দাম বেড়েছে পেঁয়াজের বাড়তি দামেই চাল

আপডেট : ২১ মে ২০২১, ০৪:৪০ এএম

গুগল ম্যাপে রাজধানীর চালের পাইকারি বাবুবাজার থেকে হাতিরপুলের দূরত্ব পাঁচ কিলোমিটারের মতো। আর পেঁয়াজের পাইকারি শ্যামবাজারের দূরত্ব ছয় কিলোমিটারের একটু বেশি। বাবুবাজারে পাইকারিতে কেজিপ্রতি মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৫২-৫৩ টাকা। অথচ সেই চাল হাতিরপুল বাজারে ৬০ টাকা। আর ওই এলাকার মহল্লার আড়ত ও খুচরা বেশিরভাগ দোকানে পুরনো চাল বিক্রি হচ্ছে আরও চড়া দামে।

এমন অবস্থা রাজধানীর প্রায় সর্বত্র। খাদ্য মন্ত্রণালয় বলছে, বাজার তদারকিতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যৌক্তিক দাম বাস্তবায়নের দায়িত্ব তাদেরই। শ্যামবাজারে পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৩৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ হাতিরপুলে পণ্যটির দাম ৫০-৫৫ টাকা।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, কেজিপ্রতি পুরানো মিনিকেট চাল ৬৫, ব্রি-২৮ চাল ৫৫ এবং পাইজাম (মোটা) চাল ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। যেসব দোকানে নতুন চাল মিলছে তারা কেজিপ্রতি মিনিকেট ৬০ এবং ব্রি-২৮ চাল ৫২-৫৩ টাকা দরে বিক্রি করছেন। অন্যদিকে রাজধানীর পাইকারি বাজারে মিনিকেট ৫২-৫৩, ব্রি-২৮ চাল ৪৪-৪৫ এবং মোটা চাল ৪০-৪১ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

খুচরা দোকানদাররা বলছেন, তাদের প্রায় সবার পুরনো চাল মজুদ রয়েছে। এগুলো বিক্রির পরেই তারা নতুন চাল তুলবেন। আর নতুন চালের বাড়তি দামের বিষয়ে তারা বলছেন, এগুলো আগের কেনা। তখন বাজারে দাম অনেক বেশি ছিল।

রাজধানীর বাবুবাজারের চালের আড়তদার ও বাংলাদেশ রাইস মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি কাওসার আলম খান গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চালের দাম তো সেই ঈদের আগেই কমেছে। সামনে আরও কমবে। পাইকারি বাজারে কোনো পুরনো চালও নেই। কোনোভাবেই মিনিকেট চালের খুচরা দাম ৫৫-৫৬ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। এরপরও খুচরা বিক্রেতারা কেজিতে ৭-৮ টাকা লাভ করলে সেটি অত্যন্ত দুঃখজনক।’

চালের বাজার নিয়ন্ত্রণের মূল দায়িত্ব কার তা নিয়ে ঠেলাঠেলি অনেক পুরনো। তবে চাল ও গমের পুরো বিষয়টি দেখভাল করে খাদ্য মন্ত্রণালয়। দাম যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। আইন অনুযায়ী দাম বাস্তবায়নের দায়িত্বও তাদের। কিন্তু বিধিমালা ও লোকবলের অভাবে তারা সেটি পারছে না। তাই দুই প্রতিষ্ঠানই দারস্থ হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কাছে। যদিও ওই প্রতিষ্ঠানেরও লোকবল সংকট চরমে বলে দাবি করছেন কর্মকর্তারা।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজার তদারকির ক্ষমতা তো আমাদের নেই। যেহেতু কৃষি বিপণন অধিদপ্তর লোকবল ও বিধি না থাকায় তদারকি করতে পারছে না, তাই আমরা বাজার তদারকি করতে ভোক্তা অধিদপ্তরকে চিঠি দিয়েছি। এছাড়া জেলা প্রশাসককেও চিঠি দিয়েছি। বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ভোক্তার। আপনি (এই প্রতিবেদক) তাদের সঙ্গে কথা বলে দেখেন।’

চালের বাজার নিয়ে কথা বলার জন্য ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) বাবলু কুমার সাহাকে একাধিক দিন কল ও খুদে বার্তা দিলেও তাকে পাওয়া যায়নি। করোনা মহামারীর কারণে তার অফিসে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তো নিয়মিতই বাজার তদারকি করি। তবে ঈদের বন্ধের পর সেভাবে এখনো কার্যক্রম শুরু হয়নি। যদিও আজকে (গতকাল বৃহস্পতিবার) আমরা বের হয়েছিলাম। আগামী রবিবার থেকে পুরোদমে কার্যক্রম শুরু করব। তখন চালের বাজারের ওপর জোর দেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যাচাই করে দেখি তারা কয় টাকায় কিনলেন এবং কত লাভে বিক্রি করলেন। যদি অতিরিক্ত পার্থক্য দেখা যায় তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

যদি পুরনো রসিদ দেখানো হয়, কিন্তু যে চাল বিক্রি করছে সেগুলো দু-একদিন আগে কেনা সেক্ষেত্রে কী করেন জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কেবল রসিদ দেখেই ব্যবস্থা নিই। আর রসিদ দেখাতে না পারলেও জরিমানা করা হয়।’

পেঁয়াজের কেজি ৫৫ টাকা : এদিকে ঈদের কয়েক দিন আগ থেকেই আবারও ঝাঁজ ছড়াতে শুরু করে পেঁয়াজ। বর্তমানে বাজারে কেজিপ্রতি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪৫-৫৫ টাকা দরে। তবে বেশিরভাগ খুচরা দোকানদার ৫০ টাকা দরে পণ্যটি বিক্রি করছেন। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, পাইকারিতে দাম বাড়ায় খুচরায় দাম বেড়েছে। তবে পাইকারি বাজারে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। গতকাল রাজধানীর সবচেয়ে বড় পেঁয়াজের বাজার শ্যামবাজারে কেজিপ্রতি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৩৫ টাকা দরে।

শ্যামবাজার বণিক সমিতির সহসভাপতি আব্দুল মাজেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খুচরায় কেন এত দাম বুঝতে পারছি না। ঈদের আগেও কিন্তু এমন দামই ছিল। মঝে তো কয়েক দিন ৩৩ টাকা দরেও বেচছি (বিক্রি করেছি)। সরবরাহও প্রচুর। মনে হচ্ছে, মানুষের কাছে টাকা নেই তাই বিক্রিও কিন্তু এখন অনেক কম।’

হিলিতে পেঁয়াজের দাম ৫ টাকা বেড়েছে : দেশের পেঁয়াজচাষিরা যাতে ভালো দাম পায় সেজন্য পণ্যটির আমদানি অনুমোদন (আইপি) বন্ধ রেখেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এজন্য ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় বাজারেও সরবরাহ কিছুটা কম। এর প্রভাবে দেশের অন্যতম স্থলবন্দর দিনাজপুরের হিলি বন্দরে কেজিপ্রতি পেঁয়াজের দাম ৫ টাকা বেড়েছে। গতকাল বন্দর এলাকার বাজারে কেজিপ্রতি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৪০ টাকা দরে, যা ২-৩ দিন আগেও ছিল ৩৫ টাকা। এছাড়া ভারতীয় পেঁয়াজেও কেজিতে ৫-৭ টাকা বেড়ে ৩৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

হিলি বাজারের ব্যবসায়ী ইসরাফিল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইপি বন্ধ থাকায় গত মাস থেকেই ভারত থেকে পেঁয়াজ আসা বন্ধ রয়েছে। এতে করে বাজারে পণ্যটির সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিয়েছে, তাই আগের দামও বেড়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত