বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্ব দিন

আপডেট : ২৩ মে ২০২১, ১১:১০ পিএম

দেশে করোনা মহামারী শুরুর পর একটি অর্থবছর শেষ হয়ে আরেকটি অর্থবছর শুরু হতে যাচ্ছে। আগামী ৩ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন। এটা করোনাকালের দ্বিতীয় বাজেট। এখন প্রশ্ন উঠছে যে, করোনাকালের প্রথম বাজেট কতটা যৌক্তিক ছিল এবং সেই বাজেট বাস্তবায়নে সরকার কতটা সফল হয়েছে? গত বছর মহামারীকালের প্রথম বাজেটের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ আলোচিত বিষয় ছিল মহামারীর অভিঘাত থেকে দেশের অর্থনীতি বঁাঁচাতে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত বিশেষ প্রণোদনা। ১৯টি প্রণোদনা প্যাকেজে মোট সহায়তার পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। যা দেশের জিডিপির ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। এক বছরের পরিক্রমায় এখন এই নির্মোহ মূল্যায়ন জরুরি যে প্রণোদনার টাকা আসলে দেশের শিল্প খাতগুলোতে কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পেরেছে। প্রণোদনার ঋণ ছাড়ে বৃহৎ শিল্প খাত আর ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাত এবং কৃষি খাতের মধ্যে নানাবিধ বৈষম্য ও কাঠামোগত সংকটের কথা ইতিমধ্যেই অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা আলোচনায় এনেছেন। প্রশ্ন হলো, মহামারীকালের অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা ও নীতি-কৌশল সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আসন্ন বাজেটের পরিকল্পনা করা হয়েছে কি না?

অর্থনীতিবিদ এবং বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার নানা জরিপ ও মূল্যায়ন থেকে দেখা যাচ্ছে মহামারীকালের এক বছরেরও বেশি সময়ে এখন দেশের অন্যতম প্রধান সংকটে পরিণত হয়েছে বিপুল বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের অভাব। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, করোনা মহামারীর কারণে দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে ৩৯ শতাংশ। নতুন করে বিনিয়োগ না হওয়ায় মেশিনারিজ আমদানি কমেছে ৩৫ শতাংশ। ফলে এ সময়ে কোনো নতুন কর্মসংস্থান হয়নি। অন্যদিকে, দেশের মোট শ্রমশক্তির অন্তত ১৭ শতাংশ পুরোপুরি বেকার হয়ে গেছে। এর প্রভাবে দেশের ৬০ শতাংশ মানুষেরই আয় কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। ফলে চরম দুরবস্থায় রয়েছে ১ কোটিরও অধিক পরিবার। মহামারীর এই বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার প্রধানত বেসকারি নানা প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা। উল্লেখ্য, দেশের মোট কর্মশক্তির ৯৫ শতাংশই এখন নানা বেসরকারি খাতে কাজ করেন। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ চাকরি হারানোদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। মনে রাখা দরকার দেশে প্রতি বছর নতুন শ্রমশক্তি হিসেবে ২৩ লাখ কর্মী চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ২০২০ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, মহামারীতে ১৬ লাখ তরুণ-তরুণী কর্মসংস্থান হারিয়েছে। আর জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বলেছে, মহামারীতে ২৭ লাখ চাকরিজীবী তাদের চাকরি হারিয়েছে। তাদের সবাই বেসরকারি খাতে বা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করত। এসব তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করলে একটা বিষয় স্পষ্ট হয় যে, মহামারীতে চাকরি হারানোদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়াই হোক কিংবা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিই হোক, এজন্য সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন এসএমই বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধির। কেননা, এই খাতে নিয়োজিতরাই মহামারীতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

বিআইডিএস-এর তথ্য বলছে, দেশের শিল্প খাতের কর্মসংস্থানের ৮৬ শতাংশই এই এসএমই খাতে। এই খাত মাসে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন করে, মজুরি দেয় প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, দেশের জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান হচ্ছে ২৫ শতাংশ। আর সামগ্রিকভাবে শিল্প খাতে এসএমইর অবদান ৩২ শতাংশ। ওয়ার্ল্ড এসএমই ফোরামের তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে পঞ্চম স্থানে রয়েছে এসএমই খাত। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশে প্রায় ৬০ লাখ এসএমই উদ্যোক্তা রয়েছেন। কিন্তু বিআইডিএস-এর জরিপ বলছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য প্রণোদনার টাকা পেতে যেসব শর্ত দেওয়া হয়েছে, তা পূরণ করে টাকা পাওয়া অনেক কঠিন। কারণ, মাত্র ৩৮ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তার ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। বাকি ৬২ শতাংশ উদ্যোক্তা কখনো ব্যাংকে যাননি। ৪৯ শতাংশ উদ্যোক্তার এনজিও থেকে ঋণ নেওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। বাকি ৫১ শতাংশেরই এনজিও থেকে ঋণ নেওয়ার অভিজ্ঞতা নেই। এখন সরকারের উচিত হবে, অতিদ্রুত এসব কাঠামোগত সংকট দূর করে এই শিল্প খাতকে প্রতি গুরুত্ব দেওয়া।  

এমতাবস্থায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাময় এসএমই শিল্প খাত পুনর্গঠনের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা নিতে পারে সরকার। কেননা, এসএমই খাতেই তুলনামূলকভাবে স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগ করে স্বল্প সময়ে সবচেয়ে বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। পাশাপাশি দেশের বিকাশমান কৃষি অর্থনীতিকে আরও চাঙ্গা করতে পারলে সেখানেও নতুন করে অদক্ষ কিংবা কম দক্ষ কর্মীদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। বাস্তবসম্মত নীতি ও কৌশল অবলম্বন করতে পারলে আসন্ন বাজেটে বেকারত্ব কমিয়ে নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্য সফল করা খুব কঠিন হওয়ার কথা না।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত