স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘ সময় আটকে রেখে হেনস্তার পর অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে করা মামলায় গ্রেপ্তার সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম কারামুক্ত হয়েছেন। গতকাল রবিবার সকালে আদালত থেকে শর্তসাপেক্ষে জামিনের পর বিকেলে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। সাংবাদিক রোজিনাকে কারাফটকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান তার স্বজন, সহকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীরা। মুক্তির পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় রোজিনা ইসলাম বলেছেন, তিনি সাংবাদিকতা চালিয়ে যাবেন। একই সঙ্গে সাংবাদিকসহ যারা পাশে ছিলেন তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
এদিকে কারামুক্ত হওয়ার পর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য রোজিনা ইসলামকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। গতকাল সন্ধ্যায় স্বজনরা তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যান।
দৈনিক প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলাম গত ১৭ মে দুপুরের পর পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যান। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তাকে একটি কক্ষে প্রায় ছয় ঘণ্টা আটকে রেখে রাত সাড়ে ৮টার দিকে শাহবাগ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। পরে রাত পৌনে ১২টার দিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার করা দণ্ডবিধি ও অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় রোজিনাকে। গত বৃহস্পতিবার তার জামিন আবেদনের শুনানি শেষে গতকাল আদেশের জন্য শুনানির দিন ধার্য ছিল। ভার্চুয়ালি শুনানি শেষে গতকাল সকালে ঢাকার মহানগর হাকিম বাকী বিল্লাহ ৫ হাজার টাকা মুচলেকা এবং পাসপোর্ট জমা দেওয়ার শর্তে রোজিনার জামিন মঞ্জুর করেন। জামিনের কাগজপত্র কারাগারে পৌঁছানোর পর বিকেলে মুক্তি পান তিনি।
আদালতের জামিন আদেশের পর থেকে কাশিমপুর মহিলা কারাগারের ফটকের সামনে রোজিনার মুক্তির জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন তার স্বজন, সহকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা। বিকেলে সেই অপেক্ষার অবসান হয়। বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন রোজিনা। পরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গাড়িতে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
কারা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল বেলা ৩টার দিকে রোজিনা ইসলামের জামিনসংক্রান্ত কাগজপত্র কারাগারে এসে পৌঁছে। পরে তা যাচাই-বাছাই করে ৪টার দিকে তাকে কারামুক্ত করে দেওয়া হয়। এর আগে বেলা ৩টার দিকে রোজিনা ইসলামের স্বজনরা দুটি মাইক্রোবাসে চড়ে কারাগারের সামনে আসেন। কারা কর্র্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে তাদের বহনকারী দুটি মাইক্রোবাস বেলা সোয়া ৩টার দিকে প্রধান ফটক দিয়ে কারা অভ্যন্তরে প্রবেশ করে।
কারাফটকের বাইরে অবস্থান নেওয়া দেবর নূরুল ইসলাম আদলু জানান, রোজিনা ইসলামকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ভাইবোনসহ ১০-১২ জন স্বজন কারাগারের ফটকে এসেছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন রোজিনার ভাই মো. সেলিম, বোন জুলি, তার স্বামী জাহিদ পারভেজ, দেবর জাহিরুল ইসলাম, ননদ লিনা, তার স্বামী বাহারুল জাকারিয়া প্রিন্স, ভাগ্নি আত্তিয়া, সানরিয়া ও রাওপি, রোজিনার ভাশুর জাহিদ হোসেন মিলনের ছেলে জিদান ও রোজিনার মামাতো বোন রেখা।
এর আগে গত রবিবার রোজিনা ইসলামের জামিন আবেদনের শুনানি গ্রহণ করেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বাকী বিল্লাহ। শুনানিতে দুপক্ষের আইনজীবীরা ভার্চুয়ালি অংশ নেন।
স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে রোজিনা : কারামুক্ত হওয়ার পর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য রোজিনা ইসলামকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় স্বজনরা তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে সাংবাদিক রোজিনার ছোট বোন সাবিনা পারভেজ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সন্ধ্যা ৬টা ২৫ মিনিটে রোজিনাকে স্কয়ার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা চলছে।’
রোজিনা ইসলামের স্বামী মনিরুল ইসলাম বলেন, রোজিনার সিটি স্ক্যানসহ অন্যান্য পরীক্ষা করানো হচ্ছে। হাসপাতালে রোজিনার সঙ্গে তার অনেক স্বজন ও সহকর্মী ছিলেন।
বিক্ষোভ অব্যাহত : রোজিনা ইসলামের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে গত কয়েক দিন ধরেই প্রতিবাদ এবং আন্দোলন চলেছে। গতকাল সকালেও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন। এ সময় বক্তারা বলেন, রোজিনা ইসলামকে শুধু মুক্তি দিলেই হবে না, তার বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যেসব কর্মকর্তা রোজিনাকে হেনস্তা করেছেন, তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে। এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিকরা।
সাংবাদিক রোজিনার কারামুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত সমাবেশে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘এই সরকার রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে কোনো কিছু প্রমাণ করতে পারেনি। এরপরও জামিন দেওয়ার সময় শর্ত দিয়েছে, তার পাসপোর্ট রেখে দিতে হবে। রোজিনার পাসপোর্ট রেখে দেওয়া মানে, যারা লেখালেখি করেন তাদের সতর্ক করা।’
সমাবেশে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, ‘রোজিনা ইসলাম করোনার মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি প্রকাশ করেছেন। আর এ সরকারের অবস্থান হচ্ছে দুর্নীতির পক্ষে। দুর্নীতিবাজদের জেল হয় না, শাস্তি হয় না, শাস্তি হয়েছে রোজিনার। এ সরকার যেদিন সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলছে, তার পরদিন সাংবাদিক গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, নয়তো কোনো সংবাদপত্র বন্ধ হচ্ছে।’
একই কর্মসূচিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক সহসভাপতি (ভিপি) মো. নুরুল হক নুরু বলেন, ‘সচিবালয়ের মতো জায়গায় এক গণমাধ্যমকর্মীকে ছয় ঘণ্টা আটকে রাখার অধিকার কোনো সরকারি কর্মকর্তার নেই। তিনি যদি কোনো অপরাধ করতেন, তবে তাকে প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করতে পারতেন তারা। কিন্তু তা না করে তাকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’
