কুষ্টিয়ার আবুল হোসেনের বয়স ৭৮ বছর। থাকেন রাজধানীর ধানমন্ডির সাত নম্বর সড়কের ফুটপাতে। বৃষ্টিতে ভেজা আর রোদে শুকানো তার নিত্যনিয়তি। আবুল হোসেন বলছিলেন, ‘২৭ বছর ধইর্যা ঈদ কী জিনিস ট্যার পাই না। শরীরে বল নাই, চলবার পারি না। রুটি-বিস্কুট খাইয়া দিন কাটে, ঈদের দিন বড়লোকরা কেউ কিছু দিলে খাই, না দিলে নাই।’
মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধসংলগ্ন বোটঘাট বস্তির আমেনা বেগম (৭০) একজন ভিক্ষুক। দুই ছেলে ও এক মেয়ে আছে, তারা নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। মায়ের খোঁজখবর নেয় না। ঈদের দিন তার কেটেছে ভিক্ষে করে। সকালে একটু পান্তা খেয়ে বের হয়েছিলেন। সন্ধ্যায় ফিরেছিলেন এক কেজি ব্রয়লার মুরগির মাংস নিয়ে। ঈদের কেনাকাটা বলতে তার ওটুকুই।
বেসরকারি হিসাবে ঢাকার বস্তিগুলোতে ৪০ লাখ নিম্ন আয়ের মানুষের বাস। এর বাইরে আরও ৫০ হাজার মানুষ আছে যারা ভাসমান হিসেবে ঢাকার বিভিন্ন উদ্যান, পার্ক ও ফুটপাতে বাস করে। মুসলমানদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতরে প্রতি বছর এসব মানুষের জীবন সাদামাটাভাবে কাটে। এ বছরের ঈদ ছিল আরও সাদামাটা। অধিকাংশ মানুষ ঈদের জন্য তেমন কেনাকাটা করতে পারেনি। মহামারী করোনা জীবিকায় বড় টান ফেলছে তবে সে তুলনায় সরকারি-বেসরকারি সহায়তা আসেনি। এ অবস্থায় ঢাকার দরিদ্ররা বলেছে, ঈদের আনন্দ তারা টেরই পায়নি। সাধারণ দিনগুলোর মতোই টানাপড়েনে কেটেছে বিশেষ এই দিনটি।
কামরাঙ্গীরচরের মাঝিঘাট এলাকায় গতকাল রবিবার কথা হয় রুমিয়া বেগমের সঙ্গে। চার সন্তান তার। স্বামী নেই। সবার ছোট ছেলেটাকে একটি পাঞ্জাবি কিনে দিয়েছিলেন। অন্যদের দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে মায়ের ওপর মন খারাপ করে আছে অন্যরা। রুমিয়া বেগম বলেন, ‘মানুষের বাসায় কাম কইর্যা মাস শ্যাষে পাই ৬ হাজার ট্যাকা। ঘর ভাড়াতেই চইল্যা যায় ৩ হাজার। বাকি ট্যাকা দিয়া সংসার চলে না। বাচ্চারা তো এইট্যা বোঝে না। বাচ্চাগোর জন্য মনটা কান্দে কিন্তু কিচ্ছু দিতে পারি না। ওদের মুখে হাসি নাই, মা হইয়া আমার ঈদ হয় ক্যামনে?’
প্রতি বছরেই ঈদের আনন্দ কমবেশি ভাগাভাগি করে নিতে পারলেও এ বছর ঈদের আনন্দ অনেকটাই মøান হয়ে গেছে রাজধানীর বস্তিবাসীর। সরকারি বা বেসরকারিভাবে তেমন কোনো ত্রাণ সহায়তা না পাওয়ায় ঈদের আনন্দ নেই ঢাকার অধিকাংশ বস্তিবাসীর। গত বছর করোনার মধ্যে ঈদে তাদের অনেকে ত্রাণ ও বিভিন্ন সহযোগিতা পেয়েছে। তবে এবারের ঈদে বেশিরভাগই কোনো প্রকার ত্রাণ বা সহযোগিতা পায়নি।
নিম্ন আয়ের মানুষরা জানায়, গত বছর সাধারণ ছুটির মধ্যে ঈদ উদযাপন হয়। সেবার সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে অনেকে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছিল। কিন্তু এবার মোটের ওপর ছিল ব্যতিক্রম। দেড় মাস ধরে লকডাউন চললেও কেউ সহায়তা পায়নি। এমনকি প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ৩৫ লাখ পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে ঈদ উপহারের টাকাও তারা পায়নি। অথচ এ সময়ে কাজ হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে অসংখ্য খেটেখাওয়া মানুষ।
হাজারীবাগের বউবাজারের বাসিন্দা হাফিজুর রহমান (৬০) বলেন, ‘আমাগো বস্তিতে ২০০ পরিবার থাকে। একটা লোকও প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য পাইল না। তাইলে এই ট্যাকা গেল কই? আমাগোর চাইতে আর গরিব আছে কারা?’ ঢাকায় ২০ বছর ধরে রিকশা চালানো আবুলের বস্তির বাসিন্দা মো. আলম (৩৭) বলেন, ‘শারীরিক সমস্যার কারণে ঠিকমতো রিকশা চালাইতে পারি না। কোনো উপায় না থাকায় তবুও সপ্তাহে দুদিন রিকশা চালাই। বস্তিতে আগুন লাইগ্যা আমার সবকিছু শ্যাষ হইয়া গেছে। ঈদের দিনে খাওয়ার জন্য আধা কেজি চাউল আর ১০ টাকার চ্যাপা শুঁটকি কিনছি।’
ঢাকা উদ্যান এলাকায় কথা হয় লক্ষ্মীপুরের মর্জিনা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার ১৮ বছরের মেয়ে গার্মেন্টসে কাজ করে পাঁচজনের পরিবার চালায়। ঈদের জন্য আমরা কিছুই কিনতে পারিনি।’
প্রতিবন্ধী ছোট বোন ও মারা যাওয়া আরেক বোনের দুই সন্তান নিয়ে ভাসানটেকের বেনারশিপল্লীতে থাকেন রুবিনা বেগম (৪০)। গৃহকর্মীর কাজ করে সংসার চালান তিনি। রুবিনা বলেন, ‘অন্যের বাসায় কাজ করতে গেলে তারা কিছু দিলে সেটা দিয়েই কোনোরকমে সংসার চলে। করোনার কারণে এখন তেমন কেউ কাজে নেয় না। সপ্তাহে দুদিন কাজ করি। প্রতি বছর ঈদে মাংস খেতে পারলেও এবার সেই ভাগ্য মনে হয় নেই। তিনি জানান, ঈদের জন্য আধা কেজি সেমাই ও আধা কেজি চিনি কিনেছেন।
