ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সরকার ঘোষিত তিন দিনের ছুটি না মেনে ১০ দিনের ঈদের ছুটির দাবিতে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছে পোশাক শ্রমিকরা। গতকাল সোমবার দুপুরে গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গীর মিলগেইট এলাকার ক্রিয়েটিভ কালেকশন লিমিটেড নামে একটি কারখানার শ্রমিকরা এ বিক্ষোভ ও অবরোধে যোগ দেয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষে পুলিশ ও শ্রমিকসহ কমপক্ষে ২৫ জন আহত হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজন শ্রমিক গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
আন্দোলনরত শ্রমিক ও গাজীপুর শিল্প পুলিশের সদস্যরা জানান, ক্রিয়েটিভ কালেকশন লিমিটেড কারখানা
কর্র্তৃপক্ষ সরকার ঘোষিত তিন দিনের ছুটির নোটিস শ্রমিকদের জানিয়ে দেয়। শ্রমিকরা এ ছুটি না মেনে ১০ দিনের ছুটি দাবি করে আসছিলেন। কারখানা কর্র্তৃপক্ষ সাত দিনের ছুটি মেনে নেয়। কিন্তু ১০ দিনের ছুটির দাবিতে গতকাল সকালে শ্রমিকরা কারখানার ভেতরে কর্মবিরতি শুরু করে বিক্ষোভ করতে থাকেন। পরে শিল্প পুলিশ ও থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলে কারখানার শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে বিক্ষিপ্তভাবে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। পরে পুলিশ শ্রমিকদের ধাওয়া দিলে উভয়পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। এক পর্যায়ের শ্রমিকরা কারখানা থেকে বের হয়ে কারখানা সংলগ্ন ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ ও যানবাহন ভাঙচুর শুরু করেন। পুলিশ মহাসড়ক থেকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের সরানোর চেষ্টা করলে শ্রমিকরা পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বিক্ষোভরত শ্রমিকদের লাঠিপেটা ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এরপর বেলা দেড়টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় কমপক্ষে ১৭ জন শ্রমিক ও ৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। আহত শ্রমিকদের প্রথমে টঙ্গী শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সেখান থেকে গুরুতর আহত ১৩ জন শ্রমিককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ রয়েছেন।
আহতরা শ্রমিকরা হলেন- হাসান মিয়া (২৬), রাজীবুল ইসলাম (২৬), মামুন মিয়া (২৭), রবি (২১), লতিফ (১৯), ইমরান (১৯), রুবেল (২৪), রুবেল (২২), রনি (২২), এহসানুল হক (৩৫), রাজিবুল (২৬), কলি বেগম (২৪), নিজাম উদ্দিন (৩০), সমলা (২৫), ইয়াসিন (২০), হাসিনা (৪০), সাব্বির (২২), সাবিনা (২৫) ও রিনা বেগম (২০) প্রমুখ।
আর আহত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন- শিল্প পুলিশের অ্যাডিশনাল এসপি জালাল হাওলাদার, এএসপি এস আলম, সিটি এসবির এসআই রুবেল, এসআই কামাল হোসেন, পুলিশের এসআই লিটন ও কনস্টেবল এনামুল হোসেন।
ঢামেক হাসপাতালে পাঠানো শ্রমিকদের মধ্যে কাঞ্চনের অবস্থা গুরুতর। তার পেটের নিচের দিকে শটগানের গুলি লেগেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
ঢামেকে চিকিৎসাধীন আহত শ্রমিক মামুন মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাধারণত ঈদের ছুটির ২-৩ দিন আগেই তাদের কারখানায় ছুটির নোটিস টানিয়ে দেওয়া হয়। তবে এবার তাদের কারখানায় কবে থেকে কতদিন ছুটি দেওয়া হবে তার কোনো নোটিস গতকালও টানানো হয়নি। এজন্য শ্রমিকরা সকালে কারখানায় গেলেও সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কাজ বন্ধ করে কারখানার নিচেই অবস্থান নেন। তখন মালিকপক্ষ ৭ দিনের ছুটি ঘোষণা করলে শ্রমিকরা ১০ দিনের ছুটির দাবি জানান।
তিনি আরও জানান, দাবি না মানায় কারখানার নিচেই অবস্থান করে আন্দোলন করছিলেন কারখানার সব শ্রমিক। এরমধ্যে একজন শ্রমিক কারখানা থেকে বের হয়ে রাস্তায় গেলে সেখানে পুলিশ তাকে পিটিয়ে আহত করে। পরে এ খবর শুনে মাথায় আঘাত পাওয়া ওই শ্রমিককে নিয়ে তারা সবাই রাস্তায় পুলিশের কাছে গিয়ে এর জবাব চাইলে তখন পুলিশ তাদের ওপর চড়াও হয়। পরে পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিলে পুলিশ গেটের সামনে শটগানের গুলি চালায়। এতে তাদের অর্ধশত শ্রমিক আহত হয়েছেন বলে দাবি মামুনের।
ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের পরিদশর্ক মো. বাচ্চু মিয়া জানান, বেলা সোয়া ১টার দিকে আহত ৯ জন শ্রমিককে ঢামেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাদের সবার চিকিৎসা চলছে। এদের মধ্যে দু-একজন ছাড়া সবার অবস্থাই আশঙ্কামুক্ত। তাদের শরীরে শটগানের গুলি বিদ্ধ হয়েছে।
শ্রমিক বিক্ষোভের বিষয়ে জানতে চাইলে ক্রিয়েটিভ কালেকশন লিমিটেডের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার মিজানুর রহমান বলেন, ‘শ্রমিকদের আন্দোলন অযৌক্তিক। প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদ উপলক্ষে শ্রমিকদের সাত দিনের ছুটি ঘোষণা করে কর্র্তৃপক্ষ। কিন্তু শ্রমিকরা অযৌক্তিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে কারখানায় ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আজ (গতকাল সোমবার) থেকেই কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।’
আর শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার জালাল হাওলাদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শ্রমিকরা সরকারি নির্দেশ অমান্য করে বিক্ষোভ কর্মসূচি ও মহাসড়ক অবরোধ করে। পুলিশকে উদ্দেশ্য করে শ্রমিকরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে কয়েকজন শ্রমিক আহত হয়। শ্রমিকদের ইটের আঘাতে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।’
