ভোগান্তি সাথে নিয়ে ঢাকা ফিরছে মানুষ

আপডেট : ১৮ মে ২০২১, ০৩:৪৬ এএম

ঈদের ছুটি শেষে রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের জেলার কর্মস্থলে ফিরছেন মানুষ। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় মোটরসাইকেল, পিকআপ ভ্যান, পণ্যবাহী ট্রাক, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনে ভেঙে ভেঙে রাজধানীতে ফিরছেন তারা। এতে খরচ পড়ছে কয়েকগুণ। কড়া রোদে ভোগান্তির মাত্রাও বেড়েছে অনেক। দেশের ফেরিঘাটগুলোতে ঢাকামুখী মানুষের চাপে উপচে পড়া ভিড় দেখা দিয়েছে। এদিকে আরও কিছুদিন বাস, ট্রেন ও লঞ্চ বন্ধ রাখার সুপারিশ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তবে সরকারের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দেশের দুই-একটি মহাসড়কে বাস চলাচল করছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

দেশ রূপান্তরের বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর অনুযায়ী, গতকাল সোমবার সকাল থেকে সড়ক-মহাসড়কগুলোতে ঢাকামুখী জনস্রোত সৃষ্টি হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে এই স্রোত আরও বেড়ে যায়। যাত্রীর তুলনায় পরিবহন না থাকায় মানুষ তীব্র ভোগান্তিতে পড়েন। তারা হেঁটে, ছোট ছোট যানবাহনে করে গন্তব্যে পৌঁছার চেষ্টা করেন। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের যাত্রীদের ভোগান্তি হয়েছে বেশি। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে কিছু দূরপাল্লার বাস চলাচল করলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা ছিল একেবারেই সীমিত।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধির পাঠানো খবর অনুযায়ী, ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের কড্ডার মোড়, নলকা মোড় ও হাটিকুমরুল গোলচত্বর এলাকায় উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকাগামী যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা দিয়েছে। রাজশাহী, পাবনা, নাটোর, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, নওগাঁসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে তারা একাধিক পরিবহনে সিরাজগঞ্জের মহাসড়কে এসেছেন। তবে এখান থেকে ঢাকামুখী পরিবহন না পেয়ে চরম বিপাকে পড়ছেন তারা। হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার ওসি শাহজাহান আলী বলেন, মহাসড়কে কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীদের চাপ রয়েছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী দূরপাল্লার বাস চলতে দেওয়া হচ্ছে না। মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।

ভালুকা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর জেলার প্রবেশমুখ জৈনাবাজার এলাকায় ঢাকাগামী সব ধরনের গণপরিবহন ফিরিয়ে দিচ্ছে পুলিশ। সোমবার সকাল থেকে মহাসড়কের ওই অংশে ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী গণপরিবহন থেকে যাত্রী নামিয়ে ময়মনসিংহের দিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন ঈদ শেষে ঢাকামুখী সাধারণ মানুষ। গণপরিবহন না পেয়ে তারা ভ্যানগাড়ি, খোলা পিকআপ, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশায় কর্মস্থলে ফিরছেন। দুই শিশুসহ ময়মনসিংহের নান্দাইল থেকে গাজীপুরের উদ্দেশে আসছিলেন আকরাম হোসেন। তিনি গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘বাড়ি থেকে বের হয়েই পদে পদে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। দুই সন্তান নিয়ে সীমাহীন কষ্ট-যন্ত্রণা সহ্য করে অবশেষে গাজীপুরের একটি বাস পেয়েছিলাম। অতিরিক্ত ভাড়ায় রওনা হলেও পথিমধ্যে পুলিশ গাড়ি ঘুরিয়ে দেওয়ায় আমরা নেমে যাই। এখন বাসের চালক ও কন্ডাক্টর ভাড়া ফেরত না দিয়েই ময়মনসিংহের দিকে চলে গেল। আবার ভ্যানগাড়িতে উঠেছি। সন্তান নিয়ে বাকি পথ কী করে যাব?’

এদিকে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মহাসড়কে বাস চালানোর দায়ে গাজীপুরে দূরপাল্লার ৯৭ বাসচালক ও মালিকের নামে মামলা এবং ১০টি গাড়ি ডাম্পিং করা হয়েছে। গাজীপুর মেট্রোপলিটনের ট্রাফিক পুলিশের সহকারী কমিশনার (উত্তর) মো. মেহেদী হাসান বলেন, সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দূরপাল্লার কিছু বাস ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে চলাচল করছিল। রবিবার বিকেল থেকে সোমবার দুপুর পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর মহানগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে এ ধরনের ৪৫ বাসচালক ও মালিকের নামে মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগে আরও ১০টি গাড়ি ডাম্পিং করা হয়েছে। 

মাগুরা প্রতিনিধি জানান, সোমবার সকাল থেকে মাগুরা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঢাকাগামী যাত্রীদের ভিড় লক্ষ করা যায়। অধিকাংশ যাত্রী সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাট পর্যন্ত যাচ্ছেন। এতে ভাড়া পড়ছে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত।

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সোমবার ভোর থেকে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া থেকে ছেড়ে আসা প্রতিটি ফেরিতে মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী আসতে দেখা যায়। এরপর বাস না পেয়ে বিকল্প উপায়ে ঢাকার পথ ধরছেন মানুষ। তবে সুযোগ বুঝে প্রাইভেটকার, সিএনজি অটোরিকশা, ইজিবাইক চালকরা ভাড়াও চাইছেন তিন-চার গুণ। তীব্র গরমে নারী ও শিশুদের কষ্ট বেড়েছে অনেক। বিআইডব্লিউটিসির আরিচা অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত ডিজিএম জিল্লুর রহমান জানান, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে ১৬টি ফেরি যানবাহন ও যাত্রী পারাপার করছে।

মাদারীপুর প্রতিনিধি জানান, জেলার বাংলাবাজার ঘাটে ঢাকামুখী দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীচাপ তীব্র হচ্ছে। বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, ঝালকাঠিসহ বিভিন্ন জেলার লোকজন নানা কায়দায় বাংলাবাজার ঘাটে এসে জড়ো হচ্ছেন পদ্মা পারের অপেক্ষায়। যাত্রীরা জানান, বরিশাল থেকে বাংলাবাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে এক-দেড় হাজার টাকা খরচ পড়েছে। বাংলাবাজার ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌপথে ১৭টি ফেরি চলাচল করছে। যাত্রীরা সুষ্ঠুভাবে পদ্মা পার হতে পারছেন।  

এদিকে ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষের ভোগান্তি এড়াতে গণপরিবহন চালুর দাবি জানিয়েছিলেন সড়ক পরিবহন শ্রমিক ও মালিকরা। তবে বিষয়টি সে সময় আমলে নেয়নি সরকার। ২৩ মে পর্যন্ত দূরপাল্লার গণপরিবহন চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এটি আরও দীর্ঘায়িত করার সুপারিশ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। গতকাল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন ‘এখন বাস, ট্রেন, লঞ্চ বন্ধ আছে। আমরা প্রস্তাব করব এটাকে বন্ধ রাখতে। সংক্রমণ কমিয়ে আনতে আপাতত এটাই আমাদের করতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত