাস নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। এসব কারখানার পক্ষে নিজ উদ্যোগে অর্থের জোগান দেওয়া সম্ভব না। আবার ব্যাংকগুলোও নানাবিধ সমস্যায় এসব কারখানাকে ঋণ দিতে চাচ্ছে না।
এ বিষয়ে বিজিএমইএ সহসভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনায় ক্রয়াদেশ কমে গেছে। এজন্য বেশ কিছু কারখানা তাদের সক্ষমতা হারিয়েছে। ব্যাংক যদি মানবিক দিক বিবেচনা করে শ্রমিকের বেতনের জন্য ঋণ দেয় তাহলেই সমাধান হবে। এজন্য প্রয়োজন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনা। আমাদের হাতে সময় আছে মাত্র ২ দিন। সরকারকে এই সময়ের মধ্যেই সিদ্ধান্ত দিতে হবে। অন্যথায় বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হবে। তাই সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের কথা বিবেচনা করে দ্রুত একটা নির্দেশনা দিন।’
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় তাদের সদস্যভুক্ত ১ হাজার ৬৬৭টি কারখানা চালু আছে। গতকাল রবিবারের তথ্য অনুযায়ী, ৬০ শতাংশ কারখানার বেতন ও ৬৭ শতাংশের বোনাস দেওয়া হয়েছে। বাকি করাখানাগুলেতো ১২ মে’র মধ্যে বেতন ও বোনাস পরিশোধের লক্ষ্যে কাজ চলছে। তবে যে ক’টি কারখানা ঝুঁকিতে রয়েছে তাদের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ সমস্যা সমাধানে সরকার, মালিক ও ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত কয়েকটি কারখানার বেতন ও বোনাস বকেয়া থেকে যেতে পারে।
বিকেএমইএ সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেকেই হয়তো বলবেন কারখানা চলছে, কিন্তু বেতন দেওয়ার টাকা নেই। এমনটা কীভাবে সম্ভব? মূল কথা হলো, অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতা টাকা দিতে দেরি করেন। আবার মাঝেমধ্যে ক্রেতা টাকা দিলেও কাগজপত্রের ঝামেলার কারণে সময়মতো টাকা পাওয়া যায় না। কিছু কারখানার তো সব সময়ই সমস্যা থাকে। এসব কারখানার জন্য আমরা সহজ শর্তে ঋণ চাচ্ছি। সরকার যদি ঋণ না দেয়, আমাদের তো শ্রমিকের টাকা দিতেই হবে। তখন হয়তো জমিজমা বিক্রি করে বা বউয়ের গহনা বিক্রি করে হলেও এটা পরিশোধ করতে হবে।’
ছুটি যাই হোক, কর্মস্থলে অবস্থান করার নির্দেশ শ্রম প্রতিমন্ত্রীর : এদিকে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ান বলেছেন, ‘সরকার তিন দিন ছুটি নির্ধারণ করেছে। এর বাইরে অনেক গার্মেন্টসে পাঁচ থেকে সাত দিন পর্যন্ত ছুটি দিয়েছে। ছুটি যাই হোক, কর্মস্থলে অবস্থান করতে হবে। সরকার নির্ধারিত তিন দিনের বেশি যদি কোনো কারখানায় ছুটি দেওয়া হয় তবে তাকে অবশ্যই কারখানার শ্রমিকদের কর্মস্থলেই থাকা নিশ্চিত করতে হবে। কোনোভাবেই নিজ নিজ কর্মস্থল ত্যাগ করা যাবে না’। গতকাল রবিবার রাজধানীর শ্রম ভবনে আয়োজিত আরএমজি বিষয়ক ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ (টিসিসি) সভায় তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় শ্রমিক নেতারা ৩ দিনের পরিবর্তে ৫ দিন ছুটি দাবি করেন।
বিকেএমইএ সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘এবার ঈদে কোনো সমস্যা থাকবে না, সব কারখানায় বেতন-বোনাস হবে। ইতিমধ্যে ৭৫ শতাংশ কারখানা বেতন-বোনাস-ভাতা পরিশোধ করেছে। তবে কাজ না থাকায় অনেক কারখানায় ছুটি দেওয়া হয়েছে। তবে সব শ্রমিক নিজ নিজ কর্মস্থলে থাকবেন।’
