পরীক্ষা কমলে শনাক্ত কমে ভারতে

আপডেট : ১১ মে ২০২১, ০৪:০২ এএম

এক দিনের ব্যবধানে ভারতে কমেছে করোনা রোগী শনাক্ত ও মৃত্যু। দেশটিতে গত শনিবারের চেয়ে রবিবার ২৪ ঘণ্টায় করোনা রোগী শনাক্ত কমেছে প্রায় ৪০ হাজারের মতো। এদিন মৃত্যুও কমেছে প্রায় ৪০০। তবে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে শনিবারের তুলনায় রবিবার করোনার পরীক্ষা কম হয়েছে প্রায় ২ লাখের মতো। আগে কয়েক দিন টানা ২০ লাখের বেশি পরীক্ষা হলেও রবিবার পরীক্ষা হয় সাড়ে ১৮ লাখের মতো। 

দেশটিতে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি শুরু হয় গত মার্চ মাসের মাঝামাঝি। পরে তা দ্রুত বাড়তে থাকে। দেশটিতে গত ৩০ এপ্রিল প্রথম এক দিনে ৪ লাখের বেশি করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এদিন শনাক্ত হয় ৪ লাখ ১ হাজার ৯৯৩ জন। পরের কয়েক দিন শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৪ লাখের নিচে। ১ মে শনাক্ত হয় ৩ লাখ ৯২ হাজারের কিছু বেশি রোগী। ২ মে ৩ লাখ ৬৯ হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়। ৩ মে শনাক্ত হয় ৩ লাখ ৫৭ হাজার ২২৯ জন। ৪ মে ৩ লাখ ৮২ হাজার ৩১৫ জন শনাক্ত হয়।

তবে ৫ মে দেশটিতে করোনা সংক্রমণের ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। এদিন ভারতে ৪ লাখ ১২ হাজার ২৬২ জনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। পরদিন ৬ মে রেকর্ড ৪ লাখ ১৪ হাজার ১৮৮ জন শনাক্ত হয়। ভারতে আগে কখনো এক দিনে এত রোগী শনাক্ত হয়নি। কোনো দেশে এক দিনে শনাক্ত রোগীর দিক দিয়ে তা বিশ্বরেকর্ডও। ৭ মে শনাক্ত হয় ৪ লাখ ১ হাজার জন। ৮ মে ৪ লাখ ৩ হাজার ৭৩৮ জন শনাক্ত হয়। আলোচ্য কয়েক দিনে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যে কয়দিন রোগী কম শনাক্ত হয়েছে সে কয়দিনই পরীক্ষা কম হয়েছে। 

তাই রোগী কমছে মানে চূড়া অতিক্রম করেছে বিষয়টি তেমন নয়। কারণ দেশটিতে শনাক্তের হার এখনো ২০ শতাংশের ওপরে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, যেকোনো দেশে করোনা সংক্রমণের প্রকৃত পরিস্থিতি জানার একমাত্র উপায় হলো ব্যাপকভিত্তিক পরীক্ষা। এখন ভারতে দিনে প্রায় ২০ লাখ করোনার নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু চলতি মাসের শুরুর দিকে পরীক্ষার সংখ্যা ১৫ লাখে নেমে এসেছিল। তবে ৫ মে আবার দৈনিক পরীক্ষার সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২০ লাখ হয়। মাঝে এই যে পরীক্ষার সংখ্যা কমল, তার কারণে দেশটিতে দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা কমে থাকতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) কনসালট্যান্ট রিজো জন বলেন, গত বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতে প্রথম দফা সংক্রমণ যখন চূড়ায় পৌঁছেছিল, তখনো এমনটা হয়েছিল। সে সময় দেশটিতে যখন প্রতিদিন শনাক্ত রোগীর সংখ্যা এক লাখ ছুঁই ছুঁই, তখন পরীক্ষা কমে গিয়েছিল।

ভারতীয় কর্র্তৃপক্ষ যখন মহারাষ্ট্র, গুজরাট, তেলেঙ্গানা ও দিল্লিতে করোনা শনাক্তের হার কমার কথা বলছে, তখন এসব রাজ্যে পরীক্ষার সংখ্যাও কমতে দেখা গেছে।

এপ্রিল মাসের মাঝামাঝিতে দিল্লিতে দিনে প্রায় এক লাখ করোনা পরীক্ষা করা হচ্ছিল। তখন দিনে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১৬ হাজারের মতো। কিন্তু এপ্রিলের শেষ দিকে যখন শনাক্তের হার ৫৫ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়, তখন পরীক্ষা ২০ শতাংশ কমে যায়। এ থেকে সংক্রমণের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার বিষয়টিকেই ইঙ্গিত করে। গুজরাট ও তেলেঙ্গানায়ও একই প্রবণতা দেখা গেছে।

ভারতে প্রয়োজনের তুলনায় করোনা পরীক্ষার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কনসালট্যান্ট রিজো জন বলেন, করোনা পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত ভিড় হওয়ায় অনেক মানুষ পরীক্ষা করতে পারছেন না।

ভারতে করোনা পরীক্ষার হার প্রতি এক হাজার মানুষে ১ দশমিক ৩। সে তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে ৩, আর যুক্তরাজ্যে ১৫।

জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি বলছে, করোনা পরীক্ষায় উচ্চ ‘পজিটিভ’ ফলের হার কমিউনিটির অনেক মানুষের সংক্রমণ শনাক্তের বাইরে থাকার বিষয়টিকেই ইঙ্গিত করে।

ভারতের অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ ও জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক গৌতম মেনন একজন গাণিতিক মডেলার। তিনি বলেন, ভারতে করোনা পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ার হার এখনো অনেক বেশি। তা ২০ শতাংশের ওপরে। তাই তিনি মনে করেন রোগী কম শনাক্ত হলেই তাকে কমার প্রবণতা বলা যায় না। 

এদিকে ভারতে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর যে হিসাব সরকার দিচ্ছে, তার চেয়ে প্রকৃত সংখ্যা বেশি হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, সংক্রমিত অনেকে করোনা পরীক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন না। এ কারণে তারা হিসাবের আওতায় আসছেন না। মৃত্যুর অনেক তথ্যও সরকারি হিসাবে যুক্ত হচ্ছে না।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে এমন আশঙ্কার কথা বিজ্ঞানীরা আগে জানালেও তাতে গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে। ভারতের করোনা সংকটের জন্য দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কাঠগড়ায় তুলেছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মেডিকেল জার্নাল দ্য ল্যানসেট।

করোনা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতির মুখে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ১ মে থেকে সব প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে (১৮ বছরের ঊর্ধ্বে) টিকাদানের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ভারত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত