ঈদের পর করোনা পরিস্থিতির অবনতি

খুলনায় মৃত্যু বেড়ে তিনগুণ রোগী বাড়ছে রাজশাহীতেও

আপডেট : ২৪ মে ২০২১, ০৪:২২ এএম

খুলনায় করোনা রোগী মৃত্যু ও সংক্রমণের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়ছে। ঈদুল ফিতরের আগের সপ্তাহে করোনা সংক্রমণের হার কিছুটা কমে এলেও পরের সপ্তাহে তা বেড়েছে। আর মৃত্যুর ক্ষেত্রে এ হার বেড়ে তিন গুণে দাঁড়িয়েছে। সংক্রমণের এ ঊর্ধ্বগতি মোকাবিলায় খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার দ্বিতীয় আরেকটি ইউনিট খোলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে হাসপাতালটির কর্র্তৃপক্ষ।

এদিকে ঈদের আগে কমে এলেও রাজশাহীতে ফের বাড়ছে করোনা রোগী। রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলার পাশাপাশি আশপাশ জেলাগুলোতেও রোগী বাড়ছে। আর করোনা রোগী শনাক্তের সঙ্গে সঙ্গে চাপ বেড়েছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে। রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় একের পর এক সাধারণ ওয়ার্ডকে রূপান্তরিত করা হচ্ছে করোনা ওয়ার্ডে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় সহকারী পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ফেরদৌসী আক্তার দেশ রূপান্তরকে জানান, ঈদের পর গত এক সপ্তাহে (১৫-২১ মে) খুলনা বিভাগে নতুন করে ৫৯৭ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ সময় বিভাগে করোনায় মারা গেছে ১৬ জন। এর মধ্যে শুধু গত ২১ মে মারা যায় ১০ জন। অথচ ঈদের আগের সপ্তাহে (৮-১৪ মে) খুলনা বিভাগে করোনায় সংক্রমিত হয় ৪৮৪ জন। ওই সময় করোনায় মারা যায় ৫ জন।

বিভাগীয় শহর খুলনায় করোনা রোগীদের জন্য মাত্র একটি ইউনিট রয়েছে। খুমেক হাসপাতালে ১০০ শয্যার এ করোনা ইউনিটে গত কয়েক মাসে রোগীর উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। কিন্তু খুমেকের করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল এখন রোগীতে প্রায় কানায় কানায় পূর্ণ। খুমেক হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুরাতন অর্থোপেডিকস বিভাগে ৫০ শয্যার আরেকটি করোনা ইউনিট চালু করার জন্য কাজ চলছে। এছাড়াও বর্তমান করোনা ইউনিটে পরিপূর্ণ অক্সিজেন সেবাসহ রোগীদের সব ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে।

খুমেকের উপাধ্যক্ষ এবং করোনা প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা কমিটির সমন্বয়কারী ডা. মেহেদি নেওয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঈদের পরেই করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। এটা উদ্বেগজনক। সংক্রমণ মোকাবিলায় বর্ধিত আইসিইউ ও শয্যার কার্যক্রম শুরু করতে এক সপ্তাহ লাগবে।’ আর খুমেক হাসপাতালের পরিচালক মো. রবিউল হাসান বলেন, ‘দ্বিতীয় ইউনিট খোলার কাজ চলছে। আশা করছি খুব দ্রুত এ কাজ শেষ হবে।’

রোগী বাড়ছে রাজশাহীতেও : ঈদের আগে কমে এলেও রাজশাহীতে আবারও বাড়ছে করোনা রোগী। রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলার পাশাপাশি আশপাশ জেলাগুলোতেও রোগী বাড়ছে। করোনা রোগী বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাপ বেড়েছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালেও। রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় একের পর এক সাধারণ ওয়ার্ডকে রূপান্তরিত করা হচ্ছে করোনা ওয়ার্ডে। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ বলছেন, করোনা রোগীর চাপ সামলাতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। ডাক্তার সংকট সামলে নিলেও জায়গার সংকুলান করতে তারা বেসামাল অবস্থায় পৌঁছে গেছেন।

রামেক হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ হাসপাতালে দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১৩৬ জন রোগীকে একসঙ্গে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এখন ওই সংখ্যা ২০০ ছুঁইছুঁই করছে। ঈদের আগে রোগী কমতে কমতে সর্বনিম্ন ৫৭ জনে নেমে আসে। গত ৭ মে এ হাসপাতালে করোনা রোগীর সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৫৭ জনে। কিন্তু ঈদের আগমুহূর্তে ও ঈদের পরে আবার রোগী বাড়তে শুরু করে। ঈদের আগে ১২ মে রোগীর সংখ্যা বেড়ে হয় ৭৭ জন। ঈদের পর থেকে রোগী আরও বাড়তে শুরু করে। প্রতিদিনই গড়ে ৩০-৩৫ জন করে রোগী ভর্তি হচ্ছে। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রোগী সবচেয়ে বেশি আসছে। বাড়তে বাড়তে রামেকে গত শুক্রবার রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩৬ জনে। পরদিন শনিবার ভর্তি থাকা রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪৬ জনে। আর গতকাল রবিবার সকালে হাসপাতালটিতে করোনা রোগী ছিল ১৪৯ জন। গত শনিবার রাতে এ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন পাঁচজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

রামেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে করোনা ওয়ার্ডে ১৪৯ জন ভর্তি রয়েছে। এর মধ্যে ৪৯ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। বাকি ১০০ জনের করোনা উপসর্গ রয়েছে। তাদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। করোনা আক্রান্তদের মধ্যে আইসিইউতে ভর্তি রয়েছে মোট ১৪ জন।’

রামেক হাসপাতালে করোনা রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের চিকিৎসা দিতে বহু সমস্যা হচ্ছে। নতুনভাবে বেড বাড়াতে গিয়ে সাধারণ রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। একটি ওয়ার্ড বাড়াতে হলে ডাক্তার বাড়াতে হয়, সিস্টার বাড়াতে হয়। সেটি না হয় কষ্ট করে চলে যাবে। তবে আমাদের জায়গা তো শেষ হয়ে গেল।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বর্তমানে ১৬, ২২, ২৫, ২৭, ২৯, ৩০, ৩৯ ও ৪০ এই আটটি ওয়ার্ডে করোনার চিকিৎসা চলছে। ৪৮টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪০ ওয়ার্ডে চিকিৎসা চলছে সাধারণ রোগীদের। বিভাগীয় হাসপাতাল হিসেবে এখানে এমনিতেই চাপ বেশি। রোগী রাখার জায়গা পাচ্ছি না। ১ হাজার ২০০ বেডের মধ্যে প্রায় ২০০ বেডে করোনা চিকিৎসা চলছে। আমরা হয়তো আরও একটি ওয়ার্ডে ৩২টি বেড আছে, সেটিই সবশেষ দিতে পারব। এর বেশি রোগীর চাপ বাড়লেও আর দিতে পারব না।’

একই হাসপাতালে করোনা ও নন-করোনা রোগীর চিকিৎসা দেওয়া খুব বড় সমস্যা উল্লেখ করে হাসপাতাল পরিচালক বলেন, ‘মাঝেমধ্যে অন্য ওয়ার্ডেও করোনা শনাক্ত হচ্ছে। এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জে খুব বেশি করোনা বাড়ছে। এটি যদি আসতেই থাকে তাহলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বেড একদম শেষ হয়ে যাবে। রোগী কোথায় নেব সেটাও আমরা বুঝতে পারছি না।’

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত শনিবার জরুরি সভা করেছে রামেক হাসপাতাল পরিচালনা পর্ষদ। সভা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রোগীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া এবং সীমান্ত বন্ধ রাখার প্রস্তাব করা হয়। এছাড়া নগরীর হেতেম খাঁ এলাকায় রাজশাহী সদর হাসপাতালে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে রামেক হাসপাতালে আরও এক হাজার শয্যা বৃদ্ধিরও প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব প্রস্তাব দুয়েক দিনের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হবে।

হাসপাতাল পরিচালক জানান, রামেক হাসপাতাল থেকে সাধারণ রোগীদের রাজশাহীর সাবেক সদর হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় ওই সভায়। ওই হাসপাতালে অক্সিজেন সাপোর্ট নেই বলে সেখানে দুটি সাধারণ ওয়ার্ডের রোগী স্থানান্তর করা হবে। তখন রামেক হাসপাতালের ফাঁকা হওয়া ওই ওয়ার্ডগুলোতে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া যাবে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, ‘হাসপাতালে ডাক্তারদের বাড়তি কাজও করতে হচ্ছে। অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার ও রেজিস্ট্রারদের দিয়ে একটি টিম করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের ইন্টার্ন ডাক্তার সংকট রয়েছে। এখানে অন্য সময় ২৫০ জন ইন্টার্ন থাকে, সেখানে এখন মাত্র ৬১ জন আছে। ডাক্তার সংকট থাকার জন্য অনেককেই পরপর ডিউটিও করতে হচ্ছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত