ভারতীয় ধরনের সংক্রমণ ঠেকানোর চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ১১ মে ২০২১, ০৪:২৫ এএম

দেশে ভারতীয় করোনার ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে প্রথম দফায় বিগত ২৬ এপ্রিল থেকে ১৪ দিনের জন্য ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ রাখা হয়। দ্বিতীয় দফায় গত ৮ মে থেকে আবারও ১৪ দিনের জন্য সীমান্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। বলা হয়, যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে এমন বাংলাদেশিরাই শুধু বাংলাদেশ হাইকমিশনের অনাপত্তি ছাড়পত্র নিয়ে বিশেষ বিবেচনায় দেশে ঢুকতে পারবেন। কিন্তু দেখা গেল গত দুই সপ্তাহে যেসব বাংলাদেশি বেনাপোল দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন তাদের ৮০ শতাংশেরই ভিসার মেয়াদ শেষ হয়নি। এছাড়া বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে অবৈধভাবে আরও অনেক বাংলাদেশি দেশে ফিরে আসছেন। এছাড়া স্থলবন্দরগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে যে চরম শিথিলতার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে সেটিও খুবই দুঃখজনক। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভারত থেকে দেশে প্রবেশ করা ব্যক্তিদের যেমন যথাযথ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে না, তেমনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করারও কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। অন্যদিকে, ‘কঠোর বিধিনিষেধের’ নামে দেশে দূরপাল্লার গণপরিবহন বন্ধ রাখার নীতি সাধারণ মানুষকে সীমাহীন ভোগান্তির মধ্যে ফেললেও ঈদে ঘরমুখো মানুষের ঢল আটকানো যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় দেশে করোনার নতুন ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা।

সোমবার দেশ রূপান্তরে ‘নামেই সীমান্ত বন্ধ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশের আর ঢিলেঢালা প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার যে চিত্র দেখা গেছে তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। যশোর জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৬ এপ্রিল সীমান্ত বন্ধ হওয়ার পর রবিবার পর্যন্ত বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ২ হাজার ৭০০ জন বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। তাদের ৮০ শতাংশেরই ভিসার মেয়াদ ছিল। ভারত থেকে সরাসরি কভিড পজিটিভ রোগীও দেশে আসছেন। পৃথিবীতে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে অন্য একটি দেশ থেকে কভিড পজিটিভ রোগী আসছেন। এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত ১৬ জন কভিড পজিটিভ রোগী ভারত থেকে দেশে ফিরেছেন। তারা দেশটি থেকে পজিটিভ সনদ নিয়েই দেশে এসেছেন। তাদের স্থানীয়ভাবেও পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে একজনের শরীরে যে করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে তা ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট। বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে ৩৫০ থেকে ৪০০ জন বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। কিন্তু গত ২৬ এপ্রিল সীমান্ত বন্ধের পর থেকে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ মানুষ প্রবেশ করছেন। সীমান্ত বন্ধের নিয়মনীতি কঠোরভাবে অনুসরণ না করলে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে বলে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা মনে করেন।

যথাযথভাবে সীমান্ত বন্ধ করতে না পারার পাশাপাশি বড় সংকট হয়ে উঠেছে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিদেশফেরতদের কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করতে না পারার ব্যর্থতা। এখন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারাই বলছেন, বাংলাদেশের কোনো জেলায়ই কোয়ারেন্টাইনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই। হঠাৎ এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে যেকোনো জেলা প্রশাসনই অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে যাবে। যশোরের জেলা প্রশাসন অপ্রস্তুত অবস্থায় ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো মহামারীর এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে এসে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের প্রস্তুতি সরকার নেয়নি কেন? ভারতে করোনার মারাত্মক সংক্রামক নতুন ভ্যারিয়েন্ট দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ার পর সীমান্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো কিন্তু কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো না কেন? জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, ভারতফেরতদের যশোর ও বেনাপোলের হোটেলে রাখা হয়েছে। কিছু যাত্রীকে অন্যান্য জেলায়ও পাঠানো হয়েছে। যারা ভারত থেকে এসেছেন তাদের কেউই কোয়ারেন্টাইনে থাকতে চান না। কোয়ারেন্টাইন থেকে ১০ জন রোগী পালিয়ে গিয়েছিলেন। এর মধ্যে সাতজন ভারতফেরত, বাকিরা স্থানীয়। তাদের খুঁজে হাসপাতালে ফিরিয়ে এনেছে যশোর জেলা প্রশাসন। আবার বিদেশফেরতদের নিজ খরচে কোয়ারেন্টাইনে থাকা নিয়ে আপত্তি ভারতফেরতদের। শেষ পর্যন্ত যশোর জেলা প্রশাসন কোয়ারেন্টাইনে রাখা ব্যক্তিদের হোটেল ও অন্যান্য খরচ ৫০ ভাগ কমিয়ে দেওয়ায় তারা সেটা মেনে নিয়েছেন।

এখন সারা বিশ্বই করোনার নতুন ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে শঙ্কিত হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞানী মহলেও প্রশ্ন উঠছে ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে আক্রান্তের সংখ্যা কেন এত বাড়ছে? শুধুই কি ভাইরাসের চরিত্র বদল? নাকি অন্য কোনো কারণও রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান বিজ্ঞানী সৌম্য স্বামীনাথন যে বিবৃতি দিয়েছেন তা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। তিনি বলছেন, ভারতে করোনার যে ধরনটি ছড়াচ্ছে, তা অনেক বেশি সংক্রামক এবং করোনার এই ধরনটি সম্ভবত টিকার সুরক্ষাকে এড়াচ্ছে। ভারতে করোনার বিস্ফোরণে এই বিষয়গুলো ভূমিকা রাখছে। এই অবস্থা মারাত্মক উদ্বেগের। কেননা, বাংলাদেশেও যদি দ্রুত ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ে তাহলে তা মোকাবিলা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় ভারতের সঙ্গে সীমান্তে সর্বোচ্চ কঠোরতা প্রয়োজন। একইসঙ্গে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য সর্বোচ্চ নজরদারিসহ স্বাস্থ্য বিভাগের বিশেষ সক্রিয়তা খুবই জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত