তৈরি পোশাক খাতে দুর্ঘটনা বীমার প্রস্তাব আইএলওর

পাইলট প্রকল্পে আগ্রহ বিজিএমইএর বিকেএমইএর আরও ভাবার পরামর্শ

আপডেট : ২৪ মে ২০২১, ০৪:২৪ এএম

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের দুর্ঘটনা বীমার বিষয়ে বিজিএমইএকে প্রস্তাব দিয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা- আইএলও। এটি বাস্তবায়ন হলে বিদ্যমান শ্রম আইনে ঘোষিত ক্ষতিপূরণের বাইরে শ্রমিকরা বাড়তি সুবিধা পাবেন বলে মনে করছে সংস্থাটি। গতকাল রবিবার পোশাক কারখানা মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর নতুন পর্ষদের সঙ্গে পরিচিত হতে আসে আইএলওর বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা। সেখানে তারা দুর্ঘটনা বীমার বিষয়ে আলোচনা হয়। এছাড়া পোশাক খাতসংশ্লিষ্ট আইএলওর যেসব প্রকল্প বাংলাদেশে চলমান আছে সেগুলোর বিষয়েও আলোচনা হয়। দুর্ঘটনা বীমা নিয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীনে সবপক্ষের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের কাজ চলছে। ওই কমিটিতেই বিজিএমইএ তাদের অবস্থান জানাবে বলে আইএলওকে জানিয়েছে।

অন্যদিকে মালিকদের আরেক সংগঠন বিকেএমইএ বলছে, সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা নীতিমালা নিয়ে কাজ করছে। আবার আইএলও এবং জিআইজেডের সঙ্গে ইনজুরি ইন্স্যুরেন্স স্কিম নিয়ে কাজ করতে চায়। সামাজিক সুরক্ষায় সরকার বারবার বিভিন্ন উদ্যোগ না নিয়ে সময় নিয়ে পর্যালোচনা করে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিতে পারে। এটা সবার জন্যই ভালো হবে। তাছাড়া পোশাক খাতে এমনিতেই দুর্ঘটনার সংখ্যা একেবারেই কম। তাই ৪০ লাখ শ্রমিকের এ খাতের শুধু দুর্ঘটনা বীমা প্রয়োজন আছে কি না সে বিষয়ে আরও গভীর পর্যালোচনা করতে হবে। বিজিএমইএর সহসভাপতি মিরান আলী গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জার্মান সরকার ও আইএলওর সঙ্গে সরকার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিল দুর্ঘটনা বীমা বাস্তবায়নের বিষয়ে। আইএলও প্রতিনিধিদল আজ (গতকাল রবিবার) আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে এ বিষয়েও আলোচনা করে। এখন শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীনে এ সংক্রান্ত একটি কমিটি গঠন হবে। সেখানে সরকার, আইএলওসহ সব পক্ষের প্রতিনিধি থাকবে। ওই কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে কীভাবে এটি বাস্তবায়ন করা যায়।’

অন্যদিকে বিকেএমইএর সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘এটি বাস্তবায়নের আগে দেখতে হবে কত টাকার প্রিমিয়াম গেল আর শ্রমিকদের এতে কতটুকু লাভ হলো। বছরে যদি হাতেগোনা কয়েকজন দুর্ঘটনায় পড়ে তার জন্য ৪০ লাখ শ্রমিকের প্রিমিয়াম দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। তাছাড়া আমাদের গ্রুপ ইন্স্যুরেন্স আছে। শ্রমিকদের জন্য তহবিল আছে। তাই এটি নিয়ে আরও ভাবার আছে।’

জিআইজেড বাংলাদেশের দুর্ঘটনা বীমা প্রকল্পের জ্যেষ্ঠ কারিগরি উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওনারা (বিজিএমইএ) এখনো কিছু স্পষ্ট করে বলেনি। সরকার যে কমিটি করেছে সেখানে মিটিংয়ে এ বিষয়ে আলোচনা করবে। এক কথায় বলতে গেলে তারা পজিটিভ বা নেগেটিভ কিছুই বলেনি।’ বিকেএমইএর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পাইলট প্রকল্পে তো কারও কোনো টাকা লাগবে না। জাতীয় পর্যায়ে এটি বাস্তবায়ন হলে তখন টাকা লাগবে। আর এটিকে ইন্স্যুরেন্স নাম দিলেও এটা কিন্তু কোনো ইন্স্যুরেন্স না। তাই এ বিষয়ে বিকেএমইএ আপাতত নেগেটিভ থাকার তো কথা না।’ প্রিমিয়ামের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এ টাকা কোনো ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে দেব না। এ টাকাটা অনেকটা কেন্দ্রীয় তহবিল হিসেবে কাজ করবে। তবে এ টাকাটা পাওয়া কেন্দ্রীয় ফান্ডের থেকে অনেক সহজ হবে। যদি টাকাটা বাড়তি থেকে যায় তাহলে সেটা পরবর্তী বছর মালিকদের প্রিমিয়াম আছে তা থেকে রেওয়াত দেওয়া যেতে পারে কিংবা অন্য কোনো সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।’

শ্রম আইনের ১৫০ ধারায় বলা হয়েছে, (১) চাকুরী চলাকালে উহা হইতে উদ্ভূত দুর্ঘটনার ফলে যদি কোনো শ্রমিক শরীরে জখমপ্রাপ্ত হন তাহা হইলে মালিক তাহাকে এই অধ্যায়ের বিধান অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকিবেন। (২) কোনো মালিক উক্তরূপ ক্ষতিপূরণ প্রদানে বাধ্য থাকিবেন না, যদি (ক) জখমের ফলে তিন দিনের অধিক সময় কোনো শ্রমিক সম্পূর্ণ বা আংশিক কর্মক্ষমতা না হারান; (খ) জখমের ফলে মারা যান নাই এরূপ কোনো শ্রমিকের দুর্ঘটনায় জখমপ্রাপ্ত হওয়ার প্রত্যক্ষ কারণ ছিল (১) দুর্ঘটনার সময় শ্রমিকের মদ্যপান বা মাদকদ্রব্য সেবনের ফলে উহার প্রভাবাধীন থাকা; (২) শ্রমিকগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রণীত বিধি বা সুস্পষ্ট আদেশ শ্রমিক কর্র্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য করা; (৩) শ্রমিকগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ব্যবস্থা করা হইয়াছে ইহা জানা সত্ত্বেও শ্রমিক কর্র্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো আঘাত নিরোধক নিরাপত্তা সরঞ্জাম বা অন্য কোনো কৌশল অপসারণ করা বা উপেক্ষা করা।

১৫০ ধারা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের পরিমাণ শ্রম আইনে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। কেউ মৃত্যুবরণ করলে ২ লাখ টাকা, স্থায়ী সম্পূর্ণ অক্ষমতার জন্য ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, স্থায়ী আংশিক অক্ষমতার জন্য ক্ষতি অনুযায়ী ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার নির্দিষ্ট অংশ। অস্থায়ী অক্ষমতার জন্য মাসিক মজুরি প্রাপ্য হবেন।

আইএলও বলছে, এ আইনে শ্রমিকের ক্ষতিপূরণে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ক্ষতিপূরণের পরিমাণ। এছাড়া ৩৩টি পেশাগত রোগ স্বীকৃত পেয়েছে নির্দিষ্ট তালিকায়। এছাড়া মালিক ক্ষতিপূরণ দিতে না চাইলে মামলা করতে হয় শ্রমিকদের। কিন্তু দেশে মাত্র ১০টি শ্রমিক আদালত রয়েছে। এর মধ্যে বিচারক না থাকায় তিনটি অকার্যকর। শ্রম আদালতের বিচারকের আসনটি ফাঁকা থাকলে মামলা পরিচালনা করতে পারবেন না। এক এলাকার ঘটনায় অন্য এলাকার আদালতে মামলা করা যাবে না। এছাড়া শ্রম আদালতে অতিরিক্ত মামলা জমে থাকায় গড়ে দুই বছর সময় লাগছে নিষ্পত্তিতে। আবার ভুক্তভোগীকে আদালতে হাজির হতে হওয়ায় খরচও বেড়ে যাচ্ছে। এসব কারণে অনেকেই বিচার চাইতে আসেন না। ফলে দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ মিলছে না।

দুর্ঘটনা বীমার ক্ষেত্রে আইএলও চাইছে, মালিক, শ্রমিক, সরকার ও ক্রেতাদের সমন্বয়ে একটি স্কিম করতে। সেখানে সবপক্ষ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থ ইন্স্যুরেন্স হিসেবে জমা দেবে। সবপক্ষের সমন্বয়ে একটি কমিটি এটি তদারকি করবে। যেহেতু পোশাক খাতের কর্মরত শ্রমিকদের কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ (তথ্যভাণ্ডার) আছে তাই কোনো শ্রমিক এক কারখানা থেকে অন্য কারখানায় চলে গেলেও তাদের স্কিম নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা হবে না। মাসিক প্রিমিয়াম তখন ওই কারখানা থেকে জমা দেওয়া হবে। শ্রমিক দুর্ঘটনায় পড়লে তখন যে কারখানায় কর্মরত আছেন সেই কারখানার হয়ে আবেদন করবেন।

এ বিষয়ে গতকাল বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওরা (আইএলও প্রতিনিধি) মূলত আসছিল বিজিএমএইর বর্তমান পর্ষদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে। সেখানে ওরা এই প্রস্তাবটিও দিয়েছে। আমরাও চাই শ্রমিকদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা ও সুবিধা প্রদান করতে। দুর্ঘটনা বীমা কার্যকর হলে শ্রমিকরা কতটুকু লাভবান হবে আগে আমাদের সেই বিষয়টি যাচাই করে দেখতে হবে। এজন্য পাইলট প্রকল্প একটি ভালো উদ্যোগ হতে পারে। পাইলট প্রকল্পে যদি মনে হয় এটি ভালো হবে তাহলে অবশ্যই আমরা এটি বাস্তবায়ন করব।’

গতকাল বিজিএমইএ পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আইএলও এর কান্ট্রি ডিরেক্টর টুমো পোটিআইনেন-ফারুক হাসানের সাক্ষাৎ হয়। তারা আইএলও ও বিজিএমইএর যৌথ উদ্যোগে পোশাকশিল্পে চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করেন। এছাড়াও তারা শিল্পের উন্নয়ন, বিশেষ করে শ্রমিকদের কল্যাণে আইএলও ও বিজিএমইএর যৌথ উদ্যোগে সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো নিয়েও আলোচনা হয়। বিজিএমইএ সভাপতি বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে শ্রম অধিকার নিশ্চিতকরণ ও শ্রমিকদের কল্যাণে সহযোগিতা প্রদানের জন্য আইএলওকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

আইএলওর কান্ট্রি ডিরেক্টর বলেন, বাংলাদেশের পোশাকশিল্প নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি ও সোশ্যাল কমপ্লায়েন্স প্রতিপালনে যে অগ্রগতি সাধন করেছে, তা প্রশংসাযোগ্য। এ সময় বিজিএমইএর সহসভাপতি মিরান আলী, পরিচালক ব্যারিস্টার শেহরিন সালাম ঐশী, পরিচালক আসিফ আশরাফ এবং আইএলওর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত